তাহের ঠাকুর এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

মতিউর রহমান চৌধুরী | ২০১৬-০৫-০৭ ১২:০১
অনেক পাঠকের প্রশ্ন হঠাৎ চুপ হয়ে গেলাম কেন? আসলে চুপ হইনি। বিদেশে আছি। অনেকটা অবকাশকালীন ছুটিতে। তাই লেখা হচ্ছে না। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো অবকাশ নেই। যাই হোক, পুরনো পত্রিকার পাতা উল্টাতে গিয়ে হঠাৎ করেই তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে পেয়ে গেলাম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত, সমালোচিত এক নাম। সাংবাদিক কাম এই রাজনীতিক বঙ্গবন্ধুর কাছে যেমন ছিলেন সুপ্রিয়, খন্দকার মোশতাকের ৮০ দিনের শাসনকালেও ছিলেন সামনের কাতারের সৈনিক। তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মনে পড়ে ১৯৭৪ সালে যখন বিশেষ ক্ষমতা আইন চালু হয় তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন একটি মন্তব্য করে। তার ভাষায় বিশেষ ক্ষমতা আইন একটি ঘুমন্ত বাঘ। সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল করার জন্য নাকি এই আইন জারি করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, সাংবাদিকদের এমন দায়িত্বশীলই করলো, কথায় কথায় সংবাদপত্র বন্ধ হতে লাগলো। সাংবাদিকদের গন্তব্য হয়ে গেল কারাগার। তিনটি ধারা এমনভাবে এই আইনে সন্নিবেশিত করা হয় যাতে করে লেখার স্বাধীনতা বন্দি হয়ে যায় সরকারের কাছে। সরকার যদি মনে করে এই সংবাদপত্রের খবরটি বস্তুনিষ্ঠ নয় তখন সরকার সংবাদপত্রটি বন্ধ করে দিতে পারবে। বস্তুনিষ্ঠের সংজ্ঞা কি? সরকারের পছন্দ হলে বস্তুনিষ্ঠ না হলে বস্তুনিষ্ঠ নয়। এটাই আমাদের সমাজে চালু রয়েছে। সংবাদ ছাপার ওপর বিধি-নিষেধের পাশাপাশি সংবাদের সূত্র বলতে বাধ্য করার ধারা দেখে প্রয়াত নির্মল সেন বলেছিলেন, এ কোন আইন? এ আইনে সাংবাদিকদের শপথ ভঙ্গ করবে। সাংবাদিকদের অলিখিত শপথ হচ্ছে কেবলমাত্র সম্পাদক ছাড়া কারো কাছে সূত্র বলা যাবে না। সম্পাদকও যখন তখন সূত্র প্রকাশ করবেন না। পত্রিকার হকারদের ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হলো এই আইনে। বলা হলো, কোনো সংবাদপত্র যদি সরকারের কিংবা বন্ধু রাষ্ট্রের কোনো বিরূপ সমালোচনা করে তখন সে হকারকেও আইনের আওতায় আনা যাবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, স্বাধীনতার পর বেশ কিছু পত্রিকা বাংলাদেশ না বলে পূর্ববাংলা লিখতে থাকলো। মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল হক কিংবা সিরাজ শিকদার কখনোই বাংলাদেশ বলতেন না। সিরাজ শিকদারের পার্টির নামই ছিল পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি। এ সমস্ত কারণেই এই ধারাটি সংযোজিত হয়েছিল বলে সাধারণভাবে বলা যায়। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকের একটা বিবৃতি এখানে উল্লেখ করা যায়। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, হককথা, চরমপত্র ও হলিডে যেভাবে বন্ধু রাষ্ট্র ও বাংলাদেশকে অস্বীকার করছে তাদেরকে ক্ষমা করা যায় না। সরকার কোনো ব্যবস্থা না নিলে জনগণই ব্যবস্থা নেবে। পরদিন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতির কাছে বাস্তবধর্মী সত্য তুলে ধরতে সাংবাদিকরা কারো হস্তক্ষেপ বা হুমকির কাছে মাথা নোয়াবে না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সাংবাদিকরা কলমের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেছেন। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া বারবার কারাগারে গেছেন। কখনো আপস করেননি। তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নির্ভেজাল সমর্থন দিয়ে গেছে। মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাক-স্বাধীনতার জন্য সবচেয়ে সোচ্চার ছিল দলটি। যে প্রেক্ষাপটেই হোক না কেন, স্বাধীনতার পর দলটি যখন সংবাদপত্রকে দায়িত্বশীলতার নামে একের পর এক আইন করতে লাগলো, তাতে হতাশা আর ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, যে দলটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, সে দলটি আর যাই হোক কালাকানুনের মধ্যে সমাধান খুঁজবে না। ’৭৪-এর ২রা ফেব্রুয়ারি বিশেষ ক্ষমতা আইন পাস হয় সংসদে। এর একদিন পর বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এক বিবৃতি দেয়। এতে বলা হয়, এই আইনে সংবাদ প্রকাশে বাধা আরোপ যে কোনো সংবাদ প্রকাশের জন্য এমনকি এই আইন তৈরির পূর্বে প্রকাশিত কোনো সংবাদের জন্য ছাপাখানার মুদ্রাকর, প্রকাশক, রিপোর্টার এবং সম্পাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। এই আইন বলে দৃশ্য, অদৃশ্য, সত্য বা মিথ্যা যে কোনো সংবাদ রাষ্ট্রবিরোধী মনে করলে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারবে। দেশের পরিস্থিতি তখন টালমাটাল। গুপ্ত হত্যা, থানা লুটের কারণে পরিস্থিতি নাজুক হতে লাগলো। সীমাহীন দুর্নীতিও ছড়িয়ে পড়লো চারদিকে। কৃত্রিম খাদ্য সংকটও তৈরি করলো একটি গোষ্ঠী। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশব্যাপী সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হলো। সব সংবাদপত্র সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিলো। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে একটি প্রেসনোট এলো। এতে বলা হলো, সংশ্লিষ্ট মহলের অনুমতি ছাড়া কোনো খবর ছাপা যাবে না। একতরফা খবর প্রচারের কারণে সেনা অভিযান নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হলো। দলীয় নেতাদের চাপের কারণে একপর্যায়ে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হলো। সীমিত সুযোগের মধ্যেও সাংবাদিকরা কথা বলতে লাগলেন। তখন বিভাজন নয়, সাংবাদিকরা ছিলেন ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধান জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করেছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এই স্বাধীনতা বারবার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। সেনা শাসনকালে এই স্বাধীনতা আশা করে কি লাভ? কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনে তো আমরা আশা করতেই পারি। সে সময় সক্রিয় রিপোর্টার ছিলাম। অনেক ঘটনার সাক্ষী। রিপোর্টারদের কান্না দেখেছি। সম্পাদকদের অসহায়ত্ব দেখে লজ্জা পেয়েছি। দিনভর পরিশ্রম করে রিপোর্ট জমা দিয়েছি চিফ রিপোর্টারের টেবিলে। অপেক্ষায় আছি কখন ডাক পড়বে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর বুঝলাম রিপোর্টটির মৃত্যু হয়েছে। এ রকম যন্ত্রণা নিয়ে ঘরে ফিরেছি রাতের পর রাত। পিআইডির এক টেলিফোনে রিপোর্টের ভাগ্য নির্ধারিত হতো। এটা চলেছে অনেককাল। এখন অবশ্য পিআইডির নাম উচ্চারিত হয় না। দরকারও নেই। সেলফ সেন্সরশিপকে আমরা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছি। আগে সিদ্ধান্ত আসতো। এখন আর তার দরকার হয় না। আমরাই নিজ দায়িত্বে ঠিক করে ফেলি। এরশাদের জমানায় একবার পার্বত্য এলাকায় একটি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলো। পিআইডির টেলিফোন বেজে উঠলো। এই খবর যাবে না। হাস্যকর বিষয় হলো, সাংবাদিকের কাছে এই খবর তখনো পৌঁছেনি। পিআইডির টেলিফোনে জানা গেল এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছে।
- চলবে -