জিসিসি সম্মেলনে কি কাতার সংকটের সমাধান হবে!

বিশ্বজমিন

মিসবাহুল হক | ৬ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সংগঠন গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) এবারের সম্মেলন একদিনেই সমাপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সদস্য দেশগুলো। এতে মঙ্গলবারেই সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় বিকাল সাড়ে ৫টায় ৬ দেশের নেতারা একত্রিত হবেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সম্মেলন শুরু হয়নি। এবারের জিসিসি সম্মেলন কাতার ও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বের কোনো সুরাহা হবে কি নাÑ তা নিয়ে আগ থেকেই অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। সম্মেলনের সময়কাল অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় সে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে।

কেননা কোন পক্ষকেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। আঞ্চলিক এই জোটের ৩৮তম সম্মেলন এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন সৌদি আরব, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিশর ছয় মাস ধরে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। সৌদি জোটের অভিযোগ, কাতার সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ও সহযোগিতা করছে। তবে কাতার এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। উল্লেখ্য, জিসিসি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট। আরব উপদ্বীপের দেশগুলোর মধ্যে আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করার জন্য ১৯৮১ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আঞ্চলিক সহায়তা ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে প্রতি বছর একত্রিত হয়।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মাহজুব জাবেরি বলেন, ধারাবাহিক সঙ্কট ও অবরুদ্ধ দেশের ওপর এর প্রভাব উদ্বেগজনক। উপসাগরীয় রাজনীতির বিষয়ে ভালো জানা শোনা আছে মাহজুব জাবেরির। তিনি বলেন, সঙ্কট সমাধানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেননা এখনো এতে কোন অগ্রগতিই হয়নি। সৌদি আরবের দাবি মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কাতার। দেশটি সঙ্কট সমাধানে এখনো কিছুই করতে পারেনি। এছাড়া অর্থনৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশটি।
গণমাধ্যমের যুদ্ধ: কাতার সঙ্কটে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করেছে কুয়েত। কিন্তু তাতে খুব কমই অগ্রগতি হয়েছে। কাতারের বিরুদ্ধে চার আরব দেশের প্রচারণা অব্যহত রয়েছে। বেশির ভাগ উস্কানিমূলক বিবৃতি এসেছে আরব আমিরাতের কর্মকর্তাদের দিক থেকে। দেশটি কাতারের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সেখানে কেউ এই অপরাধ করলে তাকে শাস্তি হিসেবে ১৫ বছর পর্যন্ত সাজা দেয়ার আইন করা হয়েছে। একইভাবে সৌদি আরব ও বাহরাইনেও কাতারের প্রতি সমর্থনকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। গত সপ্তাহে আরব আমিরাতের নিরাপত্তা প্রধান দাহি খালফান এক টুইটার বার্তায় আল- জাজিরাকে বোমা হামলার হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘সৌদি জোট অবশ্যই সন্ত্রাসবাদের যন্ত্রের ওপর বোমা নিক্ষেপ করবে।’ এ সময় তিনি কাতারকে আইএস, আল-কায়েদা ও নুসরা ফ্রন্টের আশ্রয়স্থল হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার গারগাসও কাতারের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। টুইটারে তিনি বলেন, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে কাতার। তবে কাতার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দেশটির বিদেশ বিষয়ক কর্মকর্তা আহমেদ বিন সাঈদ আল-রুমাইহি বলেন, দাপ্তরিকভাবে কোন ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক অভিযোগ অপ্রত্যাশিত। যদি সমোঝতার সদিচ্ছা থাকে, সবার আগে যে কাজটি করা উচিত তা হল গণমাধ্যমের যুদ্ধ বন্ধ করা।’
জিসিসি’র প্রভাব: জিসিসি এখনো এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করে কিনা, সেই বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। এই জোট গঠন করা হয়েছিল উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একতা সৃষ্টি করার জন্য। কিন্তু কাতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে সেই নীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দেয়। এতে গত দুই দশকে উপসাগরীয় অঞ্চল বহির্বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপসাগরীয় রাজনীতি বিষয়ক গবেষক লুসিয়ানো জাক্বারা বলেন, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পর থেকেই জিসিসি’র প্রভাব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত শুরু হওয়ার পর এই জোটের প্রভাব ব্যাপক হারে কমে যায়।
সৌদি কর্তৃত্ব: ২০১৪ সালে জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে বিভেদ সৃষ্টি হয়। তখন মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি কাতারের সমর্থনকে কেন্দ্র করে দোহার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন। এই দ্বন্দ্ব স্থায়ী হয় আট মাস। উল্লেখ্য, মুসলিম ব্রাদারহুডকে বেশকিছু আরব দেশ সন্ত্রাসী সংগঠন বলে মনে করে। এর আগে ২০১৩ সালে কাতারের বিরুদ্ধে জিসিসি’র নিরাপত্তা চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুপক্ষের গণমাধ্যমকে পৃষ্ঠপোষকতা করার অভিযোগ তোলা হয়। লুসিয়ানো জাক্বারা বলেন, তখনই এটা পরিষ্কার হয় যে, এই অঞ্চল একটিই দেশ আছে। সেটি সৌদি আরব। তারা নিজেদের মতো কাউন্সিলের অন্য সদস্য দেশগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের প্রতি ইঙ্গিত করে জাক্বারা বলেন, দ্বন্দ্বের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে কাউন্সিলের অকার্যকারিতা ফুটে উঠেচে। এটি কার্যক্রমে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, ঐক্যবদ্ধভাবে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমানে জিসিসি’র কোন প্রভাব নেই এটি বলা কঠিন। আসন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কাতার। বলেছে, দোহা নিজের ইচ্ছায় জিসিসি ত্যাগ করবে না। কাতারের জিসিসি ত্যাগের বিষয়ে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেলিন সেজ মিচেল বলেন, বিষয়টি উস্কানিমূলক হতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরো অবনতি হবে। তিনি বলেন, শুরু থেকেই কাউন্সিল অভ্যন্তরীণ হুমকি মোকাবিলায় শাসকদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। তবে মিচেল মনে করেন, সৌদি অবরোধ কাতারকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সহায়তা করেছে। কাতারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সৌদি আরবের প্রভাব কমে যাওয়ার ফলে দেশটির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামনে এগিেেয় যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই কিছু অগ্রগতি দেখতে পেয়েছি। স্থায়ী নাগরিকত্ব আইন, শ্রমিকদের সুরক্ষা, শুরা কাউন্সিলে চার জন নারী সদস্য নিয়োগ ও দ্রুত আইনসভার নির্বাচনের অঙ্গীকার এগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ধারণা করা হচ্ছে, ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের ভূ-রাজনৈতিক কার্যক্রমকে সমর্থন না দেয়ার কারণে ওমানকে দ্রতই কাউন্সিল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। জাক্বারা বলেন, এটা পরিষ্কার- যতদিন পর্যন্ত জিসিসি সৌদি আরবের নির্ধারণ করা নীতি অনুসরণ করবে, ততদিন কাউন্সিল কার্যকর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর যদি কাতার ও ওমানকে বের করে দেয়া হয়, তাহলে পাঁচ, চার বা তিন সদস্য বিশিষ্ট জিসিসি হবে সৌদি রাজনীতির বর্ধিত অংশ।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: বর্তমান পরিস্থিতিতে কেউই সন্তুষ্ট নয়। আর সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নিতে জিসিসিও অক্ষম। জাক্বারা বলেন, এই প্রেক্ষাপটে, জিসিসি তার অকার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। তিনি মনে করেন, অবরোধ দির্ঘায়িত হলে তা কাতারের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। কিন্তু চিরদিনের জন্য অবরোধ আরোপ করা হলে তা সামলে উঠতে পারবে না কাতার। তিনি বলেন, কাতার ভালোভাবেই সংকট মোকাবিলা করছে। কিন্তু নিজেদের অর্থনীতির ক্ষতি না করে চার আরব দেশ কাতারের ওপর স্থায়ী অবরোধ আরোপ করতে পারবে না

[আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে]



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন