চুক্তি বাতিলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের চিঠি

প্রথম পাতা

মানবজমিন ডেস্ক | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:০১
রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানো নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সদ্য সমপাদিত চুক্তি প্রত্যাহার করে নতুন চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এতে বলা হয়েছে, সমপাদিত ওই চুক্তি অনুসারে, ২০১৮ সালের ২৩শে জানুয়ারির মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার কথা রয়েছে। তবে ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য নির্ধারিত সময়য়সীমার মধ্যে তাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় ফিরিয়ে নেয়া অসম্ভব। ফলে, সমপাদিত ওই চুক্তিটি প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলি ও মিয়ানমারের ইউনিয়ন মিনিস্টার কাইওয়া তিন্ত শয়ে’র কাছে লেখা এক চিঠিতে এ আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। চিঠিটি লিখেছেন রিফিউজি রাইটস প্রোগ্রামের পরিচালক বিল ফ্রেলিক ও এশিয়া বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ব্র্যাড এডামস।
এতে সমপাদিত চুক্তি সমপর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এতে আন্তর্জাতিক আইনগুলোর মৌলিক নীতি অনুসরণ করা হয়নি। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত নেয়ার ওই বিশাল প্রক্রিয়া সমপন্ন করতে আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তার দরকার হবে। ওইসব দাতাদের উচিত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারকে নিমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করা। যাতে করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে নতুন একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সমপাদন করা যায়।
এই বছরের আগস্ট মাস থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৬ লাখ ৪৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এমন ২০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের অনেকেই বলেছে, তারা ভবিষ্যতে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু তারা এটা বিশ্বাস করে না যে, খুব শিগগিরই সেখানে ফিরে যাওয়াটা তাদের জন্য নিরাপদ হবে। অন্তত, যতদিন না তাদের নিরাপত্তা, জমি ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হবে ততদিন তাদের জন্য সেখানে ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়। ফ্রেলিক বলেন, মিয়ানমার এখনো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। তাদের সেখানে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়ার পরিবেশ তৈরি করাতো দূরের কথা। তিনি বলেন, এই চুক্তি দেখে মনে হয় যে, মিয়ানমার এই কুৎসিত অধ্যায়টি দ্রুত শেষ করতে চায়। রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরিয়ে দেয়া ও সেখানে তাদের নিরাপদে, স্বেচ্ছায়, সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো যথাযথ প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ২৩শে নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার রাখাইন ‘রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া’ বিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। চুক্তিটি করা হয় গত বছরের ৯ই অক্টোবর ও এই বছরের ২৫শে আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রাখাইন নিবাসীদের পক্ষ হয়ে। চুক্তিতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতরা কেন বাস্তুচ্যুত হয়েছে সেদিকে কোন ইঙ্গিত করা হয় নি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, গণ-অগ্নিসংযোগের নামে সামরিক অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এই সব মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমান। শুধু এই নয়, চুক্তিতে এমনকি রোহিঙ্গাদের, ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘শরণার্থী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়নি।
এই চুক্তিতে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার ঢল থামাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি ফুটে উঠেছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দেয়- কারণ, সবারই নিজ দেশের নির্যাতন থেকে পালোনোর অধিকার রয়েছে। এই চুক্তিতে ‘ননরিফাউলমেন্টের’ বিষয়ও সরাসরিভাবে উল্লেখ করা হয়নি। উল্লেখ্য, ননরিফাউলমেন্ট নীতি অনুসারে, কোনো শরণার্থীকে এমন কোনো জায়গায় জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে ফেরত গেলে তার জীবন ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এ ছাড়া, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ওই রাজ্যের বিদ্যমান আইন ও নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওইসব আইনের মধ্যে অনেকগুলো রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের জন্য দায়ী। মিয়ানমারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে শিবিরে রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। এটা অগ্রহণযোগ্য। কেননা, ওইসব শিবির পূর্বে রোহিঙ্গা-বিরোধী সহিংসতার সময় তাদের কার্যত আটকে রাখা ও নির্যাতন করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। এদিকে, চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছাকৃতভাবে ফেরত পাঠাতে ইউএনএইচসিআর’এর সহায়তা চাইবে, তবে মিয়ানমার এক্ষেত্রে পুরোপুরি একমত প্রকাশ করেনি। মিয়ানমার এ বিষয়ে সম্মত হয়েছে যে, শুধুমাত্র প্রয়োজন হলে ও সঠিক সময় এলেই ইউএনএইচআরের সহায়তা চাওয়া হবে। ফ্রেলিক বলেন, ব্যাপক নির্যাতনের পর, রোহিঙ্গাদের  নিরাপদ ও স্বেচ্ছাকৃত প্রত্যাবর্তনের জন্য মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। এর মানে হচ্ছে এখানে ইউএনএইচআরের একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাকৃত প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি হচ্ছে জাতিসংঘের একমাত্র সংবিধিবদ্ধ সংস্থা।
হিউম্যান রাইটস বলেছে, চুক্তির গুরুতর অসঙ্গতির কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের উচিত  ইউএনএইচসিআর’কে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি তৈরি করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো। এতে ইতিমধ্যে বিদ্যমান কিছু বিধানের উল্লেখ থাকা উচিত। যেমন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছাকৃতভাবে তাদের নিজ বাড়িতে এবং তাদের মূল নিবাসের জায়গায় বা তার আশপাশে কোনো নিরাপদ জায়গায় বা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কোনো জায়গায় ফিরে যেতে উৎসাহিত করা। বর্তমান চুক্তি অনুসারে, মিয়ানমারকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গারা দীর্ঘ সময়ের জন্য কোনো অস্থায়ী জায়গায় বাস করবে না।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন