সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারকে সহায়তার প্রস্তাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:৫০
আন্তঃসম্প্রদায়ের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা নিরসনে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফেরার পরিবেশ সৃষ্টিতে মিয়ানমারকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ। মঙ্গলবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্রিফিংয়ে এমন আহ্বান জানায় পরিষদ। এতে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘের শীর্ষ স্থানীয় কর্মকর্তারা। তারা বলেন, মিয়ানমারে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা নিরসনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিতে পারে মিয়ানমার। পাশাপাশি দেশের ভিতরে পুনরেকত্রীকরণ সহ অন্যান্য যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা মোকাবিলায় তারা জাতিসংঘের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করতে পারে। মিয়ানমার পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে এদিন ব্রিফিং করেন রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জেফ্রে ফেল্টম্যান।
তিনি বলেন, আমরা আশা করি জাতিসংঘ তার অভিজ্ঞতা দিয়ে মিয়ানমারকে সহায়তা করতে পারে এবং মিয়ানমার সেই সুযোগ ব্যবহার করবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ইউএন নিউজ সেন্টার। এতে বলা হয়, ২৫ শে আগস্ট মিয়ানমারে নৃশংসতা শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৬ লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের প্রতি বাংলাদেশ ও দেশের মানুষ যে উদারতা দেখিয়েছে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জেফ্রে। তিনি এ সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানান, তাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে। তার ভাষায়, তবে সমস্যার মূল কারণ নিহিত রয়েছে মিয়ানমারে এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানও রয়েছে সেখানে। জবাবদিহিতা, বৈষম্যহীন আইন, রাখাইনে বসবাসকারী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের বিষয়টি মাথায় নিয়ে জননিরাপত্তার বিষয়টি চিহ্নিত করা না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো ও সেখানে পুনরেকত্রীকরণ নীতি ব্যর্থ হবে। এক্ষেত্রে বড় একটি অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি। সেটা হলো রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ২৩ শে নভেম্বর সম্পাদিত প্রত্যাবর্তন বিষয়ক চুক্তি। তিনি এ সম্পর্কে বলেছেন, এ চুক্তির অধীনে ব্যাপক ও টেকসই সমাধান খুবই প্রয়োজন। এর অধীনে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টির স্বীকৃতি প্রয়োজন। জেফ্রে ফেল্টম্যান বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া অবশ্যই পুনরেকত্রীকরণের মাধ্যমে সমর্থিত হতে হবে। আর এর কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকতে হবে রাখাইন এডভাইজরি কমিশনের সুপারিশের বাস্তবায়ন। এ কমিশনের নেতৃত্বে ছিলেন জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান। তিনি আগস্টে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের সব রকম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে। এ ছাড়া পুরো রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থাগুলোর অবাধ ও পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার দিতে বলা হয়। এই কমিশন গঠন করেছিলেন মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সুচি। উল্লেখ্য, সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা শুরুর পর জেফ্রে ফেল্টম্যান অক্টোবরে মিয়ানমার সফর করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বৈঠকে জানান, ওই সফরে আমরা কথা বলেছি মিয়ানমারের সেনা কর্তৃপক্ষসহ সব শ্রেণির নেতাদের সঙ্গে। তাদের প্রতি আমরা আহ্বান জানিয়েছি যেন জাতিগত ঘৃণা ও সহিংসতা উস্কে দেয় এমন বক্তব্য বা কর্মকা-ের নিন্দা জানানো হয়। আমরা তাদেরকে উৎসাহী করেছি। বলেছি, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে উত্তেজনা বিরাজমান তা নিরসনে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সৃষ্টি করতে হবে এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ যার অধীনে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে পারেন। এক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়েও পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। জেফ্রে ফেল্টম্যান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ব্রিফিংয়ে জানান, ২০২০ সালে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। সেটা হবে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূত হওয়ার পরীক্ষা। তিনি আরো জানান, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ একটি রেজুলেশন অনুমোদন করার আশা করছে। এর মাধ্যমে মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ দূত নিয়োগের জন্য অনুরোধ করা হবে মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁকে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের মধ্যে অংশীদারিত্ব আরো শক্তিশালী হবে। এ অঞ্চলে ও এর বাইরে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে শলাপরামর্শ করা যাবে। তিনি বক্তব্যের শেষে বলেন, আমরা মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। তারা যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তাতে তাদেরকে সহায়তার প্রস্তাব করছি আমরা। এর আগে ৬ই নভেম্বর মিয়ানমার পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্সিয়াল স্টেটমেন্ট বা বিবৃতি গৃহীত হয়। তারই ফলোআপ মিটিং ছিল মঙ্গলবারের ব্রিফিং। প্রেসিডেন্সিয়াল ওই বিবৃতিতে এটা গৃহীত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করতে অনুরোধ করা হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবকে।
মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে উপস্থিতি ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিবের সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি প্রমিলা প্যাটেন। তিনি ৫ থেকে ১৩ই নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করেছেন। তিনি ব্রিফিংয়ে রাখাইনে রোহিঙ্গা নারী ও বালিকারা যে যৌন নৃশংসতার শিকার হয়েছে সে প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বলেন, এসব যৌন নির্যাতনের কথায় হৃদয় ভেঙে যায়। ভয়াবহ সেসব কথা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরগুলোতে থাকা যেসব নারী ও বালিকা তার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন, তাদের সবাই হয়তো নৃশংস যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, না হয় প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের অনেকে দেখেছেন ধর্ষণ করে আক্ষরিক অর্থেই নারীদের মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, এমন ভয়াবহ বর্ণনা থেকে দেখা যায় যে, আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার বিষয়ক আইনকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। দেশ থেকে বের করে দেয়ার একটি ফ্যাক্টর হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে যৌন সহিংসতাকে। অনেককে মিয়ানমার ছেড়ে যেতে হুমকি দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তারা মিয়ানমারের নাগরিক নন। প্রমিলা প্যাটেন বলেন, মৌলিক নিরাপত্তা ও অধিকারের গ্যারান্টি সহ এসব রোহিঙ্গার নিরাপদে ফিরে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তা না হয় তাহলে সহিংসতা, দায়মুক্তি ও জোর করে বাস্তুচ্যুত করার এই অমানবিক ঘটনা আবারও ঘটার ঝুঁকি রয়ে যাবে, যদি উল্লেখ করা বিষয়গুলোর পরিবর্তন না হয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন