গাভীর হাম্বা রব যদি ভাষা হয়

মিডিয়া কর্নার

| ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:০১
প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক ফয়েজ আহমদের লেখা বহুল পঠিত গ্রন্থ ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’। ওই বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘গাভীর হাম্বা রব যদি ভাষা হয়’:

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্প পরেই পঞ্চাশের গোড়ার দিকে পূর্ব বাংলায় সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী ধারার দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। সে সময় থেকেই যদি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মীগণ এবং কবি-সাহিত্যিকদের গোষ্ঠী নিশ্চিত প্রচ- বিরোধিতার মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে না আসতেন, তবে হয়তো ত্রিশ বছর পর আজকের বাংলাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে একটি অধোগতি সম্পন্ন বিজাতীয় চরিত্রের উপস্থিতি দেখা যেতো। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিদেশমুখীতার বিরুদ্ধে যাঁরা রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বলীয়ান শক্তিধরদের তুলনায় তাঁরা ছিলেন মুষ্টিমেয়।
ধর্ম, উর্দু ভাষা ও আরবী হরফকে অবলম্বন করে সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াস অবশ্য পাকিস্তান আন্দোলনের সময় থেকেই প্রধানতঃ কোলকাতা শহরেই শুরু হয়। এ জাতীয় দর্শনে বিশ্বাসী কয়েকজন শক্তিশালী কবি-সাহিত্যিক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই পূর্ব বাংলায় আগমন করেন এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে নিজেদের বক্তব্য প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় ব্রতী হন। সে সময় প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘই প্রগতিবাদীদের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল, সাহিত্য শিল্পচর্চার সংস্থা।
আর কোন না কোন ভাবে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের আধুনিক শিল্প কর্মীগণ এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের কোপানলে পতিত এই প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠানটি ক্রমান্বয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত অকেজো হয়ে পড়ে।
কিছু সংখ্যক সাহিত্যিক, যাঁরা শাসককূলের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বাসযোগ্য ও দেশপ্রেমিক, শাসনযন্ত্রের বিশেষ মহলের উৎসাহে বিজাতীয় অপ্রচলিত শব্দ, (গোঞ্জায়েস ইত্যাদি) ভাবধারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জগতে প্রচলনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রগতি লেখক সংঘের অবলুপ্তির পর এই সমস্ত সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবীদের প্রতিরোধ করার মতো এই অঞ্চলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ঢাকাতে প্রগতিশীল লেখক শিল্পীগণ ছিলেন বিচ্ছিন্ন। কিন্তু প্রদেশের দু একটি স্থানে, যেমন চট্টগ্রাম বা কুমিল্লার সাহিত্যকর্মী ও সংস্কৃতিসেবীগণ সে তুলনায় অনেকটা বেশী সংঘবদ্ধ ও শক্ষিশালী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কয়েকটি কলেজের তরুণ ও প্রগতিশীল ছাত্র-সাহিত্যিক সে সময় থেকেই প্রগতি লেখক সংঘের শূন্য স্থান পূরণ করার উদ্দেশ্যে একটি প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা চিন্তা করতে থাকেন। একই সময় ঢাকার কয়েকজন অধ্যাপক ও সাহিত্যিকের উদ্যোগে উয়ারীর র‌্যাঙ্কিন স্ট্রীটস্থ ইঞ্জিনিয়ার দাস-এর বাড়ি ও হেয়ার স্ট্রীটে অধ্যাপক অমিয় চক্রবর্তীর বাসার ছোট ছোট সাহিত্য আলোচনা সভা বসত। এই সমস্ত সাহিত্যিক ও নতুন লেখকদের সমন্বয়ে তখনো কোন প্রগতিশীল প্রতিষ্ঠান ঢাকায় দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
(বর্তমানে আমাদের দেশে ভাষা, সংস্কৃতি ও দর্শনের যে বিকৃতি সাধনের চেষ্টা চলছে তা’ লক্ষণীয়।)
কিন্তু সরকারের পরোক্ষ বিরোধিতার মধ্যেও এই অঞ্চলে সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীদের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। একান্ন সালের ষোলই মার্চ থেকে ঊনিশে মার্চ পর্যন্ত হরিখোলার মাঠে এই ‘পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনে’ সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট প-িত আবদুল করীম সাহিত্য বিশারদ। সম্মেলন উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি কবি সুফিয়া কামাল এবং শিল্পকলা শাখার সভাপতিত্ব করেছিলেন শিল্পী জয়নুল আবেদীন। চট্টগ্রামের সংস্কৃতি পরিষদ ও প্রান্তিকের যুগ্ম প্রচেষ্টায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এই সম্মেলনের প্রস্তুতি ও অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবুল ফজল, যুগ্ম-সম্পাদক শওকত ওসমান ও সায়দুল হাসান (মুক্তিযুদ্ধকালে শহীদ) এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব-উল আলম চৌধুরীর (সীমান্ত সম্পাদক) প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামে সেদিন প্রগতিশীল ও আধুনিক ভাবধারার সমধর্মী সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবীদের প্রথম সম্মীলন ঘটে। কোলকাতা থেকে এসেছিলেন ‘সত্যযুগ’ পত্রিকার সম্পাদক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার, দেবব্রত বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, সুচিত্রা মিত্র, হেনা বর্মণ প্রমুখ এবং আই, পি, টি, এ-র একটি গ্রুপ। চট্টগ্রামের বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘প্রান্তিক’ গণসঙ্গীত পরিবেশন এবং ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপ’ জয়নুল আবেদীন, কামরুল হাসান, শফিউদ্দিন আহমদ, হামিদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম ও আরো কয়েকজন শিল্পীর চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। সাফল্যম-িত এই সাংস্কৃতিক সম্মেলন স্বাভাবিকভাবেই প্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলে উৎসাহের সঞ্চার করতে সমর্থ হয়। প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এ ছিল সংগঠিত প্রথম কণ্ঠ।
এ সময় সরকার সমর্থক ‘আজাদ’ ও ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকায় সম্মেলনের তীব্র বিরোধীতা করে মন্তব্য করার ঢাকা থেকে শেষ পর্যন্ত এ, বি, এম হাবিবুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ সম্মেলনে উপস্থিত হননি। সম্মেলন যেন সরকারী রোষে বন্ধ করে দিতে না হয়, সে কথা বিবেচনা করে উদ্যোক্তাগণ শেষ পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনার এন, এম খানকে দিয়ে চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধনের আয়োজন করেন। ফলে সম্মেলন বন্ধ না হয়ে সরকার সমর্থক তুখোড় কাগজগুলোর কণ্ঠ বন্ধ হয়ে গেল।
সমসাময়িককালে ঢাকার সাহিত্যিকগণ প্রথমে পূর্বে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নামে একটি ক্ষুদ্র সাহিত্য সংস্থা গঠন করেন; তা’ ছিল সে সময় একান্তই ঘরোয়া বৈঠকের প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে বেশ কয়েকটি সাহিত্য সভা হয়েছিলো র‌্যাঙ্কিন স্ট্রীটে ইঞ্জিনিয়ার দাস বাবুর বাড়িতে। এর পরেই অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন কুমিল্লায়। কুমিল্লা প্রগতি মজলিশের উদ্যোগে টাউন হলে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন উদ্বোধন করেছিলেন অধ্যক্ষ আখতার হামিদ খান। বাহান্ন সালের বাইশ, তেইশ ও চব্বিশে আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের মূল সভাপতি ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি অজিত কুমার নন্দী এবং প্রধান সংগঠক অধ্যাপক আবুল খায়ের, অধ্যাপক আহসাবউদ্দিন ও জালাল উদ্দিন আহমদ (সানু) প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিদের এই সম্মেলন সাফল্যম-িত করে তোলার জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। মূল সম্মেলনের পরবর্তী চারটি অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মাহবুব-উল আলম, বেগম সুফিয়া কামাল, অবনী মোহন নন্দী ও কাজী মোতাহার হোসেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রান্তিক ও রেলওয়ে শিল্পী সংসদ, সিলেট থেকে মুসলিম সাহিত্য সংসদ এবং ঢাকা থেকে আর্ট গ্রুপ, অগ্রণী শিল্পী সংসদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংসদ এবং বগুড়া, রাজশাহীর কর্মীগণ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। ঢাকা থেকে আমাদের একটি বিরাট সাহিত্যিক ও শিল্পী দল সম্মেলনে অংশ নেয়। এদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক থেকে শুরু করে অতি নবীণ সাহিত্যিক-শিল্পীও ছিলেন।
কুমিল্লা সাংস্কৃতিক সম্মেলন প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত তরুণ ও প্রগতিশীল সাহিত্যিক কর্মীদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে। অপরদিকে গণমুখী ও প্রগতিশীল সাহিত্যিকদের এই সম্মেলন প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। প্রকৃতপক্ষে এই সম্মেলন ছিল সমগ্র প্রদেশের গণচেতনা সম্পন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন আরম্ভ করার মঞ্চ। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের শাসকদের প্রতিক্রিয়াশীল নীতির সমর্থক সাহিত্যিকদের প্রতাপের মুখোমুখী প্রগতিশীল সাহিত্য কর্মীগণ সে সময় রাজধানী ঢাকার দূরবর্তী সংস্কৃতি কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার প্রগতিশীল সাহিত্য কর্মীদের অপেক্ষা ঐক্যের দিক থেকে বহুলাংশে দুর্বল ছিলেন। কুমিল্লায় ঢাকার সংস্কৃতি সংসদ ‘জবানবন্দী’ নাটক অভিনয় করেছিল। এই সম্মেলনে ঢাকার আর্টস স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রদের একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এই ঈশ্বর পাঠশালার উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে দু’দিনব্যাপী রমেশ শীলের কবির গান ‘যুদ্ধ বনাম শান্তি’ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবীতে এবং শান্তির পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছিল।
তিনদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক সম্মেলনে বহুসংখ্যক প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠ হয়। হাসান হাফিজুর রহমান স্বরচিত কবিতা ‘হে আমার দেশ’ ও তাসিকুল আলম খাঁ ‘ভালোবাসি এই দেশকে’ পাঠ করেন। সৈয়দ নুরুদ্দীনের ‘পাকিস্তানের জাতীয় মুখচ্ছবি’ প্রবন্ধটি পঠিত হয় এবং মুস্তাফা নুর-উল ইসলাম বক্তৃতা করেন ‘আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্য’ সম্পর্কে। রাজনৈতিক নেতা কামিনী কুমার দত্ত ও আশরাফউদ্দিন চৌধুরী সম্মেলনে ভাষণ দান করেছিলেন। নেয়ামল বকসির ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তৃতীয় দিনের অধিবেশনে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন যথাক্রমে ‘তোমরা ও আমরা’ এবং ‘একুশের কবিতা’। ‘পূর্ব বাংলার শিশু সাহিত্য সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। অন্যান্য প্রবন্ধের মধ্যে ছিল ‘আমরা’ এবং ‘একুশের কবিতা’। ‘পূর্ব বাংলার শিশু সাহিত্য সম্পর্কে প্রবন্ধ পাঠের দায়িত্ব ছিল আমার উপর। অন্যান্য প্রবন্ধের মধ্যে ছিল বিজন চৌধুরীর ‘শিল্পের বিকাশ ধারা’ ও খালেদ চৌধুরীর ‘ইতিহাস ও যুদ্ধ’।
এই সম্মেলনের পরে পরেই ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ গঠিত হয়Ñ যার সভাপতি ছিলেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। সমস্ত শ্রেণীর প্রগতিশীল সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী এই প্রতিষ্ঠানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাহিত্য জগতে প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের সংহত করেন। সাহিত্য সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমাকে দায়িত্ব পালন করতে হলেও প্রকৃতপক্ষে হাসান হাফিজুর রহমানই ছিলেন-এর প্রধান সংগঠক। পরবর্তীকালে চুয়ান্ন সালে কার্জন হলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের যে ব্যাপক ভিত্তিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, তার মূল উদ্যোক্তার ভূমিকা পালন করে সাহিত্য সংসদ।
আজকে বাংলাদেশে যাঁরা সুপ্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক, তাঁদের অনেকেই এই সংসদের সাথে পঞ্চাশের যুগে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
পঞ্চাশের গোড়ার দিকে শক্তিহীন প্রগতিশীল ও শক্তিধর প্রতিক্রিয়াশীল এ দুই সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব চলছিল, সে সময় পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ এবং প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদী প্রতিষ্ঠানটিই প্রথম সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। সে সময় একগুচ্ছ যুবক ও প্রৌঢ় ব্যক্তিত্ব যেন একাত্ম হয়ে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। সে প্রকাশ ছিল প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে একদল সাহিত্য সংস্কৃতি কর্মীর বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের সহযাত্রী ড. কাজী মোতাহার হোসেন, অজিত গুহ, মুনীর চৌধুরী, সরওয়ার মুর্শেদ, সৈয়দ নুরুদ্দীন, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, সাঈদ আতীকুল্লাহ, আবদুল গাফফার চৌধুরী, আতাউর রহমান (রাজশাহী), আলাউদ্দিন আল-আজাদ, আনিসুজ্জামান, সরদার জয়েন উদ্দিন, আবদুল গণি হাজারী, বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল্লাহ আল মুতী, কামরুল হাসান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আমিনুল ইসলাম, তাসিকুল আলম খান, ফজলে লোহানী, মুর্তজা বশীর, লায়লা সামাদ, আতোয়ার রহমান, খালেদ চৌধুরী, আনিস চৌধুরী, শওকত আলী, সৈয়দ সামসুল হক প্রমুখ। এরা সে সময় সুস্থ ও বাস্তবধর্মী চিন্তা বিকাশের পরিম-ল গড়ে তুলেছিলেন।
সাহিত্য সংসদের সাথে সম্পর্কিত এই সমস্ত কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী দীর্ঘ দিনের সংগ্রামের পর আজ এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে প্রগতিশীল ধারার প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে সুখ্যাতির শিখরে প্রতিষ্ঠিত, যিনি আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন, কবি শামসুর রাহমান তখন থেকেই সংসদে আমাদের মধ্যে বিশেষ রূপে চিহ্নিত হয়ে আসছিলেন। সাহিত্য সংসদের সভায় ত্রিশ বছর পূর্বে তরুণ কবিকে দেখেছি আত্মপ্রত্যয়ের সাথে কবিতা পাঠ করতে। কিছু দিন পূর্বে গভীর রজনীতে বন্ধু-কবির কণ্ঠে আমরা কবিতা পাঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রয়েছি। সেই আদিকালে এই কবি সম্পর্কে ছড়ায় দু’টো লাইন লিখেছিলাম। সময়ের প্রবাহে স্মৃতি থেকে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল লাইন দু’টো। তিন দশক পর্যন্ত পরবর্তী পংক্তি পূরণ করা হয়নি: শামসুর রাহমান/তা’র সদা বহমান/কবিতার তটিনী। নবপদাবলী ও কবি কণ্ঠের যুগে সেদিন পূরণ করেছি পরবর্তী পংক্তি: শব্দের ঝংকারে/অথবা অলঙ্কারে/ছন্দের নটিনী।
প্রগতিশীল সাহিত্য-শিল্পী কর্মীগণ সাহিত্য সংসদকে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে একটি গণমুখী প্রতিষ্ঠান রূপে গড়ে তোলার জন্যে তাঁদের প্রতিভা নিয়োগ করেছিলেন। আরো এমন অনেক তরুণও বয়স্ক সাহিত্যিক ছিলেন, যারা সংসদের সাথে জড়িত না থেকেও সংসদের নিয়মিত সাহিত্য সভায় উপস্থিত থাকতেন।
এই সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠার পূর্ব থেকেই এক শ্রেণীর সরকারী সমর্থন-পুষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল সাহিত্যিক আমাদের বিরুদ্ধে নানাভাবে অভিযান চালিয়ে আসছিলেন। ফিরোজ খান নূন যখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, (বাঙালী মুসলমানদের সম্পর্কে অশোভন উক্তি করে যিনি নিন্দিত হয়েছিলেন) সে সময় বিরোধী সাহিত্যিকদের একটি দল চৌদ্দজন প্রগতিশীল সাহিত্যিক-সাংবাদিকদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন এবং কমিউনিস্ট বলে চিহ্নিত করে তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা অবলম্বন করার জন্যে গভর্নরের নিকট পেশ করেন। পরবর্তীকালে ঢাকার সাহিত্য সম্মেলনের সময় প্রভাবশালী একটি দৈনিকে ‘সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ’ শিরোনামে তিন দিনব্যাপী ধারাবাহিকভাবে সম্পাদকীয় প্রকাশ করা হয়। এই সমস্ত বিরোধীতার মধ্যে সাহিত্য সংসদ প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
সাহিত্য সংসদের পক্ষ থেকে নিয়মিত পাক্ষিক সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হতো। আমাদের প্রায় সবকয়টি এ জাতীয় সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সওগাত’ পত্রিকার পাটুয়াটুলিস্থ অফিসে। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক শ্রদ্ধেয় জনাব মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আমাদের এই সমস্ত সভার ব্যয়ভার বহন করতেন। সে সময় তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে সংসদের অগ্রগতি যে ব্যাহত হতো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। পাক্ষিক সাহিত্য সভায় কবি-সাহিত্যিকদের পূর্ব নির্ধারিত রচনা আলোচনা-সমালোচনা করতেন বিশিষ্ট সমালোচকা-সাহিত্যিকগণ। এই সমস্ত সাহিত্য সভা এমনই গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় ছিল যে, কোন কোন সময় দীর্ঘ তিন-চার ঘণ্টা চলার পরও শেষ হতো না। বৈঠকগুলোর প্রধান আকর্ষণ কবিতা, গল্প বা প্রবন্ধ পাঠ শুধু নয়, আলোচনাও। গঠনমূলক অথচ তীব্র ও কঠোর সমালোচনায় অনেক সময়ই অনেক সাহিত্যিককে বিব্রত যে হতে হয়নি, তা নয়।
আমাদের এই সাহিত্যিক গোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের তরুণ সাহিত্যিক ভিড় করেছিলেন। এদের অনেকেই তখনো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। মধুর স্টল থেকে শুরু করে পত্রিকার অফিস এবং শেষ পর্যন্ত ‘সওগাত’ অফিসে পৌঁছেও তাদের যে আলোচনার বিষয়টি দু’দিন পূর্বে শুরু হয়েছিল, তা অনেক সময় শেষ হতো না। কারো কারো জীবন সম্পর্কে ধারণাও ছিল বিচিত্র। কেউ কেউ কিছুই লিখতেন না, অলিখিত সমালোচনাই শিল্পকর্ম।
আমাদের এ ধরনের বন্ধু শশ্রুম-িত খালেদ চৌধুরী সাহিত্য সভায় প্রায়ই এসে অংশ নিতেনÑহাতে এক ঠোঙা পান। সাহিত্য সভাগুলোতে প্রায়ই সভাপতিত্ব করতেন ডঃ কাজী মোতাহার হোসেন, আমাদের সভাপতি। সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের জন্যে তাঁর পাশে বসে সেবকের ভূমিকা পালন করতাম আমি। ‘সওগাত’ অফিসের ‘বেগম ক্লাবের’ তখনকার চালার নীচে এমনি এক সভায় আমরা গুরুতর সাহিত্য আলোচনায় ব্যস্ত। সে মুহূর্তে আলোচনা চলছিল আমাদের এক বন্ধু সাহিত্যিকের একটি সদ্য রচিত গল্পের উপর। সওগাত সম্পাদক নাসিরুদ্দীন সায়েবের ব্যক্তিগত উৎসাহে অন্যান্য দিনের মতো আজও সবায় কালা চাঁদের মিষ্টি আসতে শুরু করেছে। গল্পটি আলোচনার শেষ পর্যায়েÑ সভার পেছন দিক থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, একটু গভীর।
বক্ষের নিম্নতল বেস থেকে শব্দ টেনে এনে যতো দূর সম্ভব ভারী কণ্ঠে বন্ধু খালেদ ক’টি কথা প্রকাশ করলেন: সভাপতি সায়েব, আমি কিছু বলতে ইচ্ছুক। (তাঁর বন্ধুরা জানেন, শব্দ প্রয়োগে ও উচ্চারণের ব্যাপারে তিনি কতোটা নিজস্ব ভঙ্গিতে চলেন।)
সভাপতির অনুমতির অপেক্ষা না করেই আমাদের প্রিয় বন্ধুটি অধৌত তাম্বুল রঞ্জিত পাঞ্জাবীর ঝুলন্ত পকেট দুলিয়ে সভার মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে সভাপতির দিকে অগ্রসর হলেন। জানতাম একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছেÑ অবশ্য বক্তব্যে।
তিনি সভাপতির পাশে দাঁড়িয়ে বললেন: সভাপতি সায়েব, গাভীর হাম্বা রব যদি ভাষা হয়, তবে এটি একটি গল্প।
শো-কেসের পুতুলের মতো সভাপতি ও আমি হতবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। স্তম্ভিত নির্বাক শ্রোতাদের মধ্য দিয়ে বন্ধু খালেদ পানের ঠোঙা হাতে করে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন। আলোচ্য গল্পের লেখক বন্ধু সাহিত্যিককে সভায় আর দেখা গেল না।

[আগামীকাল পডুন বইটির তৃতীয় অধ্যায় ‘এ আঘাত ততোটা ছিলা না’।]

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

সেনাপ্রধানের বাবার মৃত্যু

‘সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের’

ঢাবি’র ভিসি কার্যালয় ছাত্রলীগের ঘেরাও, ধর্মঘট ডেকেছে শিক্ষার্থীরা

লিবিয়ায় গাড়িবোমা হামলায় নিহত ৩৩

ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন মুয়েলার

আদালতে খালেদা জিয়া

পাথরঘাটায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৩

‘বাধ্য হয়ে অনেকে একই ধরনের চরিত্রে বারবার কাজ করছেন’

ছাত্রলীগে উদ্ধার ভিসি, শিক্ষার্থীদের ফের পিটুনি

ঘুষ নেয়ার সময় ধরা পড়ে নাসির বেরিয়ে আসছে আরো নাম

আদালতে খালেদার আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা

বিএসএফ জওয়ান গ্রেপ্তার

শিক্ষামন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে মন্ত্রিসভার সদস্যরাও নাখোশ

পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হামিদ না অন্য কেউ

এর পরও অনায়াস জয়

পলাতক জঙ্গি সাড়ে ৩ হাজার