যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান মুখোমুখি হওয়ার পথে?

অনলাইন

জেমস এম ডরসি | ৯ ডিসেম্বর ২০১৭, শনিবার, ৯:২৫ | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫৯
সম্প্রতি নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে চরমপন্থীদের দাবির মুখে নতি স্বীকার করেছে পাকিস্তান সরকার। সরকার ও উগ্র-রক্ষণশীল দলগুলোর মধ্যে এই বিরোধ মীমাংসায় মধ্যস্থতা করেছে সেনাবাহিনী। এরই মধ্যে গৃহবন্দীত্ব থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে জঙ্গি নেতা হাফিজ সাঈদকে, যিনি কিনা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। এই দুই ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।
এই দুই ঘটনায় আরও ইঙ্গিত দেয় যে, কয়েক দশক ধরে সৌদি সমর্থন ও সরকারের আস্কারা পেয়ে উগ্রবাদী সুন্নি মতাদর্শধারীরা রাষ্ট্রের ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশে ঢুকে পড়েছে। যেসব অংশকে ভাবা হতো কম রক্ষণশীল, সেখানেও এখন উগ্রপন্থীদের আনাগোনা। ফলে প্রশ্ন জাগছে, ক’দিন বাদে যখন আমেরিকা ত্রাণ সহায়তা হ্রাস করবে, বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হবে কিনা।
অতীতে, এ ধরণের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের ভয়ে হলেও কর্তৃপক্ষ চরমপন্থীদের নির্মূলে সচেষ্ট থাকতো।
এই দুই ঘটনা থেকে আরও ইঙ্গিত মেলে যে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘মধ্যপন্থী’ ইসলাম অনুসরণের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে সৌদি আরব উগ্রবাদীদের যে বিপুল সহায়তা দিত, তা রাতারাতি বন্ধ হয়ে যাবে না।
ইসলামাবাদ সফরে গিয়ে এসব নিয়ে অভিযোগও করেছিলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস। কিন্তু আগের অনেক মার্কিন কর্মকর্তার মতো তিনিও খালি হাতে ফিরেছেন। ম্যাটিসের পাকিস্তান সফরের আগে, সিআইএ’র পরিচালক মাইকেল পম্পেও সতর্ক করে বলেছিলেন, তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শক্ত হাতে ব্যবস্থা নিতে পাকিস্তান ব্যর্থ হলে, যুক্তরাষ্ট্রই তা করবে। আর সেক্ষেত্রে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে আরও বেশি ড্রোন হামলা চালাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। এছাড়া, ত্রাণ সহায়তা কমানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার কথাও ভাবতে হবে। কিন্তু শুক্রবারই পাক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চীফ মার্শাল সোহেল আমান বলেছেন, পাকিস্তানের আকাশসীমায় কোনো মার্কিন ড্রোন দেখলেই ভূপাতিত করা হবে। তার এই অস্বাভাবিক কড়া মন্তব্য পাকিস্তানের মার্কিন নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
ম্যাটিস এমন সময় ইসলামাবাদ সফর করেছেন, যখন দেশটিতে উগ্র-রক্ষণশীলদের অবস্থান তুঙ্গে। অনেক চরমপন্থী রাজনৈতিক দল আগামী বছর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ভালো করার পথে। জাতিসংঘ ও আমেরিকার আইন মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হাফিজ মোহাম্মদ সাঈদ সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তার নবগঠিত দল মিলিলি মুসলিম লীগ (এমএমএল) আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে। অথচ, হাফিজ সাঈদকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১ কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা অনেক আগেই দিয়ে রেখেছে আমেরিকা।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাঞ্জাবের একটি উপনির্বাচনে লড়ে এমএমএল’র প্রার্থী ইয়াকুব শেখ চতুর্থ হয়েছিলেন। পাকিস্তানের কুখ্যাত ধর্ম অবমাননা বিরোধী আইনের বিরুদ্ধাচরণ করায় পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে হত্যা করেছিলেন মুমতাজ কাদরি নামে এক ব্যক্তি। সাজাপ্রাপ্ত এই ব্যক্তির গুনগান গেয়ে এসেছে তেহরিক লাব্বাইক ইয়া রাসুল আল্লাহ (টিএলআর) নামে একটি গোষ্ঠী। তাদেরই রাজনৈতিক দল তেহরিক লাব্বাইক পাকিস্তান (টিপিএল)-এর প্রার্থী শেখ আজহার হোসেন রিজভি পাঞ্জাবের ওই উপনির্বাচনে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। এই দুই প্রার্থী মিলে মোট ভোটের ১১ শতাংশ পেয়েছিলেন।
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে কুখ্যাতি পাওয়া চরমপন্থী গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈইবার রাজনৈতিক ফ্রন্ট হিসেবে পরিচিত জামাত উদ-দাওয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান হাফিজ সাঈদের সঙ্গে সৌদি আরব ও দেশটির সমর্থিত গোষ্ঠী আহল-এ-হাদিসের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলার হোতা হিসেবে সাঈদকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই হামলায় ১৬৪ জন নিহত হয়েছিলেন। ১০ মাস গৃহবন্দী থাকার পর তাকে মুক্তি দেয় পাকিস্তানের একটি আদালত। আদালত চত্বরের বিভিন্ন দেওয়ালে গ্রাফিতি একে দাবি জানানো হয়েছে ধর্ম-অবমাননাকারীদের গর্দান কাটা হোক।
অপরদিকে তেহরিক লাব্বাইক পাকিস্তান (টিপিএল) নির্বাচনী সাফল্য ছাড়াও বিশাল এক রাজনৈতিক সাফল্য পেয়েছে সম্প্রতি। ইসলামাবাদের প্রবেশমুখে দলটির কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান অবরোধের ফলে সরকার তাদের একটি দাবি মেনে নিয়েছে। এমনকি তাদের দাবি মোতাবেক আইনমন্ত্রীকে বরখাস্তও করেছে সরকার। এই বিরোধ নিরসনে সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করেছিল। এই ঘটনায় ইঙ্গিত মেলে যে, উগ্র-রক্ষণশীলদের কেবল জনপ্রিয়তা আছে তা নয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশও তাদেরকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
টিপিএল’র অবরোধকারীদের পেছনে সামরিক বাহিনী ছিল এমনটা অনেকেই অনুমান করেছিলেন। এমন ধারণা জোরদার হয়েছে একটি ভিডিও প্রকাশের পর। এতে দেখা যাচ্ছে, সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের পর যখন সরকার টিপিএল’র দাবি মেনে তাদের বিপুল সংখ্যক কর্মীকে মুক্তি দিয়েছিল, তখন দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী রেঞ্জার্সের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজহার নাবিদ হায়াত তাদেরকে বিদায় জানিয়েছেন। মুক্তিপ্রাপ্ত কর্মীদের হাতে ১ হাজার রূপি হস্তান্তরের সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এটি আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য উপহার। আমরা তো আপনাদেরই সাথে।’ আরেকজন বিক্ষোভকারীর গালে হাত বুলিয়ে তিনি বলেন, ‘ইনশাল্লাহ, আমরা সবাইকে মুক্তি পাইয়ে দেব। এই ব্যাগে এই টাকাই আছে। আরও আছে আরেক ব্যাগে।’
এদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সম্প্রতি মাদ্রাসা ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, তাদের শিক্ষাক্রম বিস্তৃত করতে যাতে করে পাস করে শিক্ষার্থীরা কিছু করতে পারে। পাকিস্তানের অনেক মাদ্রাসাই পরিচালনা করে জঙ্গিরা। সেনাপ্রধান নিজেও যেন তা স্বীকার করে নিয়েছেন। মাদ্রাসায় অধ্যায়নরত লাখ লাখ শিক্ষার্থীর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা সবাই কী হবে? তারা মৌলভি হবে, নাকি সন্ত্রাসী? পাকিস্তানে তো এত বিপুল পরিমাণ শিক্ষার্থীকে চাকরি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট মসজিদ নেই।’
জেনারেল বাজওয়া আরও বলেন, গত চার দশকে বেলুচিস্তান প্রদেশে স্কুলের চেয়ে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশি। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এসব মাদ্রাসায় শুধু ধর্মীয় শিক্ষা পড়ানো হয়। ফলে পেশাদার জীবনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা।’
বেলুচিস্তানে সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত অনেক উগ্রধারার মাদ্রাসা মূলত পরিচালনা করে শিয়া-বিরোধী জঙ্গিরা। বেলুচিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই মাদ্রাসার আধিপত্য অনেক বেশি। এমন একটি শিয়া-বিরোধী গোষ্ঠীর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সম্প্রতি বলেছেন, ‘বেলুচিস্তানের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়ে। বেলুচিস্তানের অন্যান্য স্কুলের চেয়ে তারা ভালো অবস্থায় আছে।’ বেলুচিস্তান ইরান সীমান্তবর্তী হওয়ায় এসব অঞ্চলের জঙ্গিদের সমর্থন দিতে কার্পণ্য করছে না সৌদি আরব। সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স সম্প্রতি বলেছিলেন, ইরান ও সৌদি আরবের পরবর্তী লড়াই আমাদের অভ্যন্তরে হবে না, হবে ইরানের অভ্যন্তরে। ধারণা করা হয়, ইরানের বিরুদ্ধে শিগগিরই সরাসরি এসব জঙ্গিদের কাজে লাগাবে সৌদি আরব।
দেশটির অনেক উগ্র মতাদর্শী ব্যক্তি গণমাধ্যম, সেনাবাহিনী এমনকি সরকারী শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত আছেন। তাদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠলে, তার সর্বোৎকৃষ্ঠ ফলাফল হিসেবে এসব জঙ্গিদের প্রতি সরকারী সমর্থনে ভাটা নামতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তানের এই চরমপন্থার সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতার সম্পর্ক। দ্বন্দ্ব থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধাংদেহী প্রশাসনে এ ধরণের পরামর্শ দেওয়ার হয়তো কেউই নেই।

(জেমস এম ডরসি একজন মার্কিন সাংবাদিক, ব্লগার ও শিক্ষক। তিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এস. রাজারতœম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ ফেলো। তার ব্লগে প্রকাশিত ‘অ্যা পাকিস্তান-ইউএস কলিশন ইন দ্য মেকিং’ শীর্ষক বিশ্লেষণের অনুবাদ করেছেন মাহমুদ ফেরদৌস।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

mohammed

২০১৭-১২-১০ ১৪:১১:৩৮

Thums Up Sohel Aman !

আপনার মতামত দিন