কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

বিশ্বজমিন

মাহমুদ ফেরদৌস | ২৫ নভেম্বর ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:৪৮
আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (আইসিজে) হলো জাতিসংঘের প্রধান আইনি সংস্থা। নেদারল্যান্ডের দ্য হেগ শহরে সংস্থাটির সদর দপ্তর। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তিই হলো আইসিজে’র কাজ। আন্তর্জাতিক এই আদালতের কাজকর্ম খুবই জটিল, পত্রপত্রিকায় নিয়মিত সেসব আসে না। খুব কম মানুষই জানতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সৃষ্ট এই আদালতের ১৫ জন বিচারকের একজন সব সময়ই ছিলেন বৃটিশ। কিন্তু যখনই এই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক বেঞ্চে জায়গা হারালো বৃটেন, তখনই এ নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়।
এবং আলোচনা হওয়ারই কথা। এটি শুধু এই আদালতের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বমঞ্চে বৃটেনের অবস্থানও এর দরুন অনেকটা নড়বড়ে দেখালো।
আসুন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে ঘটনাটা ঘটলো। প্রতি তিন বছর অন্তর অন্তর এই আদালতের ১৫ বিচারকের ৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়। বৃটেনের বিচারক স্যার ক্রিস্টোফার গ্রিনউড ৯-বছর মেয়াদে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার আশায় ছিলেন। তিনি বৃটেনের প্রতিথযশা একজন আইনজীবী। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপকও ছিলেন।
সমস্যা বাধলো জাতিসংঘে লেবাননের সাবেক রাষ্ট্রদূত অপ্রত্যাশিতভাবে বিচারক পদে দাঁড়ানোর ফলে। ৫ বিচারকের পদের জন্য পাঁচের বদলে প্রার্থী হয়ে গেলেন ছয় জন! সাবেক রাষ্ট্রদূত ভদ্রলোক বহু বছর জাতিসংঘে কর্মরত ছিলেন। ফলে নির্বাচনে জেতার মতো যথেষ্ট কূটনীতিক বন্ধু তার ছিল। ফলে এশিয়ার জন্য নির্ধারিত পদের একটিতে তিনি জিতে গেলেন। এ কারণে ভারতের প্রার্থী দলবীর ভান্ডারিকে লড়তে হলো ইউরোপের প্রার্থীদের জন্য সাধারণত বরাদ্দ থাকা একটি পদে। আর এক্ষেত্রে ওই পদাধিকারী ছিলেন বৃটেনের বিচারক। এরই মধ্যে অবশিষ্ট চারটি পদে প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে গেলেন। বাকি আছে কেবল বৃটেনের বিচারকের আসন।

বৃটিশ বিচারক স্যার ক্রিস্টোফার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পেয়ে যান। কিন্তু ভারতের বিচারক দলবীর ভান্ডারি পান সাধারণ পরিষদের সমর্থন! নির্বাচিত হতে হলে উভয় পরিষদের সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু বারবার ভোট হলেও দুই পরিষদ দুই জনকে নির্বাচিত করে।

ভারত সরকার নিজেদের প্রার্থীকে জেতাতে ব্যাপক পরিশ্রম করে। লবিং ছাড়াও, অনেক দেনদরবার চলে। ভারতের পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে, বৃটিশরা ‘নোংরা কৌশল’ প্রয়োগ করে জিততে চাইছে। অনেক পর্যবেক্ষক বৃটেনের আচরণকে তুলনা করেন তৎকালীন বৃটিশ-ভারতের কমান্ডার রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে। উপনিবেশিক আমলের হেন কোনো ঘটনা নেই যা তুলে আনা হয়নি।

অন্যদিকে, বৃটিশ মন্ত্রীরা শুধু কিছু টেলিফোন কল করেই ক্ষান্ত দিয়েছেন। জাতিসংঘ সনদে খুবই অল্প পরিচিত একটি বিধান প্রয়োগের কথা অবশ্য ভেবেছিল বৃটেন। জয়েন্ট কনফারেন্স নামে এই বিধান প্রয়োগ করে বিচারক নিয়োগের অচলাবস্থা নিরসন করা সম্ভব ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য ওই পথে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটির আশঙ্কা ছিল, এই বিধান প্রয়োগের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের যথেষ্ট সমর্থন হয়তো তারা পাবে না। কিংবা পেলেও, প্রতিদ্বন্দ্বীতা খুবই তিক্ত হয়ে উঠবে। যার দরুন ভারতের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। অগত্যা, বৃটেন প্রতিদ্বন্দ্বীতা থেকে পিছু হটে। অর্থাৎ, আগামি বছরের শুরুর দিকে যখন স্যার ক্রিস্টোফার পদত্যাগ করবেন, তখন প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে থাকবেন না কোনো বৃটিশ বিচারক। ১৯৪৬ সালের পর এটিই হবে এর প্রথম নজির।

এক হিসেবে চিন্তা করলে এই ঘটনা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে ক্ষমতার ভারসাম্য সাধারণ পরিষদে হেলে পড়ার এক বিরল নজির। সাধারণ পরিষদের অনেক সদস্যই নিরাপত্তা পরিষদের বিপুল ক্ষমতা নিয়ে ক্ষুদ্ধ। সাধারণ পরিষদের অন্তর্ভূক্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট গ্রুপ অফ ৭৭ অনেকদিন ধরেই আরও ক্ষমতা দাবি করে আসছিল। ভারতের এই বিজয় এই জি৭৭ গ্রুপের জন্য বিশাল সাফল্য।
তবে বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এমনটা নজিরবিহীন নয়। গত বছর আন্তর্জাতিক আইন কমিশনে ফ্রান্স তাদের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারেনি। রাশিয়া পারেনি মানবাধিকার কমিশনে নিজেদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে।
কিন্তু এটিও মানতে হবে যে, এই ঘটনা যুক্তরাজ্যের জন্য একটি পরাজয়। এটি বৃটিশ কূটনীতিরও পরাজয়। গুজব আছে, অবস্থা বেগতিক দেখে খোদ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে বৃটিশ বিচারকের পক্ষে দেন দরবার করেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এই দাবি নিশ্চিত করা বা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। তবে এটি নিশ্চিত যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রী বরিস জনসন ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীরা জোর চেষ্টা চালান। কিন্তু তারা ব্যর্থ হন। সাধারণ পরিষদে যথেষ্ট সমর্থন তারা পাননি।
জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞ রাষ্ট্রদূত ম্যাথিও রাইক্রফট বলেন, যুক্তরাজ্য পিছু হটেছে কারণ তার দেশ চায়নি এই ইস্যুটি নিয়ে জাতিসংঘের মূল্যবান সময় আরও নষ্ট হোক। তিনি বলেন, ভারতের মতো ঘনিষ্ঠ একটি বন্ধু দেশ পদটি পেয়েছে, এ নিয়ে তিনি খুশি।
জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের এই হোঁচটকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হবে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই। বিশ্বমঞ্চে বৃটেনের মর্যাদা হ্রাসের প্রতীক যেন এই পরাজয়। বৃটেন একটি নির্বাচনে জিততে চেয়েছিল, কিন্তু বেশিরভাগ দেশ সমর্থন দিয়েছে বৃটেনের প্রতিদ্বন্দ্বীকে। কারণ, দেশগুলো বৃটেনের কাছ থেকে কোনো প্রতিশোধের আশঙ্কা করেনি। বৃটেনের কথা তারা আর শুনছে না। এটি স্পষ্ট যে, জাতিসংঘের বেশিরভাগ দেশই বৃটেনকে অগ্রাহ্য করতে প্রস্তুত ছিল, যার সম্ভাবনা কয়েক বছর আগেও অনেক কম ছিল। এর আগে এ বছরের জুনেও ভারত মহাসাগরে অবস্থিত কিছু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বৃটেন ও মৌরিতাসের বিরোধে সাধারণ পরিষদ বৃটেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে বিরোধ নিষ্পত্তি হতে হয় আইসিজে’তে।

(বিবিসি অবলম্বনে)

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

দাউদ

২০১৭-১১-২৫ ০২:২৯:২৬

ভারতে স্থান করে নেওয়ার জন্য নয় , বৃটেনের হারানোর বিষয়টা সুখপ্রদ

আপনার মতামত দিন