ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মগের মুল্লুকি কারবার, কৃষকের চোখে জল

এক্সক্লুসিভ

জাবেদ রহিম বিজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে | ৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৪
সবার হাতেই জমির মালিকানার দলিল। দু-একজন নিয়ে এসেছেন মৌজার ম্যাপ। চোখেমুখে উদ্বেগের ছাপ। দিশাহারা অবস্থা। কারো কারো চোখে জল। চোখের সামনেই নিজের জমির মাটি খাবলে তুলছে ভেকু নামের যন্ত্রদানব।
কিন্তু অসহায় এই মানুষেরা। ঠিকাদার পুলিশ পাঠিয়ে রাতে বাড়ি থেকে ধরিয়ে নিয়ে আসবে, এই ভয় তাড়িয়ে বেড়ায় তাদের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা থেকে জেলা শহর পর্যন্ত একটি রাস্তা নির্মাণে গ্রাস করা হচ্ছে শত কৃষকের জমি। অধিগ্রহণ, কোনো আলাপ-আলোচনা বা কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেয়া, কোনো কিছু  না করেই সমানে তাদের জমি কেটে নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক জমি খাল করে ফেলা হয়েছে। যে কৃষকের সামান্য জমি তার সবটুকুই শেষ হয়েছে। তাদের অভিযোগ মৌজা ম্যাপ অনুসারে রাস্তা আরেক দিক দিয়ে। ঠিকাদার তার সুবিধার্থে তাদের জমির ওপর দিয়েই রাস্তা বানিয়ে নিচ্ছে। আবার জমিও কাটছে। এ যেন এক মগের মুল্লুকি কারবার। এ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকরা। আদালতে একটি মামলাও করেছেন তারা। মামলায় ঠিকাদার, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালককে আসামি করা হয়। আদালত তাদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন। কিন্তু জমি রক্ষা করতে পারছেন না   কৃষকরা কোনোভাবেই।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ব্রাহ্মণবাড়িয়া নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে সীমনা-বি.বাড়িয়া নামের প্রায় ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটির কাগজপত্রে কাজ শুরু হয়েছে ১৩ মাস আগে। সড়ক বানানোর কাজ পেয়েছে ডলি কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এটিও কাগজপত্রেই। স্থানীয় একাধিক ঠিকাদারই মূলত এই কাজ করছেন। ৩৯ কোটি টাকার এই কাজের মধ্যে মাটির কাজের জন্য বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা। ঠিকাদারেরই মাটির সংস্থান করার কথা। চুক্তিতে কোথাও বলা নেই পাশের জমি থেকে মাটি কেটে নিতে হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে শহরের ভাদুঘর এলাকা দিয়ে লইসকা বিলের ধারে ওই সড়কের কাছে যাওয়ার পথে খবর ছড়িয়ে পড়ে। একে একে জমির মালিকানার প্রমাণ নিয়ে লইসকা বিলে আসতে থাকেন কৃষকরা। ভাদুঘর গ্রাম থেকে বেরিয়ে ওই বিলে যাওয়ার পথে কথা হয় সিরাজ মিয়া নামের একজনের সঙ্গে। বলেন- ভাই রাইতে নাকি পুলিশ আইবো। পুলিশের ভয় দেখিয়েই কাবু করে রাখা হয়েছে জমির নিরীহ মালিকদের। আর জমিতে দিনরাত চলছে অনাচার। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলায় এখন চাঁদাবাজির মামলায় জড়ানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে জানান ভাদুঘর গ্রামের শাহ মো. শফিকুর রহমান। সাবেক ৩৭২৩ দাগে তার ৭১ শতক জমি রয়েছে এখানে। তার জমিও নিশ্চিহ্ন। তিনি বলেন- জমিও কেটে নিচ্ছে এখন চাঁদাবাজির মামলা দিয়ে জেল খাটানোর কথা বলছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সবার বাড়ি ভাদুঘরে। এই গ্রামের অর্ধশত কৃষকের জমি বিনাশ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত আতিকুল ইসলাম খোকন জানান, সব জমি ভাদুঘর মৌজায়। ম্যাপ ছড়িয়ে দেখালেন তিনি ভাদুঘর মৌজার সিএস ও বিএস ম্যাপে কোনো রাস্তা নেই। রাস্তা আছে মেরুরা মৌজায়। কিন্তু ঠিকাদার নিজের সুবিধার জন্য এদিক দিয়ে রাস্তা বানাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পুরাতন ৩৭১২ দাগে খোকনের জমির পরিমাণ ৫১ শতক। এরমধ্যে ভাদুঘর বায়তুল মামুর জেহাদী মসজিদের জন্য দিয়েছেন ১৫ শতক। মসজিদের এই ১৫ শতক আর তার ৩৬ শতক জমির সবটুকুই কেটে ফেলা হয়েছে। মো. হানিফ উদ্দিনের জমির পরিমাণ ২৮ শতক। এর পুরোটাই কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি বলেন, জায়গার মূল্য দেয়া দূরে থাক জমি কেটে মাটি নেবে এমনটা মুখে বলারও প্রয়োজন মনে করেনি তারা। ২ একর ৯ শতক জমির সবটুকুই কেটে নেয়া হয়েছে আশ্রব আলীর। প্রতি বছর জমিতে ২৯ ও ২৮ জাতের ধান চাষ করতেন। ফলন পেতেন এক-দেড়শ’ মণ। এখন জমির অস্তিত্ব নেই। আশ্রব আলী বলেন, বাধা দিলে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখায়। কাউতলী এলাকার নাছিরের ২১৩ শতক জমির সবই কেটে ফেলা হয়েছে। হতদরিদ্র লিলু মিয়ার ৩৭ শতক জমির সবটুকুই শেষ। লিলু জানান, এই জমিই ছিল তার শেষ সম্বল। কেটে নেয়া হয়েছে আমিনুল হকের ২৫ শতক, মোরশিদ মিয়ার ২৩ শতক, মানিক মিয়ার ৬৩ শতক জমি। সরজমিন দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন অংশে ৬/৭টি ভেকু দিয়ে জমির মাটি কাটা হচ্ছে। ২৫শে নভেম্বর থেকে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়। এর পরই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পক্ষ থেকে ২৯শে নভেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে একটি আবেদন করা হয়। যাতে অভিযোগ করা হয় তাদের জমি থেকে ২০ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। বাধা দেয়ায় তাদের ওপর চড়াও এবং জেলখানার ভয় দেখানো হয়। এরপর ৩০শে নভেম্বর সিনিয়র সহকারী জজ, সদর আদালতে মো. হানিফ উদ্দিন গং বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় বিবাদী করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোস্তফা কামালের স্বত্বাধিকারী মো. মোস্তফা কামাল, ডলি কনস্ট্রাকশনের মালিক মো. নাছির উদ্দিন, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক (আরটিআইপি-২)সহ ৬ জনকে। আদালত তাদের আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলেছেন। এই মামলায় ভাদুঘর, মেরুরা ও চর রাজাবাড়ি মৌজাস্থ ৩৫ জন জমির মালিকের ১৫৫০ শতাংশ জমির মাটি কেটে নেয়ার উল্লেখ রয়েছে। মামলার আবেদনে বলা হয়, বাদীগণের অনুমতি বা সম্মতি ছাড়া সম্পূর্ণ অন্যায় ও বেআইনিভাবে তাদের জমির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং ভূমির একাংশ থেকে মাটি কেটে আরেকাংশে ভরাট করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডি কার্যালয়ে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলে হাবিব মিটিংয়ে ব্যস্ততার কথা বলে তার বাসভবনে চলে যান। তার সঙ্গে সহকারী প্রকৌশলী মো. আবদুর রাজ্জাকও সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর মো. আবদুর রাজ্জাক নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে এসে এ নিয়ে দু-ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, রাস্তার পাশ থেকেই মাটি কাটার কথা বলা আছে চুক্তিতে। আবার বলেন, ঠিকাদার মাটির ব্যবস্থা করবে। এদিকে সড়ক নির্মাণ কাজ হচ্ছে যেনতেনভাবে। নিম্নমানের পাথর ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে ব্লক। কাজের কোনো তদারকিও নেই। সহকারী প্রকৌশলী আবদুর রাজ্জাকের কাছে ঠিকাদারের নাম-ফোন নম্বর জানতে চাইলে কোনো কিছু তার জানা নেই বলে জানান। ঠিকাদারের প্রতিনিধি এবং ইঞ্জিনিয়ার কাজের সাইডে থাকেন বলে রাজ্জাক জানালেও তাদের নাম-ঠিকানা কোনো কিছুই জানাতে পারেননি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন