শিশু স্বর্গের স্বপ্ন অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের

আব্দুল আলীম | ২০১৬-০৪-১৭ ১১:২১
২০১৩ সালের ৭ই জানুয়ারি আরিয়ান আরিফ নামের এক শিক্ষার্থীর ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে জন্ম মজার ইশকুলের। সেখান থেকে জন্ম অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের। রাজধানীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পথশিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়ানো ছিল তাদের কাজ। আলো ছড়াতে গিয়ে শিশু পাচারের অভিযোগে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেও যেতে হয় তাদের। তবে এতসব বাধা সত্ত্বেও পিছপা হননি উদ্যোমীরা। প্রতিষ্ঠার ৩ বছরে কাজের পরিধি বেড়েছে অনেক। পথশিশুদের উন্নয়নে স্বপ্ন নির্মাণ করেছেন অবিরত। ইতিমধ্যে স্থায়ী শিশু স্বর্গ গড়ার পরিকল্পনা করেছেন তারা। সম্প্রতি অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের মালিবাগের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে কথা হয় প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান উদ্যোক্তা আরিয়ান আরিফের সঙ্গে। জানান সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকে এ যাবতের কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। তিনি  বলেন, ২০১৩ সালে আমরা মজার ইশকুল নামে যাত্রা শুরু করি। পরে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন নামে সরকারি অনুমোদন পাই। তিনি আরও বলেন, আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিই। স্ট্যাটাস দেখে দুজন সাড়া দেন। শাহবাগে মিটিং ডাকলে ওই দুইজন থেকে একজন আসলেও অতিরিক্ত শীতের কারণ দেখিয়ে অপরজন আসেননি। পরবর্তী মিটিংয়ে ওই একজনও হারিয়ে যান। যারা আর কোনোদিন যোগাযোগও করেননি। কিন্তু তারপরও হাল ছাড়িনি। কয়েকদিনের মধ্যে আরও কয়েকজন সাড়া দেন ওই স্ট্যাটাসে। খেলতে খেলতে শিখি স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাই আমরা। সম্পূর্ণ নিজেদের এবং দেশের মানুষের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ি ভাসমান বস্তি, বাস, রেল স্টেশন ও লঞ্চঘাটের পথশিশুদের মাঝে। পথশিশুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে পড়ালেখা শিখিয়ে আসি। তিনি জানান, আগারগাঁও এলাকায় আমাদের স্কুলে যে শিশু রয়েছে তার ৪০ জনের মধ্যে প্রায় ২০ জন ভিক্ষা করতো। দোকানের সামনে গিয়ে একটা সিঙ্গাড়া দেবেন? এভাবে ভিক্ষা করতো। আমরা তাদের খাবার দিয়েছি। খেলতে খেলতে শিখিয়েছি। অবাক করার মতো বিষয় হলো এমন অনেক শিশু আছে যাদের বয়স ১০ বছর পার হলেও কোন স্কুলে যায়নি। মজার ইশকুলই তার জীবনে প্রথম স্কুল। কিছুই পড়তে পারতো না। অথচ এখন সব বই দেখে রিডিং পড়তে পারে। এগুলো দেখে আমাদের খুব ভালো লাগে। মনে হয় আমাদের কষ্ট সার্থক হয়েছে।
তিনি বলেন, পথের ধারে যে সকল শিশু জীবন ধারণ করে তাদের কাছে খাদ্য ও শিক্ষা পৌঁছে দিতে নিরলস পরিশ্রম করছে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠার সময় আমিসহ জাকিয়া সুলতানা, হাসিবুল হাসান, ফিরোজ আলম নামের ক’জন ভলান্টিয়ার কাজ শুরু করেছিলাম। খাদ্য-শিক্ষা-প্রযুক্তি স্লোগানে খোলা আকাশের নিচে পরিচালিত ইশকুল ছিল এটি। পথশিশুদের আধিক্য বেশি  এমনসব স্থানে মজার ইশকুল পরিচালিত হতে থাকে।
প্রথম দিকে এ কজন লোক থাকলেও এখন নিবন্ধিত ভলান্টিয়ারের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে। এছাড়া অনিবন্ধিত ২ হাজারেরও বেশি। পথশিশুদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সহযোগিতায় দক্ষ ও স্বনির্ভর করে গড়ে তুলে সমাজের বাকি ১০ জনের মতো জীবনযাপনের জন্য করণীয় সবকিছুই পরিকল্পনায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। তিনি বলেন, আমাদের সংগঠন নিজেদের চাঁদা ও সম্পূর্ণ দেশি মানুষের সহযোগিতায় চলে। বিদেশিদের কোনো অনুদান আমরা নিই না। আগামীতেও নেয়ার ইচ্ছা নেই। কারণ, বিদেশিরা টাকা দিলেও তাদের অনেকগুলো রুল দেয়া থাকে। সেই রুলের মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়।
আরিফ বলেন, ইতিমধ্যে আমরা আমাদের সংগঠনের কাজের পরিধি বাড়িয়েছি। স্কুল থেকে বের হয়ে আরও কিছু সেবা যোগ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে স্থায়ী শেল্টার হোম, মজার ইশকুল ও ইভেন্ট’স। যেসব শিশু ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই, নেশা বা অপরাধের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের জন্য ঢাকার ধামরাইয়ের ভবানি কিসমতপুরে স্থায়ী শেল্টার হোম তৈরি করবো। এটার নাম দেয়া হবে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন শিশু স্বর্গ। ইতিমধ্যে জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করি এ বছরের শেষ অথবা আগামী বছরের প্রথম দিকে ভবন তৈরির কাজ শুরু করতে পারবো। তিনি বলেন, শিশু স্বর্গ হবে দুটি। ঢাকার ভাড়ার বাসার শিশু স্বর্গের নাম হবে ‘বায়ান্ন’। যেখান থেকে শিশু পাচারের অভিযোগে আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ধামরাইয়ের নিজস্ব জমিতে স্থায়ীটার নাম হবে ‘একাত্তর’। তবে বায়ান্ন ও একাত্তর শিশু স্বর্গের অফিসিয়াল নাম হবে না। এটা আমাদের ভলান্টিয়ারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ সাংকেতিক নাম হবে। তিনি আরও বলেন, ২০০ জন একসঙ্গে ক্লাস করতে পারে এমন আকারের এই সেফ হোমের আওতায় থাকবে বাসস্থান, একটি ছোট্ট হাসপাতাল, কারিগরি শিক্ষা (কম্পিউটার লার্নিং-অফিস প্রোগ্রাম, ডিজাইন, এডিটিং ও হার্ডওয়ার), মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, অটো মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ও হ্যান্ডি ক্র্যাফট। থাকবে ফর্মাল ইশকুল-প্লে থেকে এসএসসি পর্যন্ত। একই সঙ্গে থাকবে বিনোদন ও খেলাধুলার ব্যবস্থা। কৃষিভিত্তিক সহায়ক কাজের মধ্যে হাস-মুরগি পালন, গরু ও মাছ চাষ প্রকল্প। সোলার সিস্টেম ও বায়োগ্যাস প্লান্টও থাকবে। তবে কৃষি ও বায়োগ্যাস প্লান্টের মতো এই কঠিন কাজগুলো করবে আমাদের ভলান্টিয়াররা। সেখানে সেফ হোমের শিশুরা চাইলে নিজেরা ভবিষ্যতের জন্য শিখতে পারবে। এছাড়া আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ইভেন্ট’স। সারা বছর বিভিন্ন সময় বিশেষ ইভেন্টের আয়োজন করে থাকি। ঈদ কিংবা শীত, মধুমাস কিংবা নির্মল আনন্দ, এসব কিছু থেকে যারা আজন্ম বঞ্চিত তাদের জন্য বছরব্যাপী আমাদের বিভিন্ন নিয়মিত আয়োজন থাকে। ঈদের কাপড় বিতরণ। মুধমাসে ফল উৎসবের আয়োজন করা হয়। আমরা নিজের অবস্থান থেকে সবাই সব বড় কাজগুলো করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের ভালোবাসা দিয়ে অনেক ছোট কাজ করতে পারি। সেটাই আমরা করছি। তিনি বলেন, রাশিয়ায় একসময় অনেক বেশি পথশিশু ছিল। এক ব্যক্তি আমাদের মতো এগিয়ে আসেন। শিক্ষা ও খাদ্য দিতো। শিশুদের পুনর্বাসন করতো। এখন রাশিয়ায় কোন পথশিশু পাওয়া যায় না। আমি বিশ্বাস করি আমরা এই ধারার এগিয়ে যেতে পারলে আমাদের দেশেও একদিন পথশিশু খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটা একার পক্ষে সম্ভব না। দেশের প্রতিটা মানুষকেই পথশিশুদের কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি জানান, আমরা রাশিয়ার ওই ব্যক্তিকে না একাত্তরের শহীদ রুমীকে আদর্শ ধরি। শহীদ রুমীর উজ্জল ক্যারিয়ার ছিল। কিন্তু তার মাকে বুঝিয়েছিল আমার দেশে যুদ্ধ হচ্ছে। সেখানে আমার মতো অনেক যুবক অংশ নিচ্ছে। আমিও তো অংশ নিতে পারি। দেশ স্বাধীন না হলে বিদেশ গিয়ে পড়ে কি হবে? তার মতো একজন ছেলে যদি মাকে বুঝাতে পারে। তাহলে আমরা কেন পারব না। আর্থিক যোগানের বিষয়ে বলেন, সদস্যদের চাঁদা দিয়ে আমরা স্কুলগুলো চালিয়ে থাকি। প্রতি সদস্য ক্লাসপ্রতি ৫০ টাকা চাঁদা দেন। এছাড়া খাবারের এত টাকা আমাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা বিভিন্ন সময় কাপড়, খাবার, শীতের জ্যাকেট, ঈদের কাপড় ও পড়ার উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করে। আমরা টাকা নেয়ার চেয়ে খাবার ও মালামাল নিতে বেশি আগ্রহী। তবে ধামরাইয়ে যে সেফ হোম তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছি সেখানে যদি কোনো ব্যক্তি অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে সেটা গ্রহণ করবো। ব্যক্তি চাইলে স্মারক হিসেবে তার নাম লেখা থাকবে। প্রবাসীরাও যদি অর্থ দিতে চায় সেটাও নেয়া হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও টাকা দিতে পারে। আবার ব্যাংকের হিসাবেও পাঠাতে পারে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠান দিন দিন বড় হচ্ছে। আজ আমরা পড়ালেখা ও চাকরির ফাঁকে ফাঁকে কাজ করতে পারছি। হয়তে ৫ বছর পর আমাদের মধ্যে কারও এ অবস্থা নাও থাকতে পারে। সেজন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়ের পথ বের করার পরিকল্পনা আছে। সেটা কি হবে তা এখনও ঠিক করা হয়নি। ৫ বছর পূর্তির পর সেই সিদ্ধান্ত নেব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাজ রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক রাখতে চাই। আগামীতে কোনোদিন ঢাকার বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা বা সম্ভাবনা নেই। তবে ঢাকার বাইরে থেকে কেউ আমাদের থিম নিয়ে কাজ করলে তাদের স্বাগত জানাবো। তারা আমাদের প্রতিষ্ঠান হবে না। তবে তারা এ নামে বিভিন্ন জেলায় কাজ করতে পারবে। কারণ প্রত্যেকের জন্য তার নিজের জেলায় দায়বদ্ধতা বেশি।