কনফুশিয়াস প্রজন্ম জুলিয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২ নভেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৭
সদগুণ মানুষের কাছে আগুন, পানির চেয়ে বেশিকিছু। আগুন বা পানিতে পড়ে মানুষকে মরতে দেখেছি কিন্তু সৎ পথে চলায় কোনো মানুষকে মরতে দেখিনি। খাওয়ার জন্য মোটা চাল, পান করার জন্য পানি আর বালিশ হিসেবে আমার ভাঁজ করা হাত এর মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাই। অনৈতিক আচরণের মাধ্যমে অর্জিত ধন ও সম্মান আমার কাছে কেবল ভাসমান মেঘের মতো। তোমার যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তা ত্যাগ করতে ভয় পেয়ো না। নীতিবানের সঙ্গ ছাড়া চরিত্র গঠন সম্ভব নয়।
যারা মিতব্যয়ী নয়- তারা আজ হোক, কাল হোক ভুগবেই। অজ্ঞতা হলো মনের রাত্রি। যে রাত্রি চন্দ্রশূন্য, নক্ষত্রশূন্য। একইভাবে প্রতিশোধ নিতে যাওয়ার আগে দুটি কবর খুঁড়ো। ভবিষ্যৎকে মুঠোয় নেয়ার জন্য অতীতকে বিশ্লেষণ কর। ছোট থেকেই এই লাইনগুলো একজন নীতিসম্পন্ন আদর্শবান মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আমাদের। তিনি কনফুশিয়াস। প্রকৃত নাম খোন ছিউ। চীনে যাদের সম্মান প্রদর্শন করা হয় তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে ‘চি’। তাই কুনফুশিয়াসের নাম হয় খোন চি। চীনের লু রাজ্যে ৫৫১ খ্রিস্টপূর্বে মহান এই দার্শনিকের জন্ম। মৃত্যু খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৯ সালে।
দেড় শ’ কোটি মানুষের দেশ চীনে নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম নেই। তাদের ধর্ম হচ্ছে সময়, সৌজন্যতা, শৃঙ্খলা। আর রাজনীতি হচ্ছে সমাজতন্ত্র। যদিও বর্তমানে বস্তুবাদী পুঁজিতন্ত্রকেও আত্মীয়করণ করেছেন চীনের শাসকরা। সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব কথাকে মাথায় নিয়ে শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত যুগোপযোগী করছে চীন। সবশেষ শি জিনপিং তার ভাষণেও এমন আভাসই দিয়েছেন। ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোডের’ তত্ত্ব সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে চীন তার বিনিয়োগ-বাণিজ্যকে ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার এই তত্ত্বের বাইরে পৃথিবীব্যাপী চীন তার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও ভাষা শিক্ষাকে এগিয়ে দিয়েছেন কনফুশিয়াসের মাধ্যমে। যিনি দু’হাজার বছর ধরে তার দর্শন ও নীতি কথার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন চীনের মানুষের অন্তরে। কিন্তু একটি প্রশ্ন চীন যাওয়ার আগে, পরে, চীন ভ্রমণকালে মনে উঁকি দিয়েছে। চীন চলছে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে। আর কনফুশিয়াস হচ্ছেন একজন দার্শনিক বা শিক্ষাগুরু। সব ফেলে চীন সরকার কেন কনফুশিয়াসকে বাছাই করে নিলো? কনফুশিয়াস তো তাদের জাতির জনক নয়। কনফুশিয়াস কোনো ধর্মগুরুও নয়। প্রশ্নের উত্তর মিলেছে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণি কক্ষেই। কুনমিং পৌঁছার একদিন পরেই আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত ত্বালির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য একটি সেশন ছিল। যেখানে কনফুশিয়াসের ৭৬তম প্রজন্ম জুলিয়া অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে আমাদের নিয়ে যান ত্বালি শহরে। কিন্তু সব চাপিয়ে আমরা কনফুশিয়াস পরিবারের সদস্যকেই দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল আমরা দু’ হাজার বছরের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছি জুলিয়ার মাধ্যমে। তিনি বর্তমানে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে কনফুশিয়াসের ৭৩তম প্রজন্ম কং চিংতং শিক্ষকতা করছেন চীনের পার্কিং ইউনিভার্সিটিতে। ত্বালি নিয়ে এক ঘণ্টার উপস্থাপনা শেষে কিছু জিজ্ঞাসা নিয়ে হাজির হলাম জুলিয়ার কাছে। ভাঙা ভাঙা গলায় ইংরেজি বলতে পারেন জুলিয়া। আমার অবস্থাও একইরকম। জানতে চাইলাম, সমাজতান্ত্রিক সরকার কিভাবে চীনের নীতি দর্শনে কনফুশিয়াসকে বানিয়েছে? কনফুশিয়াস পরিবারের একজন হিসেবে তিনি কেমন বোধ করেন? কনফুশিয়াস যেভাবে চীনকে দেখতে চেয়েছেন আর বর্তমান চীন যেভাবে চলছে তাতে কোনো দ্বন্দ্ব চোখে পড়ে কিনা? কনফুশিয়াস পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে জুলিয়া সত্যিই ভাগ্যবতী। তাছাড়া কনফুশিয়াসের নীতিদর্শন একটি পূর্ণ জীবনধারা। মানুষ সৎ চিন্তার মধ্য দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক জীবন গঠন করবে এবং সততার সঙ্গে দেশ চলবে তাতে কোনো দ্বন্দ্ব দেখেন না বলে জানালেন জুলিয়া। ব্যস্ততা থাকায় জুলিয়ার সঙ্গে আর বেশি কথা এগোয়নি। তবে আমার কিছুটা দ্বিধা রয়েই গেল। চীনে একের পর এক রাজ-রাজড়া দেশ চালিয়েছে। চীন ছিল পুরাকালে খণ্ড খণ্ড। একেক খণ্ডের ডায়নেস্টির ধরনও ছিল ভিন্ন। মোটাদাগে চিং ডায়নেস্টি, মিং ডায়নেস্টি, সান ডায়নেস্টি, থান ডায়নেস্টির কথা আমরা শুনে থাকি। এর বাইরে মঙ্গোলিয়ানদের অধীনে ছিল চীনের বড় একটি অংশ। অন্যদিকে ধর্মীয় মতবাদে চীনে এক সঙ্গে চলেছে বুদ্ধিজম, তাওইজম আর কনফুশিয়াসিজম। কনফুশিয়াস চীনের প্রচলিত সমাজ থেকেই তার নীতিকথা বর্ণনা করতেন। আর ফিউডাল বা সামন্তবাদী শাসকরা তাদের শাসন ক্ষমতার সঙ্গে মৌল ক্ষেত্রে কোনো বিরোধ দেখতেন না কনফুশিয়াসের। চীনে এক সময় শুধু অভিজাত পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার অধিকার ছিল। কনফুশিয়াস তা ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের সন্তানদের নিয়ে আসতেন শিক্ষা দেয়ার জন্য। কনফুশিয়াস তার ছাত্রদের রাজনৈতিক মতবাদ, ব্যক্তিগত চরিত্র গঠন, নৈতিক চিন্তাধারা শিক্ষা দিতেন। সে সময়ের সামন্ত শাসকরা প্রথমদিকে তার মতবাদ গ্রহণ না করলেও খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে চীন যখন একীভূত তখন তার মতবাদকে গ্রহণ করে। এর পেছনে যুক্তি ছিল কনফুশিয়াসের মতবাদ সামন্ততান্ত্রিক সমাজে স্থিতিশীলতা রক্ষার পক্ষে অনুকূল। সে সময় সামন্ত শাসকরা তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সুবিধার জন্য তার মতবাদকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। কনফুশিয়াস মনে করেন, নিচুস্তরের কর্মকর্তার উপরওয়ালার নির্দেশ লঙ্ঘন করা আর ছেলে বাবার কথা অনুসারে কাজ না করা গুরুতর অপরাধ। রাজাকে ভালো করে দেশ শাসন করতে হবে এবং প্রজাদের রাজাকে মান্য করতে হবে। একজন মানুষ একই সঙ্গে মন্ত্রী, বাবা ও ছেলে হতে পারেন। তাকে বিভিন্ন অবস্থায় শ্রেণিবিভাগ ও পারিবারিক অবস্থান অনুসারে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। কনফুশিয়াসের চিন্তাধারা ‘লুন ইয়ু’ নামক বইতে লিপিবদ্ধ আছে। যে বই শত শত বছর ধরে চীনা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনায় আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কনফুশিয়াসের উক্তি চীনের বিভিন্ন স্থানে আদর্শ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কমিউনিজমের শুরুতে কনফুশিয়াসের মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণ করা হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। প্রথমদিকে কনফুশিয়াসের মতবাদকে খুব একটা আমলে নেয়া না হলেও বর্তমানে পুরো বিশ্বে কনফুশিয়াসের নামে চীনে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

দেশে দেশে কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট
কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটকে চীনা ভাষায় বলে ‘কংজি সুয়েইউয়ান’। এটা চীনা সরকারের একটা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। এই প্রতিষ্ঠান ২০০৪ সালে তাদের কর্মসূচি শুরু করে। পেইচিংয়ে অবস্থিত হানবানের মাধ্যমে কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। এটি স্থানীয় কিছু অধিভুক্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় পুরো বিশ্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রথম কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট শুরু ২০০৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে। কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের শাখা খোলার ক্ষেত্রে আমেরিকা, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয় প্রথমে। এরপর শতাধিক শাখা খোলা হয় সারা বিশ্বজুড়ে। ২০০৭ সালের এপ্রিলে প্রথম গবেষণাভিত্তিক কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট চালু হয় জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চাইনিজ পাঠরত স্নাতক ছাত্ররা গবেষণা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। ২০১৪ সালে এসে ছয়টি মহাদেশে কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৮০তে। হানবান-এর লক্ষ্য হচ্ছে ২০২০ সালের মধ্যে এক হাজার কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা।
এই প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াসের নামে। বিংশ শতাব্দি জুড়ে চীনের কমিউনিটি পার্টির নেতারা কনফুশিয়াসকে নিতে পারেনি তার সামন্ত্রতান্ত্রিক চিন্তাধারার জন্য। কিস্তু বর্তমান সময়ে এসে নতুন চীন কনফুশিয়াস-এর দর্শনকে নতুন করে আত্তীকরণ করে এবং কনফুশিয়াসকে চীনা সংস্কৃতির প্রধান বাহক মনে করে। তাই কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট এখন একটা ব্র্যান্ড নাম। এবং ব্র্যান্ডের বিচারে এই প্রতিষ্ঠান সারা বিশ্বে জনপ্রিয় এবং সমাদৃত। ‘কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট’ মূলত চীনের মূল জনপদের ভাষা সহজ সরলভাবে শিখিয়ে থাকে। এই প্রতিষ্ঠান চীনের ঐতিহ্যবাহী চাইনিজ ক্যারেক্টার যেগুলো তাইওয়ান ও হংকংয়ে ব্যবহৃত হয় সেসব শেখানো থেকে বিরত থাকে।
বাংলাদেশে প্রথম কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রতিষ্ঠান তার কার্যক্রম শুরু করে। কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট খোলার পরিকল্পনা চলছে। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

জিতলেন ডগ জোনস, হারলেন রয় মুরস

লালমনিরহাটের সাবেক সাংসদ জয়নুল আবেদীন আর নেই

লক্ষ্মীপুরের সেই এডিসি ও ইউএনওর নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা

আইসিসের পক্ষে বোমা হামলার স্বীকারোক্তি, আকায়েদের বিরুদ্ধে ৮ মামলা

‘ট্রাম্প, তুমি তোমার জাতিকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছ’

সঙ্কট সমাধানে মিয়ানমারকে সহায়তার প্রস্তাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের

বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি নিয়ে আদেশ ২রা জানুয়ারি

তেজগাঁওয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ডাকাত নিহত

‘অভিনয়ের সময় আমি চরিত্রের একেবারে গভীরে ঢুকে যাই’

ফের বৃটেনের ভ্রমণ সতর্কতা, জনসমাগমে হামলার শঙ্কা

আকায়েদ নিজেই বোমার কারিগর

অভিবাসন নীতিতে অনেক গলদ আছে

গেইল তাণ্ডবে মাশরাফির হাতেই শিরোপা

বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা

টঙ্গীতে দুই প্রবাসীকে কুপিয়ে হত্যা

নিউইয়র্কে হামলায় বাংলাদেশের নিন্দা