সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্প (২)

প্রয়োজন পরিকল্পিত উন্নয়ন

এক্সক্লুসিভ

এম ইদ্রিস আলী, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে | ৫ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫০
পরিকল্পনামাফিক পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে  সরকারের রাজস্ব অর্জনের নতুন উৎসের সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কার্যকর কর্মকৌশল প্রণয়ন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সফল বিনিয়োগের মাধ্যমে মৌলভীবাজার পর্যটন শিল্পের এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে এ অঞ্চলে স্থানীয় উদ্যোক্তার তৈরি হবে। এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে। আর এতে করে শুধু এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হবে।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে বিবেচনা করে ২০০৮ সালের ১লা জুলাই ‘এসো বাংলাদেশ গড়ি’ রোড শো উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পর্যটন কপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান শফিক আলম মেহেদী মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
পরে ২০০৯ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন থেকে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ‘মৌলভীবাজার জেলাকে পর্যটন জেলা হিসেবে উন্নীতকরণ’ নামে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত মৌলভীবাজরকে পর্যটন জেলার কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।
সরজমিনে এ জেলার বিভিন্ন পর্যটন স্পর্ট ঘুরে দেখা যায়, প্রকৃতি যেটুকু দিয়েছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট সবাই। বিকাশের মধ্যে কেবল বিচ্ছিন্নভাবে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুন্ড জলপ্রপাত ও ইকোপার্ক উন্নয়নের মধ্যেই আটকে আছে। যদিও পাহাড়-টিলা, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, হাওর-বাঁওড়, বিল-ঝরনা, নদ-নদী পরিবেষ্টিত ও জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এ জেলার ইকো-টুরিজমের জন্য খুবই উপযোগী। যে কারণে প্রতি বছরই প্রায় দুই লাখ দেশ-বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে শুধু লাউয়াছড়া ভ্রমণ করেছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৬ জন পর্যটক। কিন্তু পর্যটকদের চাহিদা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন, অবকাঠামো, বিনোদন, পর্যটকদের পথনির্দেশনা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় তাদের অনেকেই এখান থেকে নিরাশ হয়ে ফিরে যান। এছাড়া পর্যটকদের জন্য নেই কোনো তথ্য কেন্দ্র। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে এসে রিকশাচালক, গাড়িচালক নতুবা পথচারীদের কাছ থেকে পর্যটন সংশ্লিষ্ট তথ্য জেনে নিতে হয়। আর এতে করে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন বিদেশি পর্যটকরা।
স্থানীয় ট্যুর গাইড শ্যামল দেব বর্মা বলেন, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় সরকারিভাবে একটি পর্যটন মোটেলের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু ফিনলে টি কোম্পানি মামলা দিয়ে ওই পর্যটন মোটেলের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়।
তবে পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারিভাবে তেমন কোনো  উদ্যোগ না থাকলেও কিছু উদ্যোগী মানুষ এ শিল্পটি বিকাশ ঘটাতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে ব্যক্তি মালিকাধীন অনেক রিসোর্ট, কটেজ, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে। শ্রীমঙ্গল ও মৌলভীবাজারে প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে ফাইভ স্টার মানের হোটেল গ্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গল্ফ এবং দোসাই রিসোর্ট, টি হেভেন, লেমন গার্ডেন বিসোর্ট।  
অনুসন্ধানে জানা যায়, পর্যটন বর্তমান বিশ্বে এক বৃহত্তম ও দ্রুত সস্প্রসারিত শিল্প। বিগত শতাব্দী ধরে এ শিল্পে বিকাশ হয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। বিশ্বের অনেক দেশ রয়েছে যাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সিংহ ভাগ আসে পর্যটন শিল্প থেকে। বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের এক-তৃতীয়াংশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন শিল্প। বাংলাদেশের জিডিপিরও ২ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ২০২০ সাল নাগাদ এর সংখ্যা ১৬০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে এই বিপুলসংখক পর্যটকের ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে।  
এ ছাড়া বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য মতে, ২০১৮ সালের মধ্য এ শিল্প থেকে ২৯ লাখ ২৭ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখবে ১০.৫ শতাংশ। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে ২০২০ সাল নাগাদ পর্যটন থেকে বছরে দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হবে। ইতিমধ্যে পর্যটন শিল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির দিক থেকেও সর্ববৃহৎ খাত হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশ যদি পর্যটন শিল্পের এই বিশ্ব বাজার ধরতে পারে, তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার ট্যুর গাইড কমিউনিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন বলেন, প্রকৃতি এ জেলাকে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাময় করে তুলেছে। এখন শুধু উদ্যাগ এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এ শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হবে। আমাদের দেশের পর্যটকরা যাতে বিদেশমুখী না হন তার জন্য বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলেয়ে দেশের সকল পর্যটন স্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে আরও আধুনিকায়ন সকল সুযোগসুবিধাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। এতে করে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও বাড়বে।  
পর্যটন শিল্পের মৌলভীবাজারের উন্নয়ন কর্মী হাসনাত কামাল বলেন, জীব বৈচিত্র্যে ও প্রকৃতির দিক থেকে মৌলভীবাজার হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্য খুবই সমৃদ্ধ একটি স্থান। হাওর, পাহাড়, সমতলভূমি, জলাশয়, চা বাগান এসব কিছুর সমন্বয়েই এই জেলা। মৌলভীবাজারের মতো এক জেলায় এত দর্শনীয় স্থান আর কেথাও নেই। আমরা যদি প্রকৃতির এই সৌন্দর্যকে পরিকল্পনা মাফিক কাজে লাগোতে পারি তাহলে পর্যটন শিল্পে মৌলভীবাজার দক্ষিণ এশিয়ার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এগুলোর বেন্ডিং করতে পারলে এ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এতে করে বছরে এ জেলার পর্যটন থেকে আনুমানিক ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন হবে। এছাড়া পাঁচ থেকে ১০ হাজার যুবকের কর্মসংস্থান হবে।
ইন্ডাস্ট্রি স্কিল কাউন্সিল ফর ট্যুরিজমের প্রধান নির্বাহী মো. মহিউদ্দিন হেলাল বলেন, পর্যটন শিল্প এখন আর শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়। এটা এখন উন্নয়নেরও একটি মাধ্যম। এর মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন, প্রকৃতি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, হাওর উন্নয়নসহ মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়ন ঘটাতে পারে। একটি এলাকায় যত বেশি পর্যটক যাবে সেই এলাকায় তত বেশি গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন