একাত্তর: আগে-পরে, ১৪

গোল হয়নি অফসাইড হয়েছে

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
পল্টন ময়দানের জনসভায় শাহজাহান সিরাজের বক্তৃতায় আমজনতা স্লোগান তুলল, ‘নির্বাচন-নির্বাচন, বর্জন-বর্জন, নির্বাচনের কথা বলে যারা, ইয়াহিয়ার  দালাল তারা।’ পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে মঞ্চে ছুটে এলে শেখ ফজলুল হক মণি, শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন। উদ্‌ভ্রান্ত সিরাজউদ্দীন বলে বসলেন, সব শেষ হয়ে গেল। নির্বাচনে অংশ না নিলে আমাদের রাজনীতির ধ্বংস অনিবার্য। সেই পরিস্থিতি কিভাবে ইউটার্ন নিল পল্টন ময়দানে। গোল না হয়ে কিভাবে অফসাইড হয়ে গেল, জনতাকে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে নির্বাচনের পক্ষে আনা গেল তাই মানবজমিনকে বলেছেন নূরে আলম সিদ্দিকী। আজ পড়ুন ধারাবাহিক সাক্ষাৎকারের ১৪তম কিস্তি:
সন্দেহাতীতভাবে এটি রাজনৈতিক বাস্তবতা ১লা মার্চের ভাষণে ইয়াহিয়া খান সামরিক প্রশাসক হিসেবে ৩রা মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশনটি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে দেন।
এটি পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধিকার-স্বাধীনতার চেতনার উত্তরণে পরিপূর্ণ মদত যোগায় এবং ১লা মার্চ থেকে পঁচিশে মার্চ এবং পঁচিশে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর একটি নিরস্ত্র জাতির সম্পন্ন মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং পাকিস্তানের সুশৃঙ্খল হিংস্র সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা প্রতিহত এবং তাদেরকে সশস্ত্র যুদ্ধে পযুর্দস্ত এবং আত্মসমর্পণে বাধ্য করা দুনিয়ায় শুধু বিস্ময়কর নয় একটি বিরল ও তুলনাবিহীন ব্যতিক্রমধর্মী অবিস্মরণীয় ঘটনা। এটার ধারাবাহিক বর্ণনায় অবশ্যই আসবো বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতি বানিয়ে পল্টন ময়দানের পহেলা মার্চের ছাত্র জনসভায় ছাত্রলীগের একক নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সুনিপুণ কর্মসূচি আন্দোলনের একেকটি সোপন উত্তরণের মধ্যদিয়ে সাফল্যের স্বর্ণ সৈকতে পৌঁছে দেয়। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমণে বাঙালি জাতিকে অনেক চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। অনেক বক্ষ বিদীর্ণ রক্ত ঝরেছে। বাংলার অনেক সতী সাধ্বী রমণীর সতীত্ব হারানোর বেদনার যন্ত্রণা সইতে হয়েছে। মায়ের অশ্রু, বোনের আর্তনাদ দীর্ঘ নয়টি মাস বারবার কুকরে দোলে ওঠেছে। এইসব নিষ্ঠুর নির্মম হৃদয়বিদারক স্মৃতিকে সামনে রেখেই আমি অকপটে ও উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে আজও প্রতিধ্বনিত করতে চাই কোন রক্ত; কোন অশ্রু; কোন আন্দোলন সত্তরের নির্বাচনের ম্যান্ডেট ছাড়া পরাধীনতার বক্ষবিদীর্ণ স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে পারতো না। সেদিন তো বটেই এই জীবন সায়াহ্নে এসেও আমাকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। সশস্ত্র বিপ্লব বা মুক্তিযুদ্ধের বিপ্লব বা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই স্বাধীনতা আনতে হলো তাহলে ছাত্রলীগের সভাপতি থাকাকালীন একটি সময়ে আপনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের এতো সমালোচনা করতেন কেন? আপনাকে তো স্বীকার করতেই হবে সেদিনের সেই বিরোধিতা আপনার রাজনীতির চূড়ান্ত ভুলের অংশ ছিল? এর উত্তর আমি দ্বিধা সংকোচিতভাবে আগেও বহুবার বলেছি আমার যৌবনের সেই উচ্ছ্বসিত আবেগতাড়িত হৃদয় থেকে আমি বাংলার উদ্দীপ্ত তারুণ্যকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে, একটি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট ছাড়া গণতান্ত্রিক চেতনার ধারকদের দ্বারা কোনো আন্দোলন সফল করা সম্ভব হয় না। আমি তখনকার সশস্ত্র বিপ্লবীদের শুধু তীব্র সমালোচনাই করিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যয় দৃঢ় উদাত্ত আহ্বান রেখেছি সত্তরের নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রান্তিক জনতার রায় নিয়ে আসার জন্য। আজকে ছাত্রলীগের প্রজন্ম সেদিনের আন্দোলনের গতিধারাকে কতটুকু উপলব্ধি করা বা জানার চেষ্টা করেন কিনা জানি না কিন্তু তখন পল্টন ময়দানের লাখ লাখ জাগ্রত জনতাকে সামনে রেখে আমরা প্রত্যক্ষ বিতর্কে অবতীর্ণ হতাম। সেটা যেন রীতিমতো বাকযুদ্ধ। পল্টন ময়দানে বক্তৃতার ক্রমাগত ধারা ছিল এমনি। প্রথমে আব্দুল কুদ্দুস মাখন বক্তৃতা করতেন। ওনি তাত্ত্বিকজনদের মধ্যে বিপ্লব না নির্বাচন এই তাত্ত্বিক যুদ্ধের মধ্যে তিনি কখনোই ঢুকতে চাইতেন না। তার বক্তৃতার লক্ষ্যটাই ছিল আন্দোলনের উদাত্ত আহ্বানের। শাজাহান সিরাজ ও আ.স.ম আবদুর রব উভয়েই নির্বাচনের পরোয়া করতেন না। বিপ্লব এবং সশস্ত্র বিপ্লবই মুক্তির একমাত্র পথ- এই ভাবনাতেই বিভোর থাকতেন। বলতে গেলে সত্তরের নির্বাচনের পূর্বে তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাদের চেতনায় সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশেরও সুদৃঢ় দাবি উচ্চারিত হতো। তখন ষাট দশকে সারা বিশ্বজোড়া সমাজতন্ত্রের প্রচণ্ড উন্মাদনা। লেনিনবাদ-মাওবাদ, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, ব্রাজিস দেব্রে বৈপ্লবিক চেতনায় উজ্জীবিত ছিল শুধু বাংলাদেশ নয়; সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের তারুণ্যও। এটা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ ছাড়িয়ে চে গুয়েভারা ও ব্রাজিস দেব্রে আরো বৈপ্লবিক একটি নতুন চেতনার উদ্ভাবক হলেন। বিপ্লবের সফল বিজয়ের পরও বিপ্লব থেমে থাকে না বা বিপ্লবের শেষ হয় না। সমুদ্রের স্রোতধারার মতো একটি তরঙ্গ ভেঙে গেলে স্বতঃস্ফূর্ত জেগে ওঠা আরেকটি তরঙ্গ আরেকটি বিপ্লবের জন্ম দেয়। একটি বিপ্লবের বিজয় অন্য একটি বিপ্লবের সূচনা করে। বিপ্লবের বিজয় বলে কোনো কথা নেই। ব্রাজিস দেব্রের মতে, বিপ্লবের বিজয়ের পরে বিপ্লবের বিজয় সংগঠিত হয়েছে বলে মনে করলে ধরে নিতে হবে বিপ্লবীর আত্মহনন হয়েছে; বিপ্লবী নিজেই নিজেকে হত্যা করেছে। আমাদের দেশে যারা মাওবাদ-লেনিনবাদে বিশ্বাস করতেন তাদের থেকেও অতিমাত্রায় বিপ্লবী ছাত্রলীগে প্রচণ্ডভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু মজার বিষয় হলো ক্রমাগতভাবেই বৈপ্লবিক চেতনার বিবর্তনে চে গুয়েভারা ও ব্রেজিস দেব্রের আমাদের তখনকার সময়ের বিশ্বাসীরাই শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী হিসেবে পরিগণিত হয়। তবুও আমাকে স্বীকার করতেই হয় ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে সশস্ত্র বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসীরাই প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। আমার এমনকি এটাও কখনো কখনো মনে হয়েছে স্বয়ং মুজিব ভাইও নির্বাচন ও বিপ্লবের মধ্যে দ্বিধা সঙ্কুল ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসে ওদের প্রচণ্ড সাংগঠনিক শক্তি এবং সুশৃঙ্খলকর্মী বাহিনী উচ্চারিত চিত্তাকর্ষক বৈপ্লবিক স্লোগানে কখনো কখনো ক্ষণিকের জন্য হলেও তিনি বিভ্রান্ত হতেন। সিরাজ (সিরাজুল আলম খান) ভাইকে উৎসাহ উদ্দীপনাতো দিতেনই আমাকেও কখনো কখনো বলতেন বিপ্লবই সঠিক পথ। নির্বাচন-টির্বাচন ওরা দেবে না। দিলেও আমাদের বিজয় সাধিত হতে দেবে না- তাই বিপ্লবের জন্যই আমাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে। তখন সে কি মর্মান্তিক হতাশ হতাম বোঝানো যাবে না। চোখে ঘোর অন্ধকার দেখতাম। তখন ইত্তেফাকই ছিল আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। শহীদ সিরাজ উদ্দীন হোসেন, আসাফদ্দৌলা রেজা ভাই, শহীদ তালেব ভাই ও মাহমুদুল্লা ভাই, মানিক ভাইসহ ইত্তেফাকের সকল সিনিয়র সাংবাদিক পুরোপুরি গণতান্ত্রিক মানসিকতায় উজ্জীবিত ছিলেন। শুধু মানিক ভাইয়ের মুসাফির নয়-স্থান কাল পাত্রসহ বিভিন্ন কলামে সম্পাদকীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎসাহিত করা হতো। এটা স্বাভাবিক কিনা জানি না তবে কাকতালীয় তো বটেই আমার বক্তব্যকে প্রচণ্ড গুরুত্ব সহকারে শিরোনাম করা হতো। পল্টনে জাগ্রত জনতার সামনে দাঁড়িয়ে মুষ্টিবদ্ধ এক হাত বুকে আর এক হাত সম্মুখে প্রসারিত করে আমি প্রতিনিয়ত যে শপথ বাক্য পাঠ করতাম তাতে প্রতিনিয়তই গণতান্ত্রিক পথ পরিক্রমণ তো বটেই নির্বাচনে অংশগ্রহণেরও শপথ বাক্য উদ্ধৃত হতো। আর ইত্তেফাক ছাত্র নেতৃত্ব চতুষ্টয়ের শপথ গ্রহণের ছবিটি প্রায়শই মুদ্রণ করতো। ক্যাপশনটাও থাকতো গণতন্ত্র এবং নির্বাচনের পক্ষে। আমি একটি জনসভার কথা উল্লেখের লোভ সংবরণ করতে পারছি না। পল্টনের এক বিশাল জনসভায় সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ একটি উল্লেখযোগ্য বক্তৃতা করে ফেললেন। বক্তৃতায় তিনি হৃদয় আকর্ষক একটি উপমার বর্ণনা দিয়ে বললেন, ইয়াহিয়া খান সাহেব যে নির্বাচনটির ঘোষণা দিয়েছেন সেটির বর্ণনায় আমি বলতে চাই শেখ মুজিব যত ভালো বল খেলুনই না কেন ৬ দফার পক্ষে তার গোল করা সম্ভব না। কারণ বল খেলায় বার পোস্টের পেছনে যারা থাকে ইয়াহিয়া খান ইলএফও (ঊখঋঙ) নামে বার পোস্টের সামনের দিকে জাল দিয়ে দিয়েছেন। মুজিব ভাই যত চেষ্টাই করেন না কেন গোল দেয়া সম্ভব হবে না। আগ থেকেই সভাটিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, সারা পল্টন ময়দানে তখন স্লোগান ওঠলো। পল্টন ময়দানে ছড়ানো-ছিটানো বিপ্লবী কর্মীরা গগনবিদারী স্লোগান দিতে লাগলেন-নির্বাচন-নির্বাচন, বর্জন-বর্জন; নির্বাচনের কথা বলে যারা ইয়াহিয়া খানের দালাল তারা; মুক্তির পথ একই পথ, সশস্ত্র বিপ্লব, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, বাংলার অপর নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম। আমরা যারা নির্বাচন ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী তারা হতবিহ্বল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত পল্টন ময়দান যেন ভিন্নরূপে আমাদের কাছে প্রতিভাত হলো। তখন প্রান্তিক জনতা উচ্চারিত স্লোগানের জবাব দিতো অকৃত্রিম হৃদয়ে। মারপ্যাঁচটা অত তলিয়ে বুঝতে চাইতো না। আমার স্পষ্ট মনে আছে শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেন, শেখ ফজলুল হক মণি মঞ্চের কাছে ছুটে আসলেন। সিরাজউদ্দীন হোসেন ভাইকে চরম অস্থিরতায় উদভ্রান্ত প্রায় মনে হচ্ছিল। কেবল বলছেন, সব শেষ হয়ে গেল। নির্বাচনে অংশ না নিলে আমাদের রাজনীতির ধ্বংস অনিবার্য। ওই অকস্মাৎ অনভিপ্রেত মুহূর্তেও আমি আস্তে আস্তে মনোবল ফিরে পেতে লাগলাম। শাজাহান সিরাজের পরে আসম আবদুর রব তার বক্তৃতায় মরীচিকার মতো নির্বাচনকে সম্পূর্ণ বর্জন করে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে বীরদর্পে পাকিস্তানি সেনাসহ সমস্ত অবাঙালিদের বিদায় দিয়ে দিলেন। তখন মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ শেষ। পল্টন ময়দানের ওপরে বক্তৃতার প্রশ্নে আমার একটা ভিন্নমাত্রার অধিকার ছিল। উদ্বেলিত জনতা তো বটেই ছাত্রলীগের সশস্ত্র বিপ্লবীরাও আমার বক্তৃতা ভালোবাসতেন। আমাকে বক্তৃতা করার সুযোগও দিতেন। তবে সেদিন চিত্রটা একটু ভিন্নমাত্রার ছিল। আমি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট কর্মীরা স্লোগানে পল্টন মুখরিত করে ফেললেন। বিপ্লবী আলম ভাই, লাল সালাম, লাল সালাম। আলম ভাই দিচ্ছে ডাক, নির্বাচন নিপাত যাক। আলম ভাইয়ের শেষ কথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আমিও স্লোগানের সুযোগ নিলাম। সমস্ত মনের মাধুরী মিশিয়ে আবেগের আবীর মাখা হৃদয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে উদ্বেলিত জনতাকে সম্বোধিত করলাম। আমি যেন ভিন্ন জগতের সম্মোহনী চিত্তের একজন কবিয়াল। ছন্দে ছন্দে মেতে ওঠা বাউলের মতো আমার কণ্ঠটি একতারার মতো ক্রমাগত সুরের মূর্ছনা ছড়াতে লাগলাম। সম্বোধনের মধ্য দিয়ে সমগ্র পল্টনে জাগ্রত জনতার ওপরে আমার অভাবনীয় প্রভাব সৃষ্টি হলো। সবকিছু যেন অলৌকিকভাবে আমার নিয়ন্ত্রণে এসে গেল। আমি উদাত্ত কণ্ঠে বলতে থাকলাম, বাগ্মীতায় বিপ্লব সম্ভব হলে আমি বাংলার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, আমি বাংলার চে গুয়েভারা, আমি বাংলার ব্রাজেস দেব্রে। পল্টন ময়দান তুমি সাক্ষ্য আছো, আমি কতোবার তোমার সামনে গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে ওঠেছি। আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত হয়েছি। কারারুদ্ধ অবস্থায় মায়ের মৃত্যু সংবাদ শুনে প্যারোল না পাওয়ার বেদনার ইতিহাস শোনাতে গিয়ে পাগলপ্রায় চোখের জলে বুক ভাসিয়েছি। তোমাদেরও কাঁদিয়েছি। বিমুগ্ধ পল্টন ময়দানকে আরো বলেছিলাম আমার অনুজপ্রতিম শাজাহান সিরাজ একটি চমৎকার ও হৃদয়গ্রাহ্য দৃষ্টান্ত দিয়েছেন ফুটবল খেলার উপমার মধ্য দিয়ে। শাজাহান সিরাজের ভাষায় বার পোস্টের পেছনের জাল সামনে দেয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শত চেষ্টায়ও গোল করতে পারবেন না। কিন্তু আমি বলি ইয়াহিয়া খানের মতো শাজাহান সিরাজও বার পোস্টের জালের দড়ির শক্তি পরীক্ষা করতে ভুলে গেছেন। যে দড়ি দিয়ে বার পোস্টে ওই জাল তৈরি করা হয়েছে বাইশ বছরে বাঙালির বুক নিঃসৃত রক্তে ভিজে ওই জালের সমস্ত দড়ি ভিজে পচে নরম হয়ে গেছে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের সমর্থন নিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন জালে বল মারবেন জাল ছিঁড়ে গোল হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। সমস্ত পল্টন ময়দান সমস্বরে বজ্রনিঘোষ চিৎকার করে বলে উঠলো- গোল, গোল, গোল। আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আমি দুই হাত উঁচু করে উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করতে বললাম আপনারা বসুন। গোল হয়নি, অফসাইড হয়ে গেছে। রেফারি অফসাইটের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নিমেষে উত্তেজনা থেমে গেল। হতচকিত লক্ষ-জনতা। আমি প্রত্যয়ের চিত্তে পরিশুদ্ধ আত্মায় বিশুদ্ধ শব্দ চয়নের মাধ্যমে বললাম, খেলাটি ধরেন এইভাবে সাজানো। ওপক্ষে ফরোয়ার্ডে খেলছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। আমাদের ফরোয়ার্ডে নিখুঁত ও নির্ভীক খেলোয়াড় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধরুন, শাজাহান সিরাজ ব্যাকে। জনাব আবদুল কুদ্দুস মাখন হাফ ব্যাকে। একটু বাঁকা বাঁকা বিপ্লবের কথা বলেন। আসম আব্দুর রব লেফট আউটে। আমি একটু যুক্তি দিয়ে কথা বলি, ধরুন রাইট আউটে খেলছি। গোলকিপার শাজাহানের পায়ে বল গড়িয়ে দিলো। শাজাহান সিরাজ মাখনকে বল দিলে মাখন রবকে পাস দেবে। রব বলটি আমার কাছে দিয়ে দেবে। আমি চৌকস গোলদাতা মুজিব ভাইকে বলটি পাসের মাধ্যমে সাজিয়ে দেবো। আর বঙ্গবন্ধু ওদের ডিফেন্সকে ডিঙিয়ে নিখুঁতভাবে গোলটি দিয়ে দিলেন। কিন্তু পায়ে বল নেই। গোলের প্রত্যাশায় ব্যাক থেকে ওঠে এসে বিপরীত দলের গোল পোস্টের কাছে শাজাহান সিরাজ ঘাপটি মেরে থাকলে বঙ্গবন্ধু গোল দিলেও সেটি অফসাইড হয়ে যাবে। সে এক অবিস্মরণীয় অদ্ভুত দৃশ্য। সমস্ত পল্টন ময়দান একযোগে আওয়াজ করলো নো, নো, নো- অফসাইড। আমি সুকৌশলে বললাম, নির্বাচনী ম্যান্ডেট ছাড়া যেকোনো শক্তিশালী আন্দোলনই অফসাইড গোলের মতোই। সত্তরের ম্যান্ডেটই আমাদের বৈধ গোলের অধিকার এনে দেবে। সমস্ত পল্টন ময়দানের উচ্চকিত আওয়াজ সত্তরের নির্বাচন, বাঙালির অর্জন, শেখ মুজিবের গর্জন, সত্তরের নির্বাচন। আমি সুযোগটা পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে সমস্ত পল্টনের জাগ্রত জনতাকে সঙ্গে নিয়ে শপথ বাক্য পাঠ করালাম। সত্তরের নির্বাচনের ম্যান্ডেট নিয়ে বাঙালির মুক্তির চেতনাকে শানিত করা এবং স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে এই নির্বাচনের নিরঙ্কুশ ফলাফলের দ্বারা সমস্ত বিশ্ব জনমতকে আমাদের স্বপক্ষে আনার অভিপ্রায়ে এই সভা সত্তরের নির্বাচনে অংশগ্রহণের শপথ গ্রহণ করছে এবং সেই সঙ্গে ঘোষণা করছে অর্জিত ম্যান্ডেটের শক্তিতে উজ্জীবিত শেখ মুজিবের আহূত যেকোনো আন্দোলনের ডাকে সাড়া প্রদানের জন্য আমরা শপথ গ্রহণ করছি। আমরা বঙ্গবন্ধুর সত্তরের নির্বাচনে অংশ নিলে সর্বপ্রকার সহযোগিতা করতে কোনো প্রকার দ্বিধা সংকোচ করবো না- এই প্রতীতি ঘোষণা করছি।
সভা শেষে বত্রিশ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখলাম প্রচণ্ড উচ্ছ্বসিত, উৎসাহিত। একটা প্রচণ্ড গৌরবে তার মুখটা যেন জ্বলজ্বল করছে। আমি নাটকীয়ভাবে তাকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে বুকে টেনে নিয়ে আমার কপালে একটি চুমু খেয়ে বললেন, নির্বাচনে আমার বিজয় হয়ে গেছে। আলম পল্টন ময়দানে সেই বিজয়ের রথটি প্রস্তুত করে দিয়েছে। নির্বাচনের পথে আমার অবিচ্ছিন্ন অভিযাত্রায় ও বিজয়ে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। নির্বাচন প্রশ্নে কোনো স্তরেই আর কোনো প্রতিবন্ধকতা রইলো না। সমস্ত দ্বিধা সংশয় যেন অবলুপ্ত হয়ে গেল। সত্তরের নির্বাচনের সিংহদ্বার মুজিব ভাইয়ের জন্য উন্মুক্ত হয়ে গেল। আর সেই নির্বাচন জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের প্রদত্ত ম্যান্ডেট পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের ৩০০টি আসনের ১৬৫টি আসনেই বঙ্গবন্ধুর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণে এলো। এই বিজয় ও ম্যান্ডেটই ছিল মুক্তি আন্দোলনের বিস্তীর্ণ পথে আমাদের অমূল্য পাথেয়। পয়লা মার্চে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন, ২রা মার্চে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চে পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, ৭ই মার্চে রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের অমূল্য সম্পদ সেই মহা মূল্যবান ভাষণ প্রদান গোটা মার্চের সামগ্রিক কর্মসূচি প্রদানের মাধ্যমে আন্দোলনের একেকটি সোপান তৈরির প্রণোদনা ২৩শে মার্চের স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক পতাকা উত্তোলনের অধিকার এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের সকল উপাদান তৈরি করে মূলত সত্তরের নির্বাচন এবং তার নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘কোটার কারণে দেশের মেধাবীরা আজ বিপন্ন’

১০০০০০ অবৈধ বাংলাদেশিকে ফেরাতে প্রণোদনা দেবে ইইউ

ট্রাম্প প্রশাসন আটকে গেছে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গুলিতে নিহত ১

মেয়র আইভী আশঙ্কামুক্ত

নেপথ্যে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

উপযুক্ত সময়ে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা

সহায়ক সরকারে বিএনপির অংশগ্রহণ থাকবে না

তিনি তখন টেলিফোন অন রাখতেন

টঙ্গীমুখী মানুষের স্রোত

‘চোখের সামনে বাবাকে মরতে দেখেছি বাঁচাতে পারিনি’

ওটা যেন আমার মৃত্যু পরোয়ানা ছিল

ভালো নেই বৃক্ষমানব মুক্তামণির পরিবারও দুশ্চিন্তায়

সিলেট-৩ আসনে মনোনয়ন আদায় করে ছাড়ব

‘সহায়ক সরকারে বিএনপির অংশগ্রহণ থাকবে না’

কারাবন্দি বাবাকে দেখে ফেরার পথে প্রাণ গেল ছেলের