কেন মিয়ানমারে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারন করেননি পোপ

বিশ্বজমিন

নাজমুস সাদাত পারভেজ | ৩ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:৪৬
মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সফর শেষ করেছেন ষষ্ঠ পোপ ফ্রাঁসিস। চলমান রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে দু’দেশের মধ্যে সৃষ্ট টানাপড়েন পোপের এই সফরের ফলে কিছুটা হলেও অবসান হবে এবং পোপের অনুরোধে মিয়ানমার রোহিঙ্গা ইস্যুতে নমনীয় হবে- বিশ্বব্যাপী এমন প্রত্যাশা ছিলো। বিশেষ করে, নির্যাতিত-নিপীড়িত ও বাস্তচ্যুত রোহিঙ্গাদের পক্ষে পোপের সরব ভূমিকায় সার্বিকভাবে পরিস্থিতির উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হওয়ার সম্ভাবনা প্রত্যাশা করেছিলেন তাবৎ বিশ্বের মানুষ। তবে পোপ মিয়ানমারের মাটিতে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গাদের স¤পর্কে কিছু বলেন নি। তিনি পরোক্ষভাবে সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর চলমান বৈষম্য নির্মূলের তাগিদ দিয়েছেন। আহ্বান জানিয়েছেন সহিংসতা ভুলে ভ্রাতৃত্বের জয়গান গাইতে।
কিন্তু, তিনি একবারও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। এ স¤পর্কে ভ্যাটিকান কর্তৃপক্ষ যদিও বলছে, স¤পূর্ণ কৌশলগত কারণেই পোপ মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন নি, তবে সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় সব ভূমিকাই তিনি পালন করেছেন। কিন্তু, পোপের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের কাছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনেকেই আরেকটু বেশি প্রত্যাশা করেছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমারের অবর্ণনীয় নিপীড়নকে ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘসহ বিশ্বের অনেক দেশ ‘জাতি নিধন অভিযান’ বলে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকার সংস্থাসমূহ প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের করুণ অবস্থার অবসান চেয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। পোপ নিজেও কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা সংকট স¤পর্কে মন্তব্য করেন। তখন তিনি বলেন, ‘আমাদের রোহিঙ্গা ভাইদের উপর নির্যাতন হচ্ছে’। তবে, সেই নির্যাতনের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারে গিয়ে পোপ ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণে বিরত থেকেছেন।
কেন রোহিঙ্গা শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ
রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের অত্যাচার নতুন কিছু নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিক বলে স্বীকৃতি দেয় না মিয়ানমার। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পাস করা একটি আইন অনুযায়ী, ৮ ধরনের জাতিকে মিয়ানমারের নাগরিক বলে চিহ্নিত করা হয়। তার মধ্যে রাখা হয় নি রোহিঙ্গাদের। এর ফলে, হঠাৎ করে রোহিঙ্গারা আবিষ্কার করে, মিয়ানমারে তাদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং অধিকার ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করে থাকে। কদিন আগেও মিয়ানমার সেনাপ্রধান বলেছেন, তার দেশে রোহিঙ্গা বলতে কিছু নেই! অতএব রোহিঙ্গাদের প্রতি জাতিগত নির্মূল বা নিধন অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। একই দাবি করেন সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ ধর্মগুরুরাও। এমতাবস্থায় সে দেশে পৌঁছে পোপ যদি রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতেন তবে নানা বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কারণ, গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে এখনো সেনাবাহিনীর প্রভাব অপরিসীম। তাই, সফরের আগেই পোপের উপদেষ্টারা তাকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করতে বারণ করেন। মিয়ানমারের ক্যাথলিক আর্চবিশপও একই অনুরোধ করেন। মিয়ানমারে পৌঁছানোর পরে আকস্মিকভাবে সে দেশের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে বসতে একরকম বাধ্য করা হয় পোপ ফ্রাঁসিসকে। ধারণা করা হয়, সফরের প্রারম্ভেই হয়তো জেনারেলরা তাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্যে করণীয় স¤পর্কে অবহিত করেন। আর যেখানে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বকেই স্বীকৃতি দেয় না, তাই পোপ যাতে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করেন, সে স¤পর্কে নির্দেশনা তাকে দেয়ারই কথা। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কূটনীতিতে পারদর্শী পোপ মিয়ানমারে অবস্থানকালীন ভাষণ এবং সাক্ষাৎকারে আকারে ইঙ্গিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করার আহ্বান জানান। তবে পোপের এই সতর্ক ভূমিকার পক্ষে যেমন অনেকেই আছেন, এর বিপক্ষেও নেই কম মতামত। এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিখ্যাত দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, পোপের মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে তার ভূমিকার সমালোচনা করছেন অনেকেই। বলা হয়, অন্যায় এবং অপরাধের ব্যাপারে পোপ ফ্রাঁসিস তার মেয়াদের শুরু থেকেই উচ্চকণ্ঠ। তার মতাদর্শের সঙ্গে মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে পালন করা ভূমিকা কোনোভাবেই মানানসই নয়। বিবিসি সম্প্রতি এক নিবন্ধে বলেছে, পোপ ফ্রাঁসিস তার নিজের মেয়াদকালে শরণার্থী সংকট এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি- এই দুটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ‘সিগনেচার’ বিষয় বলে অবহিত করেছেন। তা সত্ত্বেও বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সংকটে তিনি সেই সংকটের উৎপত্তিস্থলে গিয়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখলেন না।
অন্তরালে আলোচনার ইঙ্গিত
যদিও মিয়ানমার সফরে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন নি পোপ, তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, প্রকাশ্যে না হলেও এ ব্যাপারে মিয়ানমারের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অন্তরালে আলোচনা করেছেন পোপ। এ প্রসঙ্গে ভ্যাটিকানের মুখপাত্র গ্রেগ বুরকি বলেছেন, ভ্যাটিকান কূটনীতির কৌশলে পোপ দরজার আড়ালে সংকট নিরসনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, পূর্বে রোহিঙ্গাদের জাতিগত পরিচয় ধরে সম্বোধনকারী পোপ ফ্রাঁসিস মিয়ানমার সফরে পরিস্থিতির কারণে প্রকাশ্যে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। তবে তিনি ব্যক্তিগত আলোচনার সময় এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করছেন- এমনটির সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ না করে পোপ নৈতিক দায়িত্ব এড়িয়ে গেছেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পোপ যতটা সম্ভব রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্যে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি চাইলেই সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারেন না। সমাধানের জন্যে কিছু যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হয়।
চলমান রোহিঙ্গা সংকটের এই সংকটের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারে পোপের সফরকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। তবে সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু মিয়ানমারে এসে সমস্যার নাম উল্লেখ না করে কৌশলে পোপের কথা বলার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছেই। অনেক রোহিঙ্গাও এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে পোপের সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে অনেকে তার এ ভূমিকাকে সমর্থনও করছেন। ৭৪ বছর বয়সী রোহিঙ্গা বাশার তেমনই একজন। বাংলাদেশের কক্সবাজার কুতুপালং শিবিরে আশ্রিত এই রোহিঙ্গা বিবিসিকে বলেছেন, আমি শুনেছি তিনি (পোপ) মিয়ানমারে গিয়ে রোহিঙ্গা শব্দটি উচ্চারণ করেন নি। আমি এজন্য দুঃখিত নই। তিনি হয়তো কোন বাধা ছিলো বলেই এমনটি করেন নি। আমি জানি তিনি রোহিঙ্গাদের ভালবাসেন। তিনি সমগ্র মানবজাতিকে ভালবাসেন। আর আমরা রোহিঙ্গারাও মানুষ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন