প্রয়োগ নেই শব্দদূষণ বিধিমালার

রাশিম মোল্লা | ২০১৮-০২-০৩ ৭:৩২
শব্দদূষণ একটি অপরাধ। এজন্য আইনে রয়েছে জেল-জরিমানা দুটোই। অথচ রাতে কিংবা দিনে খেয়াল খুশিমতো চলছে উচ্চ শব্দের বাদ্যযন্ত্র। পাশের বাড়ির কারো কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা তা দেখার কোনো সময় নেই। ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র যে কোনো অনুষ্ঠানে সাউন্ড সিস্টেম এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিয়ের অনুষ্ঠান হলে তো কথাই নেই। গায়ে হলুদে সারা রাত চলে ধুম-ধাড়াকা গানের শব্দ। চারদিক প্রকম্পিত। মনে হয় যেন বুক ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। কেউ মনের আনন্দে নাচ্ছে; আবার কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। ইদানীং যেন এসব উচ্চশব্দের সাউন্ড সিস্টেমগুলো আমাদের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এক সময় বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে নারীরা নিজ কণ্ঠস্বরে গাইতেন বিয়ের গান। আর এখন সেগুলো ভুলে যন্ত্রের উপর নির্ভরশীল হচ্ছে বর্তমান প্রজন্ম। সাউন্ড সিস্টেম এখন নীরব নয় সরব ঘাতক। শখের বসে আমরা এসব উচ্চশব্দের সাউন্ড সিস্টেমের গান-বাজনা শুনছি। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি এ উচ্চশব্দ কতটা ক্ষতিকর। হৃদরোগীদের এটা মারাত্মক ক্ষতি করে। অথচ কোনো প্রতিকার নেই। প্রতিবাদ করতে গিয়েও ঝামেলা। বহু সময় দেখা গেছে শব্দ দূষণকারীদের বাধা দিতে গিয়ে হেনস্তা হতে হয়েছে। গত ১৯শে জানুয়ারি ঢাকার গোপীবাগের একটি অ্যাপার্টমেন্টে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে চলে উচ্চ শব্দের গান। পাশের বাসার সাবেক সরকারি কর্মকর্তা নাজমুল হক (৬৫) ছিল হার্টের রোগী। উচ্চশব্দের গান তার ব্যাধি বেড়ে যায়। তাই উচ্চ শব্দে বাজাতে অনুরোধ করেন। পরের দিন উত্তেজিত যুবকদল তাকে ডেকে এনে পিটিয়ে হত্যা করে। শনিবার কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে রাতভর চলে উচ্চ শব্দের গান। আশপাশের এস.এসসি পরীক্ষার্থীরা উচ্চ শব্দের বাদ্যযন্ত্রের কারণে পড়ালেখা করতে পারেনি। পাড়ার লোকজন সবাই মিলে প্রতিবাদ করেন। তাতে কোনো কাজ হয়নি। উল্টো পরীক্ষার্থদের দেখে নেয়ার হুমকি দিয়েছে।
শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ বিধিমালায় কোনো এলাকায় উচ্চ শব্দের যন্ত্র ব্যবহৃত করতে হলে উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলার ক্ষেত্র জেলা প্রশাসক, মেট্রোপলিটন এলাকা হলে পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু আজ অবধি কেউ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে এসব অনুষ্ঠান করেছে তার রেকর্ড নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসিক এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবেল, রাতে ৪৫ ডেসিবেল হওয়া উচিত; বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ডেসিবেল, রাতে ৫৫ ডেসিবেল; শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ডেসিবেল, রাতে ৬৫ ডেসিবেলের মধ্যে শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০, রাতে ৪০ ডেসিবেল শব্দ মাত্রা থাকা উচিত। অপরদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। প্রথমবার আইন অমান্য করলে অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তীতে একই অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে নীরব এলাকায় দিনের বেলা ৫০ ডেসিবেল, রাতে ৪০ ডেসিবেল। আবাসিক এলাকায় ৫৫ ডেসিবেল, রাতে ৪৫ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকায় ৬০ ডেসিবেল, রাতে ৫০ ডেসিবেল। বাণিজ্যিক এলাকায় ৭০ ডেসিবেল, রাতে ৬০ ডেসিবেল। শিল্প এলাকায় দিনের বেলায় ৭৫ রাতে ৭০ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিতে দিনের বেলা বলতে ভোর ৬টা হতে রাত্রি ৯টা এবং রাত্রি বেলা বলতে রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বোঝানো হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের কদমতীতে কর্তব্যরত ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. আজিজ বলেন, বাসায় যখন আমি কথা বলি তখন আমার স্ত্রী সন্তানরা বলে, ‘আমি নাকি বেশি জোরে কথা বলি। অথচ আমার কাছে মনে হয় আমি স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছি। বরং ওরা যখন কথা বলে তখন ওদের কথা আমার কানে পৌঁছায় না।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, শব্দদূষণ সৃষ্টি করে এমন যন্ত্রাংশ আমদানি এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। শব্দদূষণের কারণে পুলিশ বাহিনীর ১০ থেকে ১২ শতাংশ পুলিশ শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছেন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের প্রধান ডা. মনি লাল আইচ লিটু বলেন, শব্দদূষণ অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ কানে কম শুনবে। উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে মানুষের শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, আলসার, বিরক্তি সৃষ্টি হবে। শব্দদূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু এবং বয়স্করা। এমনকি গর্ভে থাকা সন্তানও শব্দদূষণে ক্ষতির শিকার হয়। তাদের শ্রবণশক্তি খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।
সেন্টার ফর ল এন্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, অনেকেই জানে না শব্দদূষণ যে একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এজন্য দেশব্যাপী ব্যাপক জনসচেতনামূলক প্রচার প্রচারণা করা দরকার। ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আইন অনুসারে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শব্দদূষণ রোধ করা প্রয়োজন।