চলনবিলে মাছের আকাল

বাংলারজমিন

এম এ মাজিদ, চলনবিল (সিরাজগঞ্জ) থেকে | ১৫ নভেম্বর ২০১৭, বুধবার
মৎস্য ভাণ্ডারখ্যাত চলনবিল। এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ বিল এটি। এই বিলে কখনোই মাছের অভাব হতো না। নানা প্রজাতির বিরল মাছে ভরপুর থাকত চলনবিলের হাট-বাজার। কিন্তু নানা কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে সেসব মাছ। গত তিন দশকে মাছের উৎপাদন কমে এসেছে প্রায় ৫৫ শতাংশে।
আর ২৫টিরও বেশি প্রজাতির মাছ চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে। আশঙ্কাজনকহারে মাছের উৎপাদন হ্রাস ও বিলুপ্তির ফলে চলনবিল এলাকার হাট-বাজারগুলো প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। খাল-বিল, জলাশয়, নদী-নালা দখল-দূষণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কমছে পানির গভীরতা। অপরিকল্পিতভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, যত্রতত্র পুকুর খনন ও ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগের ফলে দেখা দিয়েছে বিরুপ প্রভাব। মাছের অভায়শ্রম গুলোতে বেড়েছে যত্রতত্র কীটনাশকের ব্যবহার। তাছাড়া অবৈধ উপায়ে মা মাছ, ছোট মাছ নিধনের ফলে মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে আশঙ্কাজনকহারে। বিলুপ্তি হচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছ। এতে মাছের ভরা মৌসুম বর্ষায়ও বিল এলাকায় মাছের আকাল। তাড়াশ উপজেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিলুপ্তির পথে রয়েছে নান্দিনা, ভাঙন, ঘোড়া, মহাশোল, তিলাশোল, ভ্যাদা, গুজার, রেনুয়া, সরপুঁটি, রিঠা, বাছা, চেলা, সোল, বোয়াল, গোজা, দেশি পাঙ্গাস, আইড়সহ আরো দেশি প্রজাতির নাম না জানা অনেক মাছ। প্রচলিত এসব মাছের খুব একটা দেখা মেলে না চলনবিলের হাট-বাজারে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমায় এক শ্রেণির অসাধু চাষি বাণিজ্যিকভিত্তিতে উৎপাদিত মাছের বেশির ভাগই চাষ করছেন বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্যে খাইয়ে। ফলে এসব মাছ খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করায় মানুষ চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। বাংলাদেশের বৃহৎ এই চলনবিলের আয়তন ছিল ৭৩ হাজার ৫০০ হেক্টর। কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট নানা সমস্যার কারণে বিলের আয়তন কমে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার হেক্টরে। এরমধ্যে চলনবিল অঞ্চলে ১৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ৩১টি নদী এবং ১২০ বর্গ কি.মি. আয়তন বিশিষ্ট ৩৭টি খাল রয়েছে। এরমধ্যে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বিল ও খাল রয়েছে। অতীতে ২৩ হাজারের মতো বড় বড় পানির আধার ছিল। যা বেশির ভাগই বেদখলকৃত ও হাত ছাড়া হয়ে গেছে। নদীগুলোর মধ্যে আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানী, করতোয়া, বড়াল, তুলসি চেঁচিয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ইত্যাদি। ১৮টি খালের মধ্যে নবীরহাজির জোলা, হক সাহেবের খাল, নিমাইচড়া খাল, বেশানীর খাল, গুমানী খাল, উলিপুর খাল, সাঙ্‌গুয়া খাল, দোবিল খাল, কিশোরখালির খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকই খাড়া, গোহাল খাড়া, গাড়াবাড়ি খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, জানিগাছার জোলা, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর ও কুন্দইল খাল। এসব নদী ও খালে এক সময় প্রচুর পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত, তা এখন শুধুই অতীত। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফারাক্কার বাঁধ বিরূপ প্রভাব ফেলে। আশির দশকে পদ্মার উৎস মুখে অপরিকল্পিত স্লুইচগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত বিভিন্ন নদ-নদী ও বিল, জলাশয়, খালগুলোতে পলি জমে ক্রমশ ভারাট হয়ে গেছে। বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছাভাবে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, নদী দখল করে বসতি, দোকানপাট স্থাপন করা। বিশেষ করে চলনবিলের বুক চিরে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক নির্মাণ করায় নদীগুলোতে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতি বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে মাছের স্বাভাবিক চলাচল, প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। এবং উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে চলনবিলে প্রায় ৮ হাজারেও বেশি যন্ত্রচালিত নলকূপ বসানো হয়। এতে পানির স্তর নিচে নেমে স্থায়িত্ব কমে আসছে। তাছাড়া কারেন্ট, বাদাই, সোঁতিসহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে প্রজননকালীন মাছ ধরা এবং এসময়ে গরিব মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রভাব, জেলেদের অজ্ঞতা, জলাশয় ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণসহ প্রভৃতি কারণে চলনবিল অঞ্চলে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে প্রায় ৪০ বছর আগেও চলনবিলের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীতে বছরজুড়েই ৬ থেকে ১০ ফুট পানি থাকত। ফলে বিলের মধ্য দিয়ে সারা বছর নৌ চলাচল করতো। জেলে, মৎস্যজীবীরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী ভরাট হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর ২২২১/২ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রবেশ করে, ৫৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বর্ষায় চলনবিল ত্যাগ করে। অবশিষ্ট ১৬৯১/২ মিলিয়ন ঘনফুট পলি নদ-নদীসহ চলনবিলে স্থিতি থাকায় ক্রমেই পলি জমে খাল-বিল, নদী-নালা সংকুচিত হচ্ছে। ফলে পানির অভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে মাছ।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বিএনপিকে ভোট দিয়ে অশান্তি ফিরিয়ে আনবে না জনগণ: প্রধানমন্ত্রী

অভিযোগ মিথ্যা এতিমখানার টাকা আত্মসাৎ করিনি

আরো ব্লগার হত্যার হিটলিস্ট

আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা, অতঃপর...

ফের বেড়েছে বিদ্যুতের দাম

চাহিদা নেই, তবুও রাজউকের নতুন ফ্ল্যাট প্রকল্প

‘আনিসুল হককে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ভিত্তিহীন’

মৌলভীবাজারে গ্রাহকের কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ভিডিএন চেয়ারম্যান ও এমডি

সিলেটে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’, জল্পনা

সম্ভাব্য প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

রোহিঙ্গা জাতি নিধনের তুমুল সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

‘আমি হতবাক’

ডাক্তাররা বেশ প্রভাবশালী ও তদবিরে পাকা: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

যশোর জেলা স্পেশাল জজের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ

রোহিঙ্গা শব্দ ব্যবহার না করতে বলা হলো পোপকে

অসুস্থ রাজনীতি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে: ড. কামাল হোসেন