সতর্ক পোপের মানবিকতা

বিশ্বজমিন

মিসবাহুল হক | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে পোপ ফ্রান্সিসের গত সপ্তাহের সফর গতানুগতিক হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কেননা রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর তীব্র চলমান সহিংসতার মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গরিব, ক্ষমতাহীন শরণার্থী ও অভিবাসীদের অধিকার রক্ষা করে পোপ ফ্রান্সিস ব্যাপক সুখ্যাতি পেয়েছেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হচ্ছিল তিনি মিয়ানমার ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কথা বলবেন। গত আগস্ট মাস থেকে এখন পর্যন্ত ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। সেখানকার শরণার্থী শিবিরগুলোর অবস্থাও শোচনীয়।
শরণার্থীদের মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর জোট ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একটি শরণার্থী শিবির বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও দ্রুত বর্ধনশীল শরণার্থী শিবির হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেখানে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা ঘিঞ্জি পরিবেশে দিনাতিপাত করছে। টয়লেট ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সেবাগুলোও সেখানে নেই। মিয়ানমার সফরের আগে দেশটির ক্যাথলিক নেতারা পোপকে সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে সরকারের অবস্থানের প্রকাশ্য সমালোচনা না করতে চাপ প্রয়োগ করেন। এমনকি তাকে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতেও নিষেধ করা হয়। তারা এমনটি করেন এই ভয়ে যে, পোপ যদি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বেসামরিক নেতাদের সমালোচনা করেন, তাহলে দেশটিতে বসবাসকারী ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা করা হতে পারে। কিছু ক্যাথলিক নেতা এটাও আশঙ্কা করতে পারেন যে, মিয়ানমারের নেতাদের প্রভাবিত করতে পোপ যদি কিছু বলেন, তাতে ভ্যাটিকান ও নেপিডো’র মধ্যকার সম্পর্কে অবনতি হতে পারে। গত মে মাসে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এই সফর ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আর পোপ ফ্রান্সিস রাজনৈতিকভাবে পরিপক্ব। চূড়ান্তভাবে তিনি মিয়ানমার সরকারের কোনো প্রকাশ্য সমালোচনা করেন নি। বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে মিয়ানমার ত্যাগ করার আগে রোহিঙ্গা শব্দটিও ব্যবহার করেন নি। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বেসামরিক নেতারা রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার করেন না। তারা রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেন। এদেরকে বহিরাগত মনে করেন। কিন্তু মিয়ানমার সফরে নিজের সতর্ক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন পোপ। রোমে ফিরে যাওয়ার সময় তিনি নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। বলেন, মিয়ানমারের নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকে তিনি রাখাইন সঙ্কট ও এতে তাদের কর্তব্যের বিষয়ে স্পষ্টভাষী ছিলেন। এসব বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা শব্দেরও ব্যবহার করেছেন। হতে পারে তিনি ব্যক্তিগত বৈঠকে স্পষ্টভাষী ছিলেন। তবে বেসামরিক নেতা, সেনাবাহিনী ও অন্য ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি নিশ্চিতভাবেই কিছু প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন। রাখাইন সঙ্কটের বিষয়ে সকল বিদেশি নেতা, মানবাধিকার কর্মী ও কূটনীতিকরা বলেছেন, মিয়ানমারের বিপুল সংখ্যক জনগণ রাখাইন সঙ্কটে সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করে। অথবা সরকারের এই অবস্থানের শিকার হয়। অনেক রোহিঙ্গা এটি মেনে নিতে শুরু করেছে যে, তারা জাতিগতভাবে উৎখাত হয়েছে। এমনকি ঢাকা ও নেপিডো যদি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে চূড়ান্তভাবে সত্যিকারের কোনো চুক্তিতে সম্মত হয়, তারপরও মিয়ানমারে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ইতিমধ্যেই নেপিডো ও ঢাকা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে একটি সমঝোতা চুক্তি করেছে। কিন্তু রাখাইনের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এখনো ভয়াবহ হওয়ার কারণে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি কল্পনা করাও কঠিন। ইয়াঙ্গুনের অধিবাসী এক রোহিঙ্গা কাও মিন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, আমাদের দেশে রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। দ্রুতই আমরা সবাই মারা যাব বা স্থানান্তরিত হব। পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, তিনি মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক পালাবদলের কট্টর সমর্থক। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, তিনি আসলেই এই পালাবাদলের একজন ভালো সমর্থক। তবে বেসামরিক নেতা অং সান সুচির আগে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং এর সঙ্গে বৈঠক করার বিষয়ে পোপের সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য সহায়ক না। মিন অং হ্লাইং তার ক্ষমতার ব্যবহার করেই চলেছেন। ইতিমধ্যেই তিনি একের পর এক জাকজমকপূর্ণ বিদেশ সফর ও রাখাইন রাজ্যে নিষ্ঠুর অভিযানের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা দেখিয়েছেন। সবার আগে পোপের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি জনগণকে এই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনিই মিয়ানমারের ক্ষমতায় আছেন। বিদেশি নেতাদের উচিত তাকে দেশের নেতা হিসেবে বিবেচনা করা। রোমে ফেরার পথে পোপ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি মিয়ানমারের জেনারেল ও দেশটির কার্যত নেতা অং সান সুচির সঙ্গে বৈঠককে একইভাবে দেখছেন না। মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি দুই বৈঠককে আলাদাভাবে দেখি। দু’টি দুই ধরনের বৈঠক। এগুলো এমন ছিল যে, একটিতে আমি মানুষের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি (অং সান সুচির সঙ্গে বৈঠক)। আর আরেকটিতে আমি কারো আমন্ত্রণে রাজি হয়েছি (সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক)। এই জেনারেল আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। আমি তাতে রাজি হয়েছি। আমি কখনোই দ্বার রুদ্ধ করি না। তবে মিয়ানমারের মানুষ সংবাদ পড়েছে বা শুনেছে এভাবে যে, পোপ মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। তার পর অং সান সুচির সঙ্গে দেখা করেছেন। যা হোক, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় পোপ তার স্বভাবসিদ্ধ স্পষ্টভাষী ছিলেন। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনীহার কারণে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি বিনয় ও মানবিকতা দেখিয়েছেন।
(নিবন্ধটি বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক জসুয়া কুরলানজিকের একটি ব্লগপোস্টের সংক্ষিপ্ত অনুবাদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর সম্মানিত ‘ফেলো’।)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন