যোগ দেননি আওয়ামী লীগের ঝন্টু ও স্বতন্ত্র আসিফ

জনগণের মুখোমুখি রসিক মেয়র প্রার্থীরা

শেষের পাতা

জাভেদ ইকবাল, রংপুর থেকে | ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৪০
এক মঞ্চে জনগণের মুখোমুখি হয়েছেন রংপুর সিটি করপোরেশন মেয়র প্রার্থীরা। গতকাল রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ‘আমার ভোট আমি দেবো, দেখে শুনে বুঝে দেবো, যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করবো।’ এমন স্লোগানকে সামনে রেখে সকাল ১০টার এ আয়োজনে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন। এ সময় তাদের উপস্থিতিতে মাঠ হয়ে উঠে উৎসব মুখরিত। উপস্থিতিদের মাঝে একপর্যায়ে অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সবাইকে কালো টাকার মালিক, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মিথ্যাচারী, যুদ্ধাপরাধী, নারী নির্যাতনকারী, ভূমি দখলদার, ধর্ম ব্যবসায়ী, ঋণ বিল খেলাপি, সাজাপ্রাপ্ত  আসামি, চোরাকারবারী, মাদক ব্যবসায়ীদের ভোট না দেয়ার অঙ্গীকার করান। সিটি নির্বাচনের ৭ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে এতে অংশ নেন পাঁচ মেয়র প্রার্থী।
এরা হলেন- জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা (লাঙ্গল), বিএনপির কাওসার জামান বাবলা (ধানের শীষ), বাসদের আবদুল কুদ্দুস (মই), ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা (হাতপাখা) ও এনপিপির সেলিম আক্তার (আম)। এ অনুষ্ঠানে অংশ নেননি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু (নৌকা) ও জাপা থেকে বহিষ্কৃত নেতা হুসেইন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ (হাতি)। রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব প্রার্থীকে জনতার মুখোমুখি করার আয়োজন হলেও দু’প্রার্থীর না যাওয়া জনগণের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেক ভোটার অভিমত প্রকাশ করেন। ভোটারদের মধ্যে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, খেটে খাওয়া দিনমজুর, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন স্তরের জনতা ওই পাঁচ মেয়র প্রার্থীর কাছে প্রশ্ন করেন। নির্বাচিত হলে তারা সিটি করপোরেশন উন্নয়নসহ কি কি পদক্ষেপ নেবেন। এসব নানা প্রশ্নের উত্তর দেন প্রার্থীরা তাদের পাঁচ মিনিটের বক্তব্যে।
জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা তার বক্তব্যে বলেন, আমি নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ ছাড়া শ্যামা সুন্দরী খালটি সংস্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করে যানজট নিরসন এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে পুরাতন সদর হাসপাতালটি চালু করা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করলে নির্বাচন সুষ্ঠু সম্ভব। আমি চাই তারা সে কাজটি করবেন।
বিএনপির কাওসার জামান বাবলা তার বক্তব্যে বলেন, আমি নির্বাচিত হলে দুর্নীতিমুক্ত পরিচ্ছন্ন সিটি করপোরেশন উপহার দেব। তিনি বলেন, আমি দুর্নীতি করব না কাউকে দুর্নীতি করতে দেব না। মাদকমুক্ত এবং রাস্তাঘাটের উন্নয়ন অগ্রাধিকার পাবে। এরপর বেকার সমস্যার সমাধান করব। শিক্ষার উন্নয়নে যা যা করা দরকার আমি তাই করব। ধানের শীষের এ প্রার্থী আরো বলেন, আমি সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত রয়েছি। কারণ এই সরকারের আমলে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। তাই আমি আবারো সিটি নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানাই।
বাসদের আবদুল কুদ্দুস বলেন, নির্বাচন কালো টাকার প্রভাব রয়েছে। যানজট নিরসনে অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দলীয় ও সন্ত্রাসমুক্ত সিটি করপোরেশন গড়ে তুলব। মেয়েদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। সমতামূলক সম উন্নয়ন নিশ্চিত করব।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের এটিএম গোলাম মোস্তফা বলেন, সিটি নির্বাচনে টাকা দিয়ে যাতে ভোট কিনতে না পারে সেজন্য প্রশাসনের নজরদারি থাকতে হবে। যানজট নিরসন ও বেকার সমস্যা সমাধানে আমার ব্যাপক কর্মসূচি থাকবে।
এনপিপির সেলিম আক্তার বলেন, নির্বাচিত হলে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুব্যবস্থা করব সিটিবাসীর জন্য। রাস্তা ঘাট সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করব।
এরআগে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। মহানগর সুজনের সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনার বেঞ্জুর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সুজনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, জেলা সভাপতি আকবর হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন প্রমুখ। পরে শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়।
আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির হাতাহাতি
রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে এখন উত্তেজনা বিরাজ করছে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপি নেতাকর্মী সমর্থকদের মাঝে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও হাতাহাতির ঘটনাসহ সংঘর্ষ হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। থানা পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রে জানা যায়, রংপুর জিলা স্কুল মাঠে মেয়র প্রার্থীদের অংশগ্রহণে নাগরিক ভাবনা শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোর। এতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু, জাতীয় পার্টি মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, বিএনপির মেয়র প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা, বাসদের মেয়র প্রার্থী আব্দুল কুদ্দুস ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান চলাকালীন সময় আওয়ামী লীগ সমর্থক ফেরদৌস আলম তার বক্তব্যে বলেন, রংপুরের উন্নয়ন যা হয়েছে তা শেখ হাসিনাই করেছে। জাতীয় পার্টির এরশাদ এ অঞ্চলে কোনো উন্নয়ন করেননি। এ সময় জাতীয় পার্টির মেয়র মোস্তফার সমর্থকরা তাদের নেতা সম্পর্কে বিরূপ বক্তব্য রাখা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও বক্তা তার বক্তব্যে এরশাদ বিরোধী বক্তব্য দিতে থাকে। এ সময় হট্টগোল দেখা দিলেও তা থেমে যায়। এরপর আবার জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর এক সমর্থক রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাপা প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা মেয়র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি উল্লেখ করে বলেন, আমি তার কাছে প্রশ্ন করতে চাই- বলা মাত্র আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে উঠেন এবং ওই ব্যক্তির কাছ থেকে নিউজ টোয়েন্টিফোরের বুম (মাইক্রোফোন) কেড়ে নিয়ে বলেন, এখানে কি এ কথা বলার জায়গা যে লাঙ্গল জিতবে! এর পরে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ও হাতাহাতিসহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অনুষ্ঠান পণ্ড হওয়ার উপক্রম হয়। এ সময় উপস্থিত মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় সঞ্চালক সামিয়া রহমান পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে বলেন, নির্বাচন মানেই বিশৃঙ্খলা। আপনারা উত্তেজিত হবেন না। শান্ত হন। পরে উপস্থিত সুধীজনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি (অপারেশন) মোক্তারুল আলমের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়ে শেষ পর্যন্ত থাকে। এ ব্যাপারে ওসি (অপারেশন) মোক্তারুল আলম জানান, অনুষ্ঠানের বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে আগে থেকে জানানো হয়নি। ওদিকে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও জোরালো হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঝন্টুকে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন