সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মী নির্যাতন, দিনে ৩ অভিযোগ

প্রথম পাতা

রোকনুজ্জামান পিয়াস | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৭
২৩ বছরের যুবতী। গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে তিনি গত জুনে সৌদি আরব যান। দেশটির এক নাগরিকের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ দেয়ার কথা ছিল তাকে। মাস গেলেই ভালো বেতন। এমনটাই জানিয়েছিল দালাল। একটি বাসায় কাজও দেয়া হয়েছিল।
কিন্তু তার গৃহকর্তা ভালো ছিল না। অনৈতিক কাজ করতে জোর করতো। রাজি না হলে মারধর করতো। কখনো কখনো বৈদ্যুতিক শক দেয়া হতো। খেতে দিতো না। এক পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই যুবতী। মাস দেড়েক পর এ কথা তিনি পরিবারের কাছে ফোন করে জানান
। বলেন, তাকে দেশে ফেরত না আনলে আত্মহত্যা ছাড়া পথ থাকবে না। পরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে একটি আবেদন করেন মেয়েটির পিতা। একমাস আগে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। শরীরে কাল দাগ পড়ে গেছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। বর্তমানে বাড়িতে চিকিৎসাধীন। আরেকজন রিজিয়া বেগম। তিনিও গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি গিয়েছিলেন। তাকে পর্যায়ক্রমে তিন বাড়িতে কাজ দেয়া হয়েছিল। প্রত্যেক বাড়ির মালিকই তাকে মারধর করতো। ঠিকমতো খাবার দিতো না। একপর্যায়ে তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় রিজিয়ার স্বামী তাকে ফেরত আনতে মন্ত্রলাণয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শরণাপন্ন হন। সিরাজগঞ্জের আরেক নারী গত সেপ্টেম্বরে সৌদি যান। জেদ্দায় তাকে একটি বাড়িতে কাজে দেয়া হয়। এর কিছুদিন পর থেকেই তার মালিক তার ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তিনি ওই বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে তাকে ধরে এনে মারধর করা হয়। খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে ফেরত আনতে তার পরিবার আবেদন জানিয়েছে। এভাবে প্রতিদিনই সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ছে সৌদি আরবে নির্যাতিত নারী কর্মীদের পরিবারের পক্ষ থেকে। অভিযোগগুলো দেয়া হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ শাখা, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) কর্মসংস্থান শাখায়। এই তিন দপ্তরের তথ্যমতে, গড়ে দিনে ৩ থেকে ৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। নির্যাতিত এসব কর্মীর কাউকে কাউকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও অনেকের ক্ষেত্রে মাসের পর মাস কেটে যায়। আবার অনেকের কোনো হদিসই পাওয়া যায় না। পরিবারের লোকজন মাসের পর মাস ধর্ণা দেন এসব দপ্তরে। বিএমইটির সূত্র মতে, বর্তমানে বিদেশের মাটিতে সাড়ে ৬ লক্ষাধিকেরও বেশি বাংলাদেশি নারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন সর্বাধিক নারী কর্মী। এ সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। দ্বিতীয় সর্বাধিক সংখ্যক নারী কর্মী গেছেন জর্ডানে। এ সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজারের অধিক। তৃতীয় অবস্থানে সংযুক্ত আরব-আমিরাতে। দেশটিতে গেছে ১ লাখ ২৫ হাজারের বেশি নারী কর্মী। এসব দেশের মধ্যে সৌদি আরবে নারী কর্মী নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ শাখা, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড এবং বিএমইটির কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিনই কোনো না কোনো নারী কর্মীর পক্ষে অভিযোগ নিয়ে আসছে পরিবারের সদস্যরা। কোনো কোনো দিন একাধিক পরিবারও আসছে। অভিযোগগুলোর প্রায় একই ধরনের। গৃহকর্তার নির্যাতন, ধর্ষণ, ঠিকমতো খেতে না দেয়া, নিয়মিত বেতন না দেয়া, অতিরিক্ত কাজ করানো, মারধর করা। কোনো কোনো পরিবারের অভিযোগ, সৌদি আরবে যাওয়ার পর থেকে সংশ্লিষ্ট নারীর তারা খোঁজ পাচ্ছে না। এমনই একজন রাজবাড়ির জিয়াসমিন। তার বোন পিয়ারার অভিযোগ, গত তিন মাস তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিয়োগকর্তাও এ ব্যাপারে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। শুরু থেকেই নিয়োগকর্তা কোনো বেতন দেয়নি। রোজিনা আক্তার নামে এক নারী অভিযোগ করেছেন, সৌদি আরব গমনের পর থেকেই তার মায়ের ওপর নিয়োগকর্তা অত্যাচার করতো। তাকে ঠিকমতো খেতে দিতো না। নিয়মিত বেতন দেয় না। এই অভিযোগকারী আরো জানায়, এ অবস্থায় গত দুই মাস ধরে মায়ের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ। বর্তমানে তিনি কিভাবে, কোথায় আছেন সে ব্যাপারে কোনো তথ্যই তার কাছে নেই। অনেকের অভিযোগ, মাসের পর মাস কেটে গেলেও, বারবার ধর্ণা দিয়েও তাদের পরিবারের সদস্যকে সৌদি থেকে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না। এমনই একজন মোছা. বিনা। তার ভাই মো. তারেক ৩০শে জুলাই অভিযোগ করেন, ৫ মাস পূর্বে সৌদি আরব যাওয়ার পর থেকে তার বোনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। নিয়োগকর্তা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছে। এর আগেও তিনি দু’বার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছিলেন। কোনো প্রতিকার না পেয়ে নতুন করে আবারো অভিযোগ দিলেন। তার বোনকে দেশে ফেরত আনতে তিনি নিয়মিতই মন্ত্রণালয়ে ধর্ণা দেন। সৌদি আরবের এসব অভিযোগের ব্যাপারে অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বলেন, নারী কর্মী পাঠানোর জন্য দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতা চুক্তি আছে তা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। এ ছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ঠিকমতো খোঁজ-খবর না নিয়েই নারীদের পাঠিয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সির ওপর বায়রা এবং সরকারের মনিটরিং অভাব আছে। তিনি আরো বলেন, এই অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে, সরকারের মনিটরিং বাড়াতে হবে। এ ছাড়া আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে নারী কর্মীদের জন্য সেখানে ডরমেটরির ব্যবস্থা করতে হবে। তারা কাজ শেষে ডরমেটরিতে ফিরে আসবে। এতে নির্যাতনের পরিমাণ কমবে। অনেক দেশ এখন এটা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাছাড়া দ্বিপক্ষীয় শক্তিশালী চুক্তি করার ওপরও জোর দেন এই অভিবাসী অধিকারকর্মী।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

লবিব

২০১৭-১১-১৪ ১২:৩৪:৩৭

দেশের প্রধান মনএী এক জন নারী, বিরোধী দলের প্রধানও নারী, বিএনপির মেডামও নারী। এরা ভাল করে জানেন । এই সৌদীরী কত খারাপ হতে পারে । কেন আমার মা বোনদের পাঠান । মা বোনরা আরবে জাবেন না । এরা মানুষ না । সৌদী রাজপুত তার নয় বউ । জুয়ায় দোকানে পাঁচ বউকে বিএী করে, জুয়া খেলেছে, আপনাদের কি সমমান দেবে । দুহাই আপনারা যাবেনা ।

mahbub rahman

২০১৭-১১-১৪ ১১:২৪:১২

আমাদের সরকার তা করবে কেন....তাহলে ওনাদের ধন্ধাবাজী বন্ধ হয়ে যাবে....সরকার নামেই কোন কাজে নাই.....এই বৈদেশিক সমস্যাটা অনেক পুরনো....সরকার এটার সঠিক সমাধান করতে পারে....কিন্তু করবেন না, শুধু শুধু জিইয়ে রাখবে.....আর পাবলিকের তামাশা দেখবেন.....হায়রে মন্ত্রীরা আমার...

আপনার মতামত দিন

বিএনপিকে ভোট দিয়ে অশান্তি ফিরিয়ে আনবে না জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

আরো ব্লগার হত্যার হিটলিস্ট

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা, অতঃপর...

ফের বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

চাহিদা নেই, তবুও রাজউকের নতুন ফ্ল্যাট প্রকল্প

‘আনিসুল হককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ভিত্তিহীন’

মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

সিলেটে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’, জল্পনা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

যশোর জেলা স্পেশাল জজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

অসুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে: ড. কামাল হোসেন