একাত্তর: আগে-পরে, ৭

শেখ সাবকো সাথ রেহেনেকা মওকা মিলেগা

মত-মতান্তর

কাজল ঘোষ | ৮ জানুয়ারি ২০১৮, সোমবার
গ্রেপ্তার করে যখন তেজগাঁ থানায় আনা হয় তখন বুঝতে বাকি রইলো না আমি তাদের টার্গেট ছিলাম। ওসি যখন সিটি এসপিকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছেন তখন তার মধ্যে একটি বাড়তি উত্তেজনা কাজ করছিল। তবে ওসি, সিটি এসপি সবার ব্যবহারে বিস্মিত হয়েছিলাম। থানার কয়েদখানায় না রেখে আমাকে সামনেই রাতভর বসিয়ে রেখেছিলেন ওসি। অন্যদিকে কোনো রকম হ্যান্ডকাফ না পরিয়ে সিটি এসপি তার পাশে বসিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন জেলখানায়। তবে খুশি হয়েছিলাম সেলে নেয়ার পথে হাবিলদার যখন উর্দু ভাষায় জানালো ‘শেখ সাবকো সাথ রেহেনেকা মওকা মিলেগা।’ এমন নানা ঘটনার সাক্ষী স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী।
তার দেয়া সাক্ষাৎকারের আজ পড়ুন সপ্তম কিস্তি:
মানুষের জীবনে নানাভাবে সৌভাগ্যের পরশ লাগে। এই সৌভাগ্য যে কতখানি আকাঙ্ক্ষিত, পবিত্রতর এবং হৃদয়ের অনুভূতিকে কতটুকু আবেগ আপ্লুত করে সেটা বলে বুঝানো দুষ্কর। ১৯৬৬ সালে সম্ভবত ৯ই জুন তেজগাঁওর একটি রেস্তোরাঁ থেকে আমি গ্রেপ্তার হই। অনুজপ্রতিম কামরুজ্জামান টুকু আমার সঙ্গে ছিলেন। তিনিও গ্রেপ্তার এড়াতে পারেননি। তার গ্রেপ্তারটি অনেকটা আমার প্রতি অনুরাগবশত। আমি গ্রেপ্তার হবো তিনি মুক্ত জীবনযাপন করবেন এটা মন থেকে মেনে নিতে পারেনি বলে টুকু স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার বরণ করেন। তার গ্রেপ্তারের ঘটনাটি নিতান্ত ছেলেমানুষি। আমাকে গ্রেপ্তার করে যখন গাড়িতে ওঠাচ্ছিল তখন সন্তর্পণে সঠকে পড়াতো দূরে থাক তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন এই যে আমিও ওনার সঙ্গে- আমাকেও নিয়ে চলুন। আমি বিরক্ত হইনি বরং খুশিই হয়েছিলাম। তখন আমি নিজেও জানতাম না ডিপিআর-এ (ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস) এতদিন বন্দি থাকতে হবে। তেজগাঁও থানায় যখন আনা হলো তখন ফোন করে ওসিকে অফিসে নিয়ে এলে তিনি তো আনন্দে আটখানা। বুঝলাম, আমি ওদের টার্গেটে ছিলাম। তিনি ফোন করে সিটি এসপিকে আমার গ্রেপ্তারের খবর দিলেন। তার সে কী উচ্ছ্বাস। সিটি এসপিকে ফোন করার সময় তিনি উত্তেজনায় মনে হয় কিছুটা কাঁপছিলেন। তখন সময় অনেকটা ভোরের দিকে। সিটি এসপি ভদ্রলোক ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে থানায় এসে পৌঁছলেন। আমি ওসি সাহেবের সামনে একটি চেয়ারে নিদ্রা বিজড়িত চোখে ঝিমুচ্ছিলাম। সিটি এসপি ভদ্রলোক পশ্চিম পাকিস্তানের। পিএসপিও বটে। এত চমৎকার বিনয়ী ভদ্রলোক খুব কম দেখেছি। আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র। তখন পূর্ব-পাকিস্তানব্যাপী সলিমুল্লাহ হলের ঐতিহ্যই ছিল আলাদা। ওই হলে রেসিডেন্ট ছাত্ররা সাধারণত সিনিয়র সুপিরিয়র সার্ভিসে উৎরে যেতেন। প্রশাসনেও তাদের বিরাট দখলদারিত্ব ছিল। থানায় সিটি এসপি সাহেব যখন জানলেন আমি সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র তখন আমার প্রতি তার সমীহ ও সহানুভূতি অনেকটাই বেড়ে গেল। তিনি নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে আমাকে নাস্তা খাওয়ালেন। চা না কফি খাব জিজ্ঞেস করলেন। আমি চা কফিতে তেমন অভ্যস্থ ছিলাম না, তাই না করলাম। এসপি সাহেবের ব্যবহার সৌজন্যমূলক দেখে ওসি সাহেব বোধহয় মহা দুশ্চিন্তায় পড়লেন। অবশ্য এর আগে তিনিও কোন দুর্ব্যবহার করেননি। বরং যথেষ্ট সমীহ করেছেন। আমাকে থানার হাজতে না পাঠিয়ে তার সামনেই বসিয়ে রেখেছেন। তখনকার দিনে এটা আমার জন্য অনেক পাওয়া। যাই হোক সিটি এসপি সাহেব (দুঃখিত নামটি স্মরণ নেই) কোনো কড়া কথাতো দূরে থাক বন্ধুসুলভ আচরণ করতে লাগলেন। খোশগল্পের মাঝে শুধু একবার বলেছিলেন এসএম হলের ছেলেরা এত সিরিয়াস রাজনীতি করে ধারণা ছিল না। তার ব্যবহারে আমি এতোটাই মুগ্ধ ছিলাম যে, আমি বিমুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। আমার দু’ চোখ ভরে প্রচণ্ড ঘুমের জড়তা। কথা বলতে বলতে আমার মধ্যে ঘুমের ঝিমুনি আসছিল। লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “ফড় ুড়ঁ ধিহঃ ঃড় ংষববঢ় ভড়ৎ ধ যিরষব’ উত্তরে, আমি বলেছিলাম- ্তুঢ়ষবধংব ংবহফ সব ঃড় লধরষ’। তিনি মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন আপনি কি করে জানেন যে, আপনাকে জেলেই পাঠানো হবে। আমি নিরুত্তর ছিলাম। তিনি এদিক ওদিক দু’-একটি ফোন করে পরে তার গাড়িতে করেই আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে পৌঁছে দেন। তিনি গাড়ি চালাচ্ছিলেন আমি তার পাশে বসা ছিলাম। তবে স্পষ্ট মনে আছে আমার হাতে হ্যান্ডকাপ ছিল না। ওনার গাড়িতেও কোনো পুলিশ ছিল না। আমি পালিয়ে যেতে পারি এমন কোন আশঙ্কাও তার ছিল না। অন্যদিকে পালিয়ে যাওয়ার কোন অভিপ্রায়ও আমার ছিল না। তখনকার দিনে জেলখানা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকেই উজ্জ্বলতর করতো। তিনি জেলখানার ভেতরে গিয়ে জেলার সাহেবের রুমে গিয়ে বিস্তারিত বুঝিয়ে আসার সময় আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন। আমি ক্রমেই বিস্মিত হচ্ছিলাম আমার ধারণা ছিল কারাগারে হস্তান্তরের আগে আমাকে ভীষণভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের মনের মতো কথা আদায়ের জন্য আমাকে নির্যাতনও করা হতে পারে। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। এবং দীর্ঘ ৩৩ মাস কারাজীবনে সেই দফায় আমাকে কখনোই জিজ্ঞাসা করা হয়নি (ইন্টারোগেট)। এর আগে বহুবার আমি জেলে এসেছি, মুক্ত হয়েছি। তবে বিভিন্ন মামলায় বিচারাধীন আসামী হিসেবে। এই প্রথমবার রাজবন্দির মর্যাদা পেলাম। রাজবন্দিদের ডেপুটি জেলার ছিলেন তোফাজ্জল হোসেন আর হাবিলদার ছিলেন নাজির আহমদ। তোফাজ্জল সাহেব অত্যন্ত কম কথা বলতেন। আমাদের বিরুদ্ধবাদী না হলেও অনেকটা সরকার ঘেঁষা। তবে কখনই কোনো রূঢ় আচরণ করেননি। সে যাই হোক হাবিলদার সাহেব আমাকে চিনতেন। তিনি ভালো বাংলাও জানতেন। তিনি আমাকে কৌতুক করে বললেন, ‘বার বার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ।’ হাসতে হাসতে তিনি আরও বললেন, জেলের মধ্যে জেল তারে বলে সেল। আপনাকে সেলে রাখার সিদ্ধান্ত আছে (উল্লেখ্য, তখন রাজবন্দিদের এসোসিয়েশন হলও ছিল। সেখানে বিনোদনের অনেক সুযোগ সুবিধা ছিল)। তার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যখন ২০ নম্বর সেলের দিকে যাচ্ছিলাম তখন এক পর্যায়ে তিনি বললেন, তবে একটা সুবিধা আছে, ‘শেখ সাবকো সাথ রেহেনেকা মওকা মিলেগা।’ উচ্ছ্বাসে আমার লাফ দিতে ইচ্ছা করছিল। জেলখানায় নিজের উচ্ছ্বাসকে সংযত করেছিলাম। প্রাচীর ঘেরা একটি ফটক পেরিয়ে সেলের সীমানার দিকে মুজিব ভাইয়ের দেখা পেলাম। তিনি তার নিজস্ব ছোট একটি রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসছিলেন। লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে মাথার ওপরে তোয়ালেটা সৌদি স্টাইলে আলতো করে জড়ানো। সত্যি বলতে কি প্রচণ্ড উত্তেজনায় আমি সিরাজউদ্দোলার নাটক থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে নাটকের ভঙ্গিতে বললাম, ‘সুদিনের কাছাকাছি ফিরেছি। দুর্দিনেও কি তোমার থেকে দূরে থাকতে পারি বাংলার মুকুটহীন সম্রাট।’ কারাগার তাই আমাকে তোমার কাছে টেনে নিয়ে এলো। এটি আমার কোন ভাগ্য বিড়ম্বনা নয় পরম সৌভাগ্যের। আমি কথা দিলাম হে সম্রাট তোমাকে কারাগারে নিঃসঙ্গতায় রেখে আমি মুক্তি কামনা করবো না। কাকতালীয় হলেও সত্য ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় একসঙ্গেই আমরা মুক্তি পাই। ১০ই জানুয়ারি আমি আর মুজিব ভাই মুক্তি পান ২৪শে জানুয়ারি। সেটা যাই হোক আমাকে পুরনো বিশ নম্বর সেলে বন্দি রাখা হয়। খুব কাছাকাছি দেওয়ানিতে ছিলেন মুজিব ভাই। মুজিব ভাইয়ের নিজস্ব রান্নাঘর ছিল দেওয়ানি থেকে কয়েক গজ দূরে। দেওয়ানির অভ্যন্তরে সংযুক্ত টয়লেট ছিল। তবে গোসলখানা ছিল রান্না ঘরের পাশে। তিনি তার জন্য একটা মাঝারি ধরনের টেবিল, তিন চারটা হাতলঅলা চেয়ার, বারান্দায় একটি ইজি চেয়ার। পাশে ছড়ানো ছিটানো কয়েকটি চেয়ার ছিল। দেওয়ানীর সামনে ছোট একটি লন সেখানে ফুলের গাছ লাগানো হতো। মালিরা পরিচর্যা করলেও মুজিব ভাই তার পরিদর্শক বনে অনেকটা সময় পার করতেন। তিনি রান্নাঘরে গিয়ে খাওয়া দাওয়ার তদারকি করতেও পছন্দ করতেন। আমি তখন খাওয়ার ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলাম বলে তখনকার জেলের ২০ সেলের অন্যান্য রাজবন্দিরা বিশেষ করে মোয়াজ্জেম ভাই আমাকে খাদক বলে ডাকতেন। মোয়াজ্জেম ভাই, বাকি ভাই এরা কেউই স্থায়ীভাবে ২০ সেলের বাসিন্দা ছিলেন না। মোয়াজ্জেম ভাই রিটে মুক্তি পাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন মাসাধিককাল ২০ সেলে থাকেন। খুব রাশভারী মোয়াজ্জেম ভাই জেলখানায় খুবই প্রাণখোলা আমোদি লোক ছিলেন। বয়সের পার্থক্যটা জেলখানায় তেমন থাকতো না।
একদিন আমাদের মেডিকেলের সামনে খোলা জায়গাটায় মোয়াজ্জেম ভাই আর আমি হাঁটছিলাম। মুজিব ভাইয়ের শরীরটা একটু খারাপ ছিল। তিনি সেদিন হাঁটতে বের হননি। জেলখানায় আমাদের সেলের উত্তর দিকে একটা তিনতলা বাড়ি ছিল। তার ছাদে একটি মেয়ে প্রায়ই বিকালের দিকে দাঁড়িয়ে থাকতো। সম্ভবত কাজের মেয়ে। তার পোশাক-পরিচ্ছদে সেটিই স্পষ্ট বোঝা যেতো। রাশভারী মোয়াজ্জেম ভাই অতি কৌতূহলী মানসিকতায় আমাকে বললেন দ্যাখো ওই ছাদে একটি মেয়ে দেখা যায়। আমি তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটি সুন্দরীতো নয়ই কাজের মেয়ে। আমি ঠোঁট কাটার মতো বললাম, মোয়াজ্জেম ভাই, ওতো কুৎসিত, হয়তো কাজের মেয়ে। মোয়াজ্জেম ভাই, একটু রেগে গিয়ে বললেন, জেলখানা থেকে মেয়ের মুখ দেখছো এটিই অনেক বেশি। তোমার জন্য রেখা, পদ্মিনী ছাদে দাঁড়িয়ে থাকবে। আহ্লাদের আর জায়গা পাওনা।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

অভিযোগের পাহাড়, অসহায় ইউজিসি

প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না আজ

মৈত্রী এক্সপ্রেসে শ্লীলতাহানির শিকার বাংলাদেশি নারী

‘২০৬ নম্বর কক্ষে আছি, আমরা আত্মহত্যা করছি’

ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারালেন ঢাবি ছাত্র

পুলে যাচ্ছে সেই সব বিলাসবহুল গাড়ি

নীলক্ষেত মোড়ে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ, এমপির আশ্বাসে স্থগিত

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সফর সফল করতে নির্দেশনা

নেতাকর্মীরা জেলে থাকলে নির্বাচন হবে না: ফখরুল

তিন দিনের ধর্মঘটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা

ইডিয়ট বললেন মারডক

সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে

২৩শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

বাসায় ফিরছেন মেয়র আইভী

‘আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে’

জনগণ রাস্তায় নেমে ভোটাধিকার আদায় করবে: মোশাররফ