চির বসন্তের দেশে, ২৩

শিক্ষার্থীদের ভাগ্য লেখে ‘কাউখাউ’

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৯ অক্টোবর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৮
পরীক্ষা ভাগ্য বদলে দেয়। কে ভালো ফল করেছে। কে কোথায় পড়তে চায়। কি বিষয় নিয়ে পড়তে চায়। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। সবই ঠিক করে দেয় পরীক্ষা।
আর চীনে এই পরীক্ষাকে বলা হয় ভাগ্য নির্ধারক। এটা ‘কাউখাউ’ বলে পরিচিত। সকল শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষে কেন্দ্রীয়ভাবে অংশ নিতে হয় এ পরীক্ষায়। আর এর ফলাফল বলে দেয় পেইচিং, শাংহাই, ইউনান না সিচুয়ান। উচ্চতর পড়াশোনা হচ্ছে কোন বিষয়ে? পুরো চীনে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়ার পর শিক্ষার্থীরা এ নিয়েই সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন থাকে। যেমন: কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় দুজন শিক্ষক বা লাওশিকে জানি। একজন তাই লাওশি। অন্যজন লিও লাওসি। যারা ইউনান প্রদেশের হলেও মাধ্যমিক দিয়ে পড়তে হয়েছে সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবার ইউথক্যাম্পে গিয়ে পরিচয় হয়েছে থান, সোফিয়া ও রিন্ডার সঙ্গে। এরা সকলেই বর্তমানে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স করছে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে এরা একজন লাওস সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা, অন্যজন দক্ষিণ চীনের আর অপরজন হুপেই প্রদেশের। ‘কাউখাউ’ সবকিছু চূড়ান্ত করবে। পরীক্ষা খারাপ হলে দ্বিতীয়বার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে প্রথমবার পছন্দের দিক থেকে শিক্ষার্থীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হয়। দ্বিতীয়বারে সে সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। সে বিষয়ে বিস্তারিত যাওয়ার আগে বলতে চাই চীনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা কি? কিভাবে তাদের পড়াশোনা হয়।
ভালো লাগা একটি দিন
২২শে সেপ্টেম্বর শুক্রবার। নোটবুকে ভালো লাগা একটি দিন। স্মরণীয় এই দিনটি কেটেছে তংলু এলাকায় ইউনান ইউনিভার্সিটির পুরনো ক্যাম্পাসে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সেকশনে। খুদে বন্ধুদের উদ্ভাবনী প্রতিভায় সেদিন সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। আফসোস হয়েছে ছেলেবেলা আবার যদি ফিরে পেতাম। দিনভর একে একে চীনের ট্রাডিশনাল খেলাধুলা, তাইকোয়ান্দো, ব্যাডমিন্টন, ইকেবানা, ছবি আঁকা, খাবার তৈরি, ড্যান্স, অপেরা সম্পর্কে জানা ও বেশকিছু অনুশীলনে আমরা হাতে-কলমে অংশ নিয়েছি। বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে কথা হয়েছে চীনের নতুন প্রজন্মের সঙ্গে। তুয়া-ই চিয়েন, লিও, পার্ক, হার্স লি, নিনা, কেওল, জুলি, লিয়েল, চাং-ই ফেই-এর সঙ্গে। তারা স্বপ্ন দেখে একটি উন্নত সমৃদ্ধ চীন গড়ার। প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশকে এগিয়ে নেয়ার। ওদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি- প্রতিদিন তাদের স্কুল শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। আর ছুটি সন্ধ্যে সাড়ে ৬টায়। দিনের অর্ধেক সময় তারা ক্লাসের নির্ধারিত পড়া আর বাকি অর্ধেক সময় বিভিন্ন ব্যবহারিক ক্লাসে অংশ নিতে হয়। ব্যবহারিকে হরেক রকম বিষয় রয়েছে। নাচ, গান, রান্না থেকে শুরু করে খেলাধুলা পর্যন্ত। প্রতিটি ব্যবহারিক ক্লাসে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক। ব্যবহারিক ক্লাস শিক্ষার্থী তার পছন্দ অনুযায়ী নিতে পারবে। তবে প্রতি তিনমাস অন্তর তার ব্যবহারিক ক্লাস বদল হবে। এভাবে গড়ে সব ব্যবহারিক ক্লাসেই কোনো না কোনো এক সময়ে সকল
শিক্ষার্থীরা অংশ নেুয়ার সুযোগ পায়। এটাই একেকজন শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পদ্ধতি। আর এর মধ্যদিয়ে বাছাই করে নেয়া হয় কোন কোন শিক্ষার্থীর আগ্রহ বা ঝোঁক কোন বিষয়ের ওপর। তাকে পরবর্তী সময়ে সেই বিষয়ের ওপর মনোযোগ দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। আরেক বিষয় হলো- প্রাথমিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের ৯০ ভাগ ক্লাসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। আর মাধ্যমিক বিভাগে শিক্ষার্থীদের ৮০ ভাগ উপস্থিতি। এর ব্যত্যয় ঘটলে রয়েছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। সকালে ঘুম ভেঙে বইখাতা নিয়ে স্কুলে আসার পর থেকে পুরোদিন কেটে যায় এখানেই। এই সময়ের মধ্যে ভাবনা নেই খাবার-দাবারের। কারণ কর্তৃপক্ষ স্কুল থেকে সব সরবরাহ করে। ফলে অভিভাবকরাও থাকেন সন্তান নিয়ে নিশ্চিন্ত-নির্ভার। দিনশেষে বাবা-মা তাদের কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
চীনে ৬ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সকলের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক। ৯ বছর তাদের দুই ভাগে পড়তে হয়। প্রথম ছয় বছর প্রাথমিক আর তার পরের তিন বছর মাধ্যমিক। কোন কোন প্রদেশে ছয় বছরের স্থলে পাঁচ বছর প্রাইমারি হলে পরের অংশ হয়ে যায় চার বছরের। পড়ার সকল খরচ বহন করে সরকার। আর এ ব্যবস্থা জুনিয়র মিডল স্কুল এবং সিনিয়র মিডল স্কুল বলে পরিচিত। আমাদের এখানকার পড়াশোনার বেশ কিছুটা তফাৎ রয়েছে। আমরা টানা ১০ বছর প্রাথমিক, মাধ্যমিক শেষ করে তারপর দুই বছর উচ্চ মাধ্যমিক। কিন্তু চীনে উচ্চ মাধ্যমিক বলে কিছু নেই। আর জুনিয়র মিডল আর সিনিয়র মিডল শেষে পোস্ট গ্রাজুয়েট এবং গ্রাজুয়েট করতে হয়। ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থান হউন।
পেইচিং পার হয়ে হুপেই এলাকার বাসিন্দা। হুপেই-এর রাজধানী উহান। ইউনান থেকে বিমানে প্রায় ছয় ঘণ্টা লাগে তাদের বাড়ি যেতে। কাউ খাউ তার পড়ার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে ইউনানে। চটপটে কর্মচঞ্চল থান পড়ছেন ইংরেজি সাহিত্যের অনুবাদ বিভাগে। গ্রাজুয়েটের প্রথম বর্ষে এখন। ভবিষ্যৎ স্বপ্ন চীনের সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় পরিচিত করতে চান। চীনের শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন তার লেখনির মাধ্যমে। থানের লেখায় রয়েছে- শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মজার সব তথ্য।
ভাগ্য যখন ‘কাউখাউ’
চীনে সাধারণ ৩ থেকে ৬ বছরের শিশুদের কিন্ডারগার্টেনে পাঠানো হয়। শিশুদের নার্সারিতে থাকা অবস্থায় সাধারণ জ্ঞান, চাইনিজ, পিনয়িন, সংগীত, গণিত ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। নার্সারি শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করে দেয়। ৬ থেকে ১২ বছরের শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার উপযুক্ত। বিশেষ করে শিশুরা ৬ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। এ সময় তাদের গণিত, ইংরেজি, চাইনিজ, বিজ্ঞান, সংগীত, শিল্প, শারীরিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। ক্লাসরুমের পাঠ ছাড়াও তাদের বাইরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়, যেমন: চারপাশের পরিবেশ দেখে আঁকতে শেখানো, কোনো পার্কে নিয়ে যাওয়া, শারীরিক প্রশিক্ষণ ইত্যাদি। শিশুদের বয়স যখন ১৩, ১৪ বা ১৫ বছর, তখন তারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে পারে। তারা এখানে ৩ বছর শক্ত নিয়ম কানুন মেনে পড়াশোনা করে। চীনে বাধ্যতামূলক শিক্ষা হচ্ছে প্রত্যেককে কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষাসহ, জুনিয়র মাধ্যমিক মিলে কমপক্ষে ৯ বছর পড়াশোনা করতে হয়।
১৬ থেকে ১৮ বছরের ছাত্ররা সিনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে পারে। ছাত্রদের জন্য সিনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে এটা নির্ধারিত হয় জাতীয় কলেজ এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। চীনে যাকে কাউখাউ বলে। এ জন্য সিনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গভীরভাবে পাঠদানসহ একটু কঠোর আচরণ করে ছাত্রদের সঙ্গে। বিদ্যালয়ে শিক্ষারত ছাত্রদের প্রত্যেকটা মুহূর্ত হিসাব করে চলতে হয় কারণ প্রত্যেক সপ্তাহে অনেক পরীক্ষা থাকে, যাতে তারা কতটুকু শিখছে বোঝা যায়। বলা যায়, ‘কাউখাউ’ চীনে একটা ছাত্রের শিক্ষা জীননে বিরাট ভূমিকা পালন করে। কারণ এটি তার ভবিষ্যৎ জীবন নির্ধারিত করে দেয়। কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কি বিষয়ে পড়বে, কি ক্যারিয়ার করবে ইত্যাদি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় বছরের শুরু থেকে ছাত্ররা কলেজ এন্ট্রাস পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে থাকে। ছাত্ররা চারটি বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। যেমন: চাইনিয়, গণিত, ইংরেজি এবং সমন্বিত পরীক্ষা (লিবারেল আর্টস) অথবা সমন্বিত পরীক্ষা (বিজ্ঞান)। সমন্বিত পরীক্ষা (লিবেরেল আর্টস)-এর বিষয়গুলো হলো- ভূগোল, ইতিহাস, রাজনীতি। অন্যদিকে সমন্বিত পরীক্ষা (বিজ্ঞান)-এর বিষয়গুলো হলো- জীববিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা। প্রত্যেক ছাত্র তাদের আকাঙ্খিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিষয় পাওয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে সারা বছর। কেউ যদি ‘কাউখাউ’ পরীক্ষায় খারাপ করে বা তার প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল করতে না পারে, সে পুনরায় পরীক্ষায় দিতে পারে ফলাফল ভালো করার জন্য।
‘কাউখাউ’ পরীক্ষার এক মাসের মধ্যে ফলাফল দিয়ে দেয়া হয়। তারপর ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে। আবেদন প্রক্রিয়া পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে আবেদন করে সেই ছাত্ররা যাদের বিশেষ বিষয়ে কিছু যোগ্যতা আছে, যেমন- অ্যাথলেটিকস, সংগীত, চিত্রকলা। বাকি ধাপ ফলাফলের ভিত্তিতে প্রথম পর্যায়ের ছাত্র, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়। শেষ ধাপের ছাত্ররা হচ্ছে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ স্কুলের। বিশেষ করে সাধারণ ছাত্ররা বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটু বেশি সুবিধা পায়। আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এক মাসের মধ্যে ফলাফল জানিয়ে দেয়া হয়। কেউ যদি আবেদন করতে ব্যর্থ হয়, তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়া হয় কিন্তু সে ক্ষেত্রে তার বিশ্ববিদ্যালয় পছন্দ করার সুযোগ কমে যায়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ মহাসচিবের ৫ প্রস্তাব

বাংলাদেশ থেকে ইরাকে মানবপাচার বাড়ছে

নতুন ১৮ ওয়ার্ড নিয়েই ঢাকা উত্তরে ভোট

মোবাইল কোর্ট আইনের অপব্যবহার হচ্ছে

মন্ত্রীপুত্র জেলে

আমরা আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করবো

প্রশ্নফাঁস বন্ধে দুদকের ৮ সুপারিশ

কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণা

সিলেটে মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা

অস্বস্তিতে আওয়ামী লীগ বিএনপিতে শঙ্কা

ক্ষতিগ্রস্তকে ৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

জেরুজালেম প্রশ্নে ওআইসি চুপ থাকতে পারে না

‘বিচার বিভাগ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে’

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ সফরের আহ্বান

৪ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীপুত্র কারাগারে