স্বাধীন বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ছাত্রমৈত্রী নেতারা কে কোথায়

বেলায়েত হোসাইন | ২০১৬-০৩-০১ ৩:৩৯
ছাত্রমৈত্রীর জন্ম মূলত ছাত্র ইউনিয়ন থেকে। ১৯৫২ সালের ২৬শে এপ্রিল গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। এরপর ১৯৬৫ সালে বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খানের নেতৃত্বে  দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে সংগঠনটি। মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ বার ভাঙন দেখা দেয় ঐতিহ্যবাহী এ ছাত্র সংগঠনটিতে। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে এ সংগঠনটিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৮০ সালের ৬ই ডিসেম্বর কয়েকটি বিভক্ত অংশ এক হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় নতুন ছাত্র সংগঠন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (রাকসু) ছাত্রলীগ ও জাসদের বিরুদ্ধে প্যানেল ঘোষণা করে সংগঠনটি। নির্বাচনে ছাত্রমৈত্রীর প্রথম সভাপতি ভিপি পদে বিপুল ভোটে জয়ী হন। ১৯৮৭ সালে ঐক্যের ধারাবাহিকতায় এর নাম হয় বাংলাদেশ বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী। এরপর কয়েকটি ছাত্র সংগঠন মিলে বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী নামে আত্মপ্রকাশ করে। এযাবৎকাল ছাত্রমৈত্রীর ১৮টি কাউন্সিল হয়। এর মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন ১৯ জন। ছাত্রমৈত্রীর মূল সংগঠন ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছেন ১১ জন। রাজনীতি ছেড়েছেন ৫ জন। এই ৫ জনের ৩ জন প্রবাস জীবনযাপন করেছেন। এছাড়া দলবদল করে বিএনপিতে ২ জন ও সিপিবিতে ১ জন রয়েছেন।
ওয়ার্কার্স পার্টিতে যে ১১ জন: ১৯৮০ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতির হন বর্তমান সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ছাত্রনেতা ছাত্র রাজনীতি ছাড়ার পর তার নেতৃত্বেই গঠিত হয় যুবমৈত্রী। যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। দশম সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ৪র্থ কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯০ সালের ৫ম কাউন্সিলে সভাপতি হন নুর আহমদ বকুল। বর্তমানে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরো সদস্য। এর আগে যুবমৈত্রীর সভাপতিও ছিলেন। রাজনীতির বাইরে তিনি একজন আইনজীবী। এছাড়া জার্মানভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী ও উন্নয়ন সংস্থার কান্ট্রি ডিরেক্টর তিনি। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হন মাহমুদ হাসান বুলু। বর্তমানে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই। যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি ছিলেন বুলু। ২০০১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ছিলেন দীপঙ্কর সাহা দীপু। এর আগের দুই মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। একই সঙ্গে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। ২০০৩ সালের ১২তম কাউন্সিলে সভাপতি হন সাবাহ আলী খান কলিন্স। রাজশাহী নিউ ডিগ্রি কলেজে পড়াশোনা করা এই নেতা বর্তমানে যুবমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা করেন তিনি। কলিন্সের কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আব্দুল আহাদ মিনার। জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়) এ ছাত্র বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক। রাজনীতির বাইরে ব্যবসা করেন।
২০০৪ থেকে ২০১০ পর্যন্ত পরপর তিন মেয়াদে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ছিলেন রফিকুল ইসলাম সুজন। বরিশাল বিএম কলেজের এই ছাত্রনেতা বর্তমানে যুবমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক। তিনিও ব্যবসা করেন। একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি। তারপর ২০০৫ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হন মুক্তার হোসেন নাহিদ। বর্তমানে তিনি যুবমৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষক।
২০০৮ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিপ্লব রায়। বর্তমানে তিনি রাজবাড়ী জেলা যুবমৈত্রীর সভাপতি। তিনি রাজবাড়ী জেলা জজকোর্টের একজন আইনজীবী। ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পরপর দুই মেয়াদে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ছিলেন বাপ্পাদিত্য বসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স করা এই ছাত্রনেতা গণজাগরণ মঞ্চের একজন সংগঠক ছিলেন। পরবর্তীতে মঞ্চের কার্যক্রম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। বর্তমান তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির মিডিয়া সেলের সদস্য ও পার্টি পরিচালিত সাপ্তাহিক নতুন কথা’র নির্বাহী সম্পাদক। করেন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসা। বাপ্পাদিত্য বসুর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তানভীর রুসমত। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শ প্রশিক্ষণ বিভাগের সদস্য। পাশাপাশি তিনি প্রিন্টিংয়ের ব্যবসা করেন।
রাজনীতি ছাড়লেন যে ৫ জন (প্রবাসে ৩ জন): ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান ঢালি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করেন। ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। সেখানে তার ব্যবসা রয়েছে। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি আতাউর রহমান আতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা চলাকালীন ক্রেডিট ট্রান্সপার করে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষ করে ছাত্র রাজনীতিকে বিদায় জানান। বর্তমানে সোলার পাওয়ারের ব্যবসা করছেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত দুই মেয়াদে ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষ  করে ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচন করে হেরে যান। এরপর চলে যান কানাডায়। এখন সেখানেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি মিজানুর রহমান চন্দন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাজীবন শেষের পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিকে বিদায় জানান। ২০০০ সালের পরে তিনি নিউজিল্যান্ড চলে যান। বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছেন। ২০০৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মামুনুর রশিদ। তিনিও জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ছাত্র রাজনীতি ছাড়েন। বর্তমানে ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটান।
দলবদল করেছেন যে ৩ জন: ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পরপর দুই মেয়াদে ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপন খুলনা বিএল কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১৯৯০ সালে ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে নির্বাচন করে হেরে যান। অংশগ্রহণ করেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। এরশাদের পতনের পর যোগ দেন বিএনপিতে। ২০০১ সালের ৮ম সংসদ নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে এমপিও হয়েছিলেন। ১/১১-এর সময় সংস্কারপন্থিদের দলে থাকায় বিএনপির রাজনীতি থেকেও কিছুটা ছিটকে পড়েন তিনি। দলের সঙ্গে থাকলেও কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য নয়। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি একজন ব্যবসায়ী। স্বপনের প্রথম মেয়াদে তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন জাহাঙ্গীর আলম রুবেল। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় কাউন্সিলে ছাত্রমৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন রুবেল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বপনের যোগ দেয়ার সময় রুবেলও যোগ দেন বিএনপিতে। জাহাঙ্গীর আলম রুবেল বর্তমানে টাঙ্গাইল জেলা কৃষক দলের সভাপতি। গত পৌরসভা নির্বাচনে তিনি টাঙ্গাইলের গোপালপুর পৌরসভায় মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। টাঙ্গাইলে তার ব্যবসা রয়েছে। ১৯৯২ সাল থেকে ৯৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ছিলেন রাগিব আহসান মুন্না। এর আগের মেয়াদে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদে ছিলেন। রাজশাহী জেলায় জন্ম নেয়া এই ছাত্রনেতার শিক্ষাজীবন শেষ হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। ১৯৮৮ সালে তিনি রাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে জয়ী হন। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি সিপিবিতে যোগ দেন। বর্তমানে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। রাজনীতির বাইরে তিনি একজন ব্যবসায়ী।
বর্তমান কমিটি: ছাত্রমৈত্রীর বর্তমান কমিটি ২০১৫ সালে ১৮তম কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। বর্তমান সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক অর্ণব দেবনাথ একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে মাস্টার্স করছেন।