চির বসন্তের দেশে, ২৪

প্রেমের টানে ইউনানে

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ৩০ অক্টোবর ২০১৭, সোমবার
একজন আবু সোয়াদ। অন্যজন ওয়াং ইলিং। দু’জন দু’লিঙ্গের। দু’প্রান্তের। দু’জন দু’মতেরও। একজন ঢাকার। অন্যজন ইউনানের। সোয়াদ-ইলিং এখন এক ইতিহাস। সে যুগের শিরি-ফরহাদ কিংবা চণ্ডিদাস-রজকিনি নয়, এ যুগের সোয়াদ-ইলিং প্রেমের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছেছে বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে। এ এক অন্য কাহিনী। অন্যরকম প্রেম কথা। ইলিং-এর চোখে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে প্রথম দর্শনেই সোয়াদ। সেটি ২০১৪ সাল। বাবা সামরিক কর্মকর্তা। বাবার প্রশিক্ষণ গ্রহণে চীন যাওয়ায় চীনা ভাষার প্রতি এক-আধটু পরিচয়। ভালো লাগা। আগ্রহ থাকায় আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে যুক্ত হন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে। সবেমাত্র চালু হয়েছে কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট। সেখানকার প্রথম দিককার ছাত্র সোয়াদ। চার/পাঁচজনের টিম তখন এখানে চাইনিজ শেখাতো। পরিচালক ছিলেন মা ইয়েন। লেভেল থ্রিতে পড়তেন সোয়াদ। তখন মাঝেমধ্যেই দেখা হতো ইলিং-এর সঙ্গে। দূর থেকে কখনও কখনও তাকিয়ে থাকা। ইলিং-এর অন্যকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা ও বিনম্র ব্যবহার মুগ্ধ করতো সোয়াদকে। এভাবেই কেটে যায় ৫/৬ মাস। ভেতরে ভেতরে দু’জনই দু’জনকে অনুভব করে। এ যেন বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। চীনা ভাষা শিখতে গিয়ে এক সময় যুক্ত হয় চীনা সংস্কৃতির নানা বিষয়ের সঙ্গেও। বাড়তে থাকে হৃদ্যতা। বাড়তে থাকে বিনিময়। ইলিং-এর ইংরেজি নাম ছিল অ্যানা। নর্থ সাউথ ক্যাম্পাসে সে অ্যানা নামে সকলের নজর কেড়েছিল। গল্পচ্ছলে একদিন ভূতের ছবি নিয়ে কথা হয়। সোয়াদেরও আগ্রহ ছিল হলিউড-বলিউডের ছবি নিয়ে। কথায় কথায় অ্যানাকে বেশকিছু ভূতের ছবি দেখতে বলে। তার মধ্যে স্মরণকালের অন্যতম ভয়ের ছবি ্তুঞযব ঈড়হলঁৎরহম্থ। ছবিটি দেখে অ্যানা পাশে থাকা অন্য কলিগদের কাছে ছুটে গিয়েছিল। এভাবেই ধীরে ধীরে ভাব বিনিময়ের সুযোগ বাড়তে থাকে দু’জনের। কথায় কথায় সময় করে যমুনা ফিউচার পার্কে ছবি দেখতে যায় দু’জন। এটিও ছিল ভয়ের ছবি। কিন্তু হরিষে বিষাদ। ইউনানের তৃতীয়বর্ষের শিক্ষার্থী ইলিংকে ফিরতে হবে কুনমিং। কারণ, এটি ছিল খণ্ডকালীন। দশ মাস পার হয়ে গেছে। সুতরাং ফিরতে হবে। সোয়াদের স্বপ্নগুলো জেগে ওঠার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে। হতাশায় মুষড়ে যায়। ইলিংকে বলা হয় না অনেক কথাই। যে যাওয়ার সে তো যাবেই। সোয়াদের শুধু পথ চেয়ে থাকা। শুধু সময়-সুযোগের অপেক্ষা। যোগাযোগটা তাদের থাকে নানাভাবে। এরমধ্যে সোয়াদ ২০১৫ সালে চাকরি নেয় একটি চীনা কোম্পানিতে। নানা ব্যস্ততায় এক বছর কেটে যায়। তর সয় না। আবেগ মুষড়ে পড়ে। মন খারাপ করা বাতাস চারপাশকে অস্থির করে তোলে। সোয়াদ সিদ্ধান্ত নেন কুনমিং যাবেন। সময়টা ২০১৬ সালের জানুয়ারি। সেখানে তখন ঠাণ্ডা। একবছর পর দেখা। অনেক জমে থাকা কথা। বরফ গলতে শুরু করে। তীব্র ঠাণ্ডা। তাতে কি? দু’টি প্রাণের উষ্ণতা ছড়ায় কুনমিং-এর বিভিন্নস্থানে। ইলিং সোয়াদকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে। পরিচিত হয় ইলিং-এর বাবা-মায়ের সঙ্গেও। জীবনের সিদ্ধান্তগুলো দ্রুতই বদলে যেতে থাকে সোয়াদের। দু’জনই দু’জনকে কাছে পেতে চায় চিরদিনের তরে। ইলিং-এর অভিভাবকরা রাজি। অন্যদিকে রাজি সোয়াদের পরিবারও। কুনমিং সফরেই সোয়াদ সিদ্ধান্ত নেন ইলিং-ই হবে তার অর্ধাঙ্গিনী। অন্যদিকে বাংলাদেশের মানুষের সরলতা ভালো লেগে যায় ইলিং-এর। তাই তো ঢাকায় এসে শুধু সোয়াদকে নয় এখানকার সাদাসিধে জীবনযাপনও আপন করে নিয়েছেন ইলিং। গ্রহণ করেছেন ইসলাম ধর্ম। ইলিং নতুন নাম রেখেছেন ‘আলিমা’। সোয়াদ নিজের জবানিতেই বলেছেন সেই গল্প- ভালো লাগা, প্রেম ও পরিণয়।
অ্যানার চোখে আমার প্রতি ভালোবাসা দেখে সিদ্ধান্ত নেই কুনমিং আসার। এর মধ্যে কনফুসিয়াসে আমি দুইবার চীনা বৃত্তি পাই। কিন্তু দুইবারই আমাকে প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছিল। প্রথমবার, আমি যখন বৃত্তি পেয়েছিলাম, তখন ছিলাম ৩য় বর্ষের ছাত্র, পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে চীন যাওয়া ছিল অসম্ভব। দ্বিতীয়বার, যখন বৃত্তি পেলাম, তখন কোম্পানিতে কর্মরত। নিজ হাতে গড়া চীনা কোম্পানি, আমি ছেড়ে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই বিপদে পড়বে, এই ভেবে আর যাইনি। তাই মনের মধ্যে সবসময় অনুশোচনা কাজ করতো যে, এত সুযোগ পেয়েও চীনা ভাষাটা শিখতে পারলাম না। তাই সংকল্প নেই, যে করেই হোক, চীনা ভাষা শিখতে হবে, দরকার হলে নিজ খরচে হলেও শিখবো। বাবা পেনশনের কিছু টাকা আমার উচ্চশিক্ষার জন্য বরাদ্দ রেখেছিলেন। চীনে আসার আগে একটা স্বনামধন্য চীনা কোম্পানি থেকে বৃত্তি পাই। পরিবারের সবাই আমাকে চীনে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মা নিগার সুলতানা, বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু সোহেল এবং চাচা এয়ার চিফ মার্শাল আবু এসরার যথেষ্ট অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতা প্রদান করেছেন। অ্যানাকে দেখার সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা এবং চীনা ভাষা শেখার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাকরি ছেড়ে কুনমিং যাই।
কুনমিংয়ে আসার পর অ্যানা এবং আমার সম্পর্ক গভীরতা লাভ করে। সিদ্ধান্ত নেই বিয়ে করার। অ্যানার বাবা-মা’র মনে শুরুতে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরবর্তীতে তা কেটে যায়। আমার বাবা-মা সানন্দে আমাদের বিয়ের ব্যাপারে রাজি হন। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে অ্যানা পুনরায় বাংলাদেশে আসে। ঘটনাক্রমে সেসময় আমার চাচাতো বোনের বিয়ে। বিয়ের অনুষ্ঠানে অ্যানা আমাদের পরিবারের অনেকের সঙ্গে পরিচিত হয়। পরিবারের সবাই তাকে আপন করে নেয়। এরপর ইসলামী রীতিতে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। বর্তমানে আমি চীনা ভাষায় উচ্চতর কোর্স করছি, আলিমা কুনমিংয়ের অন্যতম একটা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করছে। এভাবেই সোয়াদ আর ইলিংয়ের প্রেমকাহিনী পূর্ণতা পায়।


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Sumaiya

২০১৭-১০-৩০ ০৬:৫৪:১৭

I cant stop crying....Soad god bless u both.....daoat thaklo .....

ইয়ারিদ

২০১৭-১০-৩০ ০১:৫৭:২১

অভিনন্দন সোয়াদ :)

MUHAMMAD Haque

২০১৭-১০-২৯ ২৩:২৮:৪৮

Very good that, the Chinese lady converted to Islam !

Shahnur alam

২০১৭-১০-২৯ ১১:৪২:০০

Masha Allah welcome to Chittagong please 0096895713953

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ এক সপ্তাহ স্থগিত

বাকেরগঞ্জে সাবেক এমপি মাসুদ রেজার ভাই গুলিবিদ্ধ

বিরাট-আনুশকার বিয়ে সম্পন্ন

কংগ্রেসের নতুন প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী

কলকাতায় ডিয়াগো ম্যারাডোনা, খেলবেন ফুটবল

আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো দল নেই: জয়

কুমিল্লাকে হারিয়ে রংপুর ফাইনালে

স্বর্ণের দাম কমেছে

‘আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতাকে গুলি করি’

১৫টি পদের ১৪টিতেই আওয়ামীপন্থীদের জয়

ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ

রাজধানীতে গলাকাটা লাশ উদ্ধার

অতিরিক্ত সচিব হলেন ১২৮ জন

ভুয়া ডাক্তারকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

এবি ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ ৪ জনকে দুদকে তলব