রাজনৈতিক শূন্যতায় মাথাচাড়া দিচ্ছে জঙ্গিরা

কাজী সুমন | ২০১৫-০৯-১৯ ১:০৩
৫ই জানুয়ারির ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা বিরাজ করছে। এই শূন্যতার সুযোগে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিরা। তারা দেশের বাইরে গিয়েও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এমনকি বাইরের    
দেশের হামলাকারীরা পালিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদে অবস্থান নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশ নিরাপত্তার ওপর নতুন হুমকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মনিরুজ্জামান। মানবজমিনকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, শুধু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা নয়, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি আইএসে যোগ দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সর্বশেষ যে চারজন আইসিস জঙ্গি মারা গেছে তাদের মধ্যে দুইজন ছিলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। এর আগে লন্ডনের একটি স্কুল থেকে পালিয়ে যে তিন ছাত্র আইএসে যোগ দিয়েছেন তারা সবাই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত। এছাড়া ৫-৬ জন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি আইএসে যোগ দিয়েছেন। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ২৫-২৬ জন। মনিরুজ্জামান বলেন, বৃটেন থেকে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন নাগরিক ঢাকায় এসে আইএস যোদ্ধা সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তার সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এই কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইএসের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে তারা রিক্রুটমেন্ট করা শুরু করেছে। উদ্বেগের বিষয় হলো- বাংলাদেশ থেকে সর্বশেষ যে ছেলেটি আইএসে যোগ দিয়েছে সে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিল। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে- এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নয়, নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কিছু ইন্টিলিজেন্ট অপারেশনের কারণে তারা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু যে ধরনের সরকারি মোটিভেশন থাকা দরকার এবং তথ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করা দরকার, সে ধরনের কোন কার্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এছাড়া, সারা বিশ্বে যে সাইবার রেডিক্যালাইজেশন (মৌলবাদ) হচ্ছে সেই হুমকির মুখে বাংলাদেশ পড়ে গেছে। যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আমরা হচ্ছি তার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কোন সক্রিয় ভূমিকা এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। ফিজিক্যাল হ্যান্ডলারের চেয়ে বড় যোগাযোগ হচ্ছে সাইবার রেডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে।
হঠাৎ করে জঙ্গি কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জেনারেল মনিরুজ্জামান বলেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জেএমবির তিনজন শীর্ষ জঙ্গিকে এক জেলখানা থেকে আরেক জেলখানায় নেয়ার সময় সহযোগীরা হামলা চালিয়ে তাদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে তাদের একজন পুলিশের গুলিতে মারা গেলেও বাকি দুই শীর্ষ জঙ্গিকে পুলিশ এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এতে জঙ্গি দমনে সরকারের যে তৎপরতা চলছে সেখানে বড় ধরনের ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয় ঘটনা হলো- বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো দেশের বাইরেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে জেএমবি জড়িত ছিল। এ ছাড়া কলকাতার বালুঘাটে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনায় জেএমবি জড়িত ছিল। দুই সপ্তাহে আগে হায়দরাবাদে যে চারজন জঙ্গি ধরা পড়েছে তাদের দু’জনই হুজির সদস্য। গত সপ্তাহে হিজবুত তাহরীর ঘোষণা দিয়ে একটি সাইবার কনফারেন্স করেছে। যেখানে তাদের ৪-৫শ’ সদস্য অংশ নিয়েছিল। এক সপ্তাহ আগে ঘোষণা দেয়ার পরও বিটিআরসি এটি বন্ধ করতে পারেনি। তাদের সক্ষমতা কি আমাদের ওপরে চলে গেছে কিনা- এটা নিয়ে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, অনেকে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন- বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে টিকতে না পেরে তারা বাইরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা বিশ্লেষণে দেখতে পাচ্ছি- জঙ্গি সংগঠনগুলোর ভিত সংগঠিত থাকার কারণে তারা বাইরে গিয়েও হামলা চালাতে পারছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর জঙ্গিরা স্তিমিত ছিল। এখন তারা জনবল-অস্ত্র ও বিস্ফোরক জোগাড় করে নতুন নতুন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ফলে ইদানীং অনেক  ঘটনা ঘটেছে। এর প্রধান কারণ হলো- ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে বিরোধী রাজনীতিতে যে চাপ সৃষ্টি বা বিরাজনীতিকরণের চেষ্টা চলছে তাতে বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আর শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে জঙ্গিরা। হিজবুত তাহরীর তাদের লিফলেট-ব্যানারে প্রচারপত্রে সেটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। জেনারেল মনিরুজ্জামান বলেন, আইএস বড় ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সাইবার ওয়ার্ল্ডে। আর বাংলাদেশের ৫ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। যে সাইবার রেডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে জনবল রিক্রুট হচ্ছে সে জায়গাটা সম্পূর্ণভাবে খোলা আছে। সেখানে কার্যকরভাবে সরকারের নজরদারি করা প্রয়োজন। আরেকটা হুমকি হচ্ছে- একবছর আগে আল-কায়েদা ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট (একিউআইএস) নামে আল-কায়েদার নতুন একটি আঞ্চলিক সংগঠন গঠিত হয়েছে। যেটিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মিয়ানমার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডও আমরা লক্ষ্য করতে পারছি। তা হলো- বাংলাদেশে সর্বশেষ যে দুজন ব্লগার খুন হয়েছেন তাদের দায় একিউআইএস স্বীকার করেছে।
থাইল্যান্ডে বোমা হামলাকারী পালিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান নেয়ার বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, ব্যাংককের ইয়াওয়ান মন্দিরে বোমা হামলা ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ১৬ই আগস্ট একটি বিমানযোগে বাংলাদেশে এসেছিল। ৩০শে আগস্ট বাংলাদেশ থেকে চীনা পাসপোর্টে চীন চলে যায়। এ ধরনের বড় একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের মূল পরিকল্পনাকারী অপরাধ করে পালিয়ে যদি কোন দেশে দুই সপ্তাহ অবস্থান নেয় তাহলে বুঝতে হবে- সেখানে তার শক্তিশালী সাপোর্ট নেটওয়ার্ক রয়েছে। ফলে সে সহজেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসে অবস্থান নিতে পেরেছে। তিনি বলেন, এত বড় একজন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেটা জানতে পারেনি।  এ থেকে বোঝা যাচ্ছে- বাংলাদেশে যেসব জঙ্গি সংগঠন রয়েছে তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর যোগসূত্র রয়েছে। এ ছাড়া এই ব্যক্তি যদি চীনা সন্ত্রাসী হয়ে থাকে তাহলে বাংলাদেশের জঙ্গিরা চীনের সন্ত্রাসীদের সঙ্গেও একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে পেরেছে। এটা খুবই উদ্বেগের কারণ।
ধারাবাহিকভাবে ব্লগার খুনের বিষয়ে তিনি বলেন, পরপর চারজন ব্লগার খুন হয়েছেন। অথচ একটি ঘটনারও প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি সরকার। এতে করে জনগণের মধ্যে একটা ভীতি সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া খুনের ঘটনায় কিছু প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। ব্লগার অভিজিতের স্ত্রী বন্যা আমেরিকায় একটি গণমাধ্যমকে অভিযোগ করেছেন, যখন হামলার ঘটনা ঘটেছে তখন ঘটনাস্থলের খুব কাছেই পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। তারা সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য ব্লাসফেমি কোন আইন নেই। কিন্তু ঘটনার তদন্ত হওয়ার আগেই পুলিশের আইজি যখন বলেছেন- ব্লগাররা সীমানা লঙ্ঘন করতে পারবে না। এ বক্তব্য থেকে একটা ভুল ম্যাসেজ যেতে পারে। সীমানা লঙ্ঘন করলে এই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।  এ ছাড়া বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচারহীনতার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইনের শাসনের অভাবের কারণেই এই ঘটনাগুলো ঘটছে।
সবগুলো ঘটনা মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, নতুন এক নিরাপত্তার হুমকির মুখে আছে বাংলাদেশ। এসবের সমাধান হলো- রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুস্থ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যেখানে অংশীদারিত্বমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ থাকবে। জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের সফলতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, বিগত কয়েক বছরে অনেক ক্ষেত্রে সরকার সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু যেসব জায়গায় সাফল্য অর্জিত হয়েছিল সেখানে বর্তমানে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে সরকার। এর বড় উদাহরণ হলো- থাইল্যান্ডে হামলাকারী পালিয়ে বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া।  তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ দমনের ক্ষেত্রে শুধু পুলিশি অভিযানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এটি দমন করতে হলে কাউন্টার রেডিক্যালাইজেশন করতে হবে, সাইবার রেডিক্যালাইজেশন বন্ধ করতে হবে। যাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে- তাদের ডিরেডিক্যালাইজেশন করতে হবে। মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এসব জায়গায় বড় কাজ হয়নি। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানগুলো খুবই ট্যাকটিক্যাল। কৌশলগত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। সমস্যাটাকে সমাধানের জন্য সার্বিকভাবে যে বড় পরিসরে কাজ করা দরকার সেখানে আমরা খুব ছোট জায়গায় অবস্থান করছি। তাই সাময়িকভাবে সাফল্য এলেও সাফল্যগুলো আমরা ধরে রাখতে পারছি না।
জঙ্গিবাদ নিয়ে ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষণার বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের অধীনে ‘বাংলাদেশ সেন্টার ফর টেররিস্ট রিসার্চ’ নামে একটি বিশেষায়িত সেন্টার কাজ করছে। বাংলাদেশে এটাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেটি জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করে। আমরা সার্বক্ষণিকভাবে জঙ্গি কর্মকাণ্ডগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণ করি। এ ছাড়া বিশ্বের বড় যেসব সংগঠন জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করে তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করি, তারাও আমাদের সহযোগিতা করে। তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের গবেষণাটা বিশ্লেষণধর্মী। যারা এটা পেতে চান বা লাভবান হতে চান তাদেরকে আমরা তথ্য শেয়ার করি।