ধ্বংসের দোরগোড়ায় রাবার শিল্প

বাংলারজমিন

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ৮ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০৩
অব্যাহত দরপতন, চোরচক্র আর প্রশাসনিক ঝক্কিঝামেলা। এমন নানা কারণে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় এ জেলার রাবার বাগান মালিক ও শ্রমিকরা। দিন যত যাচ্ছে ততই বাড়ছে দুশ্চিন্তা। কারণ উৎপাদন ব্যয় অনুযায়ী হচ্ছে না আয়। তাই বছর জুড়ে পুঁজি খাটিয়ে লাভের মুখ দেখছে না চাষিরা। দীর্ঘদিন থেকে দাম কমে যাওয়ায় এই দুর্ভোগ।
এখন এ কারণেই দুর্দিনে পড়েছে এ অঞ্চলের রাবার শিল্প। সাদা সোনা হিসেবে খ্যাত রাবারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন এ জেলার বাগান মালিকরা। ইতিমধ্যেই ব্যক্তি মালিকানাধীন অনেক রাবার বাগান ধ্বংসের দোরগোড়ায়। আর অনেক বাগান মালিক লোকসান গুনতে গুনতে রাবার চাষই ছেড়ে দিয়েছেন। জানা যায় এ জেলায় চা বাগানের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে রাবার বাগান। লাভজনক এ শিল্পটি এ অঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছিল দিন দিন। গেল কয়েক বছর থেকে ব্যাহত হয়েছে বিকাশমান এ শিল্পের অগ্রযাত্রা। কারণ হঠাৎ করে ক্রমাগতভাবেই চলছে রাবারের দরপতন। আর এ কারণে আর্থিক টানাপড়েনে দিশাহারা রাবার চাষিরা। চলমান পরিস্থিতিতে চরম উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় মৌলভীবাজারের ছোট বড় অর্ধশতাধিক রাবার বাগান মালিক ও শ্রমিকরা। অনেক বাগান মালিক এখন দৈনিক মজুরিতে থাকা শ্রমিকদের বেতন আর বাগান পরিচালনার খরচ চালিয়ে যেতেও হিমশিম খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে বাগানগুলোতে প্রতিনিয়তই ছাঁটাই করা হচ্ছে শ্রমিক। কয়েক হাজার বাগান শ্রমিক প্রতিদিনই চাকরি হারানোর ভয়ে থাকছেন তটস্থ। দৈনিক মজুরির চাকরিতে থাকা অনেকেই চাকরি হারিয়ে এখন পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। প্রয়োজনের তুলনায় শ্রমিক কম হওয়াতে রাবার গাছগুলোর পরিচর্যা কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদনও। এমন বয়ে চলা নানা কারণে দেশের অন্যতম রাবার চাষের এ অঞ্চলটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখন উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্টরা। দিন দিন এ সংকট তীব্র হওয়ায় বাগান মালিকরা এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। অনেকেই রাবার গাছ কেটে তাতে ফলজ বা বনজ গাছের বাগান করার চিন্তা করছেন। বাগান মালিকদের এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবে রূপ দিলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। রাবার বাগান মালিকরা জানালেন এখন চলছে তাদের চরম দুর্দিন। গেল কয়েক বছর থেকেই রাবার শিল্পে এমন দুর্যোগের ঘনঘটা। হঠাৎ করে কাঁচা রাবারের দর কমে যায়। এখনো এমন অবস্থা চলমান থাকায় বাগান থেকে সংগৃহীত কাঁচা রাবার বিক্রি নিয়ে মালিকরা হতাশায় ভুগছেন। দাম বাড়ার আশায় বাগান মালিকরা আর্থিক বিরাট ক্ষতি থেকে বাঁচতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। কিন্তু  কিছুতেই বাড়ছে না দাম। চলতি মৌসুমের শুরুতে হাতে পর্যাপ্ত রাবার থাকার পরও ভালো দর না পাওয়াতে আর্থিক সংকটে বাগান মালিকরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বাগান মালিকরা জানালেন এখন ভর মৌসুম থাকায় কষ সংগ্রহের জন্য প্রতিটি বাগানে অতিরিক্ত শ্রমিক লাগছে। বাগানের উৎপাদিত রাবারে আয় দিয়ে পরিচর্যার নিয়মিত শ্রমিকদের পাশাপাশি অতিরিক্ত শ্রমিকদের বেতন দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। চরম আর্থিক সংকটে থাকা অনেক ছোট বাগানে চলমান মৌসুমে নিয়মিত শ্রমিকের বাহিরে রাখছেন না অতিরিক্ত শ্রমিক। ব্যয় অনুযায়ী আয় না থাকায় বাগান নিয়েও অন্য চিন্তা ভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। বাগান মালিকরা জানালেন একদিকে সিন্ডিকেট রাবার চোরাকারবারীদের কারণে তারা অতিষ্ঠ। বাগানের বড় গাছ কেটে নেয়া ছাড়াও বাগানগুলোর কষ দেয়া গাছে দ্রুত কষ সংগ্রহের জন্য প্রতিনিয়তই চোরচক্র অবাধে রাবার গাছগুলোতে স্টেপিং করার কারণে মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে কষ দেয়ার উপযুক্ত গাছ। এ কারণে দিন দিন ব্যাহত হচ্ছে বাগানের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনও। অপরদিকে দিন দিন কমে যাচ্ছে কাঁচা রাবারের দরও। এমন অচল অবস্থায় মহা সংকটে পড়েছেন ব্যক্তি মালিকানাধীন ছোট ছোট বাগান মালিকরা। এমন অবস্থা চললে বাগান ঠিক করি কিভাবে এমন প্রশ্নে এখন মালিক শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই দুশ্চিন্তায় হতাশ। তাদের চোখে মুখেও এখন এমন দুশ্চিন্তার চাপ। দিন দিন বাড়ছে এ উদ্বিগ্নতা। বাগান মালিক শাহ নেওয়াজ রাজা, সাকির আহমদ, আবদুস ছামাদ, মুসলিম মিয়াসহ অনেকেই জানান, বাংলাদেশ বন শিল্প করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়নে থাকা সরকারি রাবার বাগান ও এইচ আরসি, ফিনলে ও ডানকান কোম্পানির বাগানগুলোর (গুণগত মানের ভিত্তিতে) রাবারের দর নিয়ে কোনো সমস্যা না হলেও বিপাকে পড়েছেন ব্যক্তি মালিকানাধীন বাগান মালিকরা। তারা জানান, বর্তমানে প্রতি কেজি ৭০-৮০ (ভ্যাটসহ) টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। যা ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত রাবার সিট (“ধুমায়িত” একটি প্রাথমিক প্রক্রিয়ার পর) প্রতি কেজি  রাবার বিক্রি হয়েছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তারা একসময় তা সর্বোচ্চ ৪শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। এখন আবার অনেকেই নানা প্রশাসনিক ঝক্কিঝামেলা আর খরচ বাঁচাতে রাবার সিট না করে কষ বিক্রি করছেন। প্রতি লিটার কষ বিক্রি করছেন ২৫-৩০ টাকা। তারা বলেন এমনিতে এ অঞ্চলের রাবার শিল্প চোর চক্রের কারণে ধ্বংসের দোর গোড়ায় আর এভাবে ক্রমাগত দরপতন চলতে থাকলে রাবার চাষিরা তাদের বাগানের গাছ কেটে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকবে না। গেল কয়েক বছর থেকে লোকসান গুনা শুরু হয়েছে এভাবে চলতে থাকলে বাগান রক্ষায় নিজেদের ভিটে মাটি বিক্রি করতে হবে। চাষিরা জানান, একসময় রাবার কৃষি পণ্য হিসেবে বিপণন হতো। এরপর তা কৃষি পণ্য থেকে বাদ দিয়ে তাতে ১৫ শতাংশ করারোপ করা হয়। কৃষি পণ্য থেকে তা শিল্প পণ্যতে নেয়ায় তাদের এমন দুর্গতি। তারা অভিযোগ করে বলেন কিন্তু তারপরও এ শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে তারা সরকারের তরফে তেমন কোনো সহযোগিতা পান না। বাংলাদেশ রাবার বাগান মালিক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম শাহজালাল জানান, আমরা আমাদের এই দুর্দশার কথা সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি। সরকারের সহযোগিতা না পেলে আমাদের ব্যক্তি মালিকানাধীন রাবার বাগানগুলো আর টিকিয়ে রাখা যাবে না। এখন মহা হুমকিতে থাকা এ শিল্পটি রক্ষায় সংশ্লিষ্টরা এগিয়ে না আসলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েক হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে। সরকারও কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে আর হুমকিতে পড়বে এ অঞ্চলের পরিবেশ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

তাবিথ আউয়ালই ডিএনসিসির উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী

ফের টেস্ট অধিনায়ক সাকিব

দুই বছর ওএসডি ছিলেন মারুফ জামান

সারা দেশ গুম-খুনে জর্জরিত

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্কের যাত্রা শুরু

চালের দাম ফের বাড়ছে

কুড়িগ্রামে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

আওয়ামী লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি নির্ভার বিএনপি

সিলেটে শামীমের বিরুদ্ধে রুমার মামলা, তোলপাড়

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপা প্রার্থীর ভাবনা

এবি ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ ৪ জনকে দুদকে তলব

আড়াইহাজারের এমপির সঙ্গে মাওলানা হাবিবুরের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ভাইরাল

রাবি চারুকলা অনুষদের সেই ডিনের পদত্যাগ

সাভারে জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৯

সাকিব ফের বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক

এমপি মুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসিকে দুদকের চিঠি