ইউনানের ১৮ আজব রীতি

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২৬ অক্টোবর ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০২
ইউনান। ইউন মানে মেঘ। নান মানে দেশ। ইউনান হচ্ছে মেঘের দেশ। আর মেঘের বিচিত্র রূপ দেখা যায় চীনের এই শহরে। আর রয়েছে পর্বতমালা। মেঘ-পাহাড়ের মেলবন্ধনে এখানকার মানুষের জীবনধারাও  আজব সব রীতি দিয়ে ঘেরা। যা একেবারেই বিচিত্র অন্য যেকোনো দেশ ও জাতি থেকে। এমনকি চীনের অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গেও মিলে না ইউনানের অনেক কিছু। এমন ১৮টি আজব রীতিই আজকের লেখায় তুলে ধরছি-

গুচ্ছাকারে ডিম বিক্রি
ইউনানে লংলি কাউন্টিতে বাজারে ডিম বিক্রয় হয় আজব কায়দায়। লংলির পুশানে পাহাড়ি পথ বলে ডিম কেনাবেচা করতে বাজারে
নিয়ে যাওয়া সত্যিই চ্যালেঞ্জের কাজ। বিশেষ করে ডিম ভেঙে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই ডিমকে খড় দিয়ে মুড়িয়ে নিয়ে আসেন স্থানীয়রা। এটা অনেকটা আমাদের দেশে পাট দিয়ে তৈরি শিকার মতো দেখতে। এর ফাঁকে ফাঁকেই ডিম ঢুকিয়ে সাজিয়ে রাখা হয় বিক্রয়ের জন্য। ডিমগুলো আনুভূমিক (horizontall) এবং উলম্বিক (vertically) ঝুড়িতে বিশেষ কায়দায় মুড়িয়ে রেখে দেয়া হয়। আর ডিম বিক্রয় হয় আমাদের দেশের মতো হালির হিসাবে নয় আঁটি করে।

তরুণী যেখানে বৃদ্ধা
ইউনানের কিছু এলাকায় মেয়েদের বুড়ি বলে সম্বোধন করা হয়। বিশেষত সিচুয়ান এবং চুচিয়ং এলাকায় তরুণীদের যাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮-এর মধ্যে তাদের বুড়ি বলে। অদ্ভুত এই রীতিটি প্রচলিত অবিবাহিত মেয়েদের সম্মান জানাতেই। আর বুড়ি বলে তাদের আপন করে নেয়া হতো। বলা হতো, মেয়েটি বড় হচ্ছে। একদিন বিয়ে হবে। সংসারের দায়িত্ব নেবে। আর ইউনান বা কুনমিং এলাকায় বিবাহিত মেয়েদের শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। অন্যদিকে বিয়ে করলেই তো মেয়েরা একদিন বুড়ি হয়ে যাবে। এছাড়া Old lady সম্বোধনের মধ্য দিয়ে তার সুস্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধি কামনা করা হতো।

কান পিঠা
কান পিঠা বা Ear pie ইউনানের একটি প্রসিদ্ধ খাবার। এটি চালে তৈরি। বাংলাদেশের বাকরখানির মতোই দেখতে অনেকটা। এটি ইউনানের খুবই পরিচিত একটি খাবার। আর্থুং বলে এই খাবার কুনমিং-এর দোকানগুলোতেও ব্যাপক হারে বিক্রয় হয়ে থাকে। এটি নুডুলস, রাইস নুডুলস এবং স্থানীয় কিছু খাবারের সঙ্গেও পরিবেশন করা হয়। এটা সিদ্ধ এবং ভাজি করে খাওয়া যায়। আর এর বিশেষত্ব হচ্ছে  Teng chong Dajiu jia তেং চং তাজিয়া চিয়া বা পাতলা চালে তৈরি বিশেষ ধরনের ভাজা নুডুলসে ব্যবহৃত হয়।

গাড়ি যখন পরীর দেশের মেঘ
পর্বতঘেরা ইউনানের আঁকাবাঁকা পথে যখন গাড়ি চলে তখন চারদিক থাকে মেঘে ঢাকা। অনেক পাহাড়ের নিচে মেঘেরা লুকিয়ে থাকে। তখন গাড়িগুলো চলে যায় মেঘের উপর দিয়ে। গাড়িতে থাকা যাত্রীদের তখন মনে হয় তারা যেন পরীর দেশে এক টুকরো মেঘ হয়ে চলে যাচ্ছে দূরে কোথাও। কুনমিং থেকে ত্বালি যাওয়ার পথে কখনও কখনও আমরাও এমন বিস্ময়ের মুখোমুখি হয়েছি। বিশেষ করে ত্বালিতে যাওয়ার পর রাস্তার পাশেই উঁচু পাহাড়ের আড়ালে মেঘ লুকিয়ে আছে যা মনে হয় আমাদের গাড়িকে ঢেকে দিচ্ছে। আর থ্রি প্যাগোডায় হেঁটে হেঁটে উপরে ওঠতে গিয়ে মনে হয়েছে আমরা বুঝি মেঘেদের বাড়ি চলে যাচ্ছি। চাংশন পর্বতমালায় ক্যাবল কারে করে মেঘেদের দেখেও এসেছি।

কোমরের শোভা চাবি
দক্ষিণ ইউনানে তাই সম্প্রদায়ের মেয়েরা লম্বা স্কার্ট পরিধান করে। আর তাতে থাকে রুপার বেল্ট বা কোমর বন্ধনী। আর সেই রুপোর বেল্টে মেয়েরা চাবি ঝুলিয়ে রাখে। তবে এই চাবি শুধুমাত্র বিবাহিত মেয়েরাই ঝুলিয়ে রাখতে পারে। কারণ, এই চাবির গোছা সাক্ষ্য দেয় মেয়েটি গৃহকর্ত্রী।

দেশে নয় ট্রেন যায় বিদেশে
অবাক বিষয় হচ্ছে ইউনানের নিজস্ব অঞ্চলের ট্রেন যোগাযোগ না থাকলেও ট্রেন যেতো হ্যানয়ে। ইউনান থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত এই সব রেলপথ স্থাপিত হয়েছিল চিং ডায়নেস্টির সময়কালে। ১৯০৩-১৯১০ এই সময়কালে কুনমিং-হ্যানয় রেল যোগাযোগ চালু হয় ফরাসিদের সহায়তায়। পৃথিবীর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং রেলপথের একটি হচ্ছে এটি। এ রেলপথ তৈরি করতে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

খড়ের টুপি যখন হাঁড়ির ঢাকনা
ইউনানের লোকেরা এক বিশেষ ধরনের খড়ের টুপিকে ঢাকনা হিসেবে ব্যবহার করে। এটি রান্নার সময় হাঁড়িতে ব্যবহার করা হয়। চীনের অন্য কোথাও এ ধরনের ঢাকনা ব্যবহারের প্রচলন নেই। এক বিশেষ ধরনের খড় থেকে এই টুপি তৈরি হয়। যা আগুনের ফুলকিতে ক্ষতি বা নষ্ট হয় না। তবে শুধু ঢাকনা নয় তারা খড় দিয়ে জুতো থেকে শুরু করে হাতপাখা, ঝুড়িসহ নিত্য ব্যবহার্য নানা পণ্য তৈরি করে।

কোথাও রোদ  কোথাও মেঘ
ইউনানের প্রকৃতি কবির লেখা রোমান্টিক কবিতাকেও হার মানায়। তাই তো একে বলে চির বসন্তের দেশ। ইউনানের পথ চলতে গিয়ে রোদের যেমন তাপ আপনাকে উষ্ণতা দেবে ঠিক তেমনি মেঘেরাও ঘিরে ধরবে, পথ আটকে দেবে। এমনও হয় যে পথ চলছেন আপনার ডান হাত যদি রোদের তাপ নেয় অন্যদিকে বাম হাত মেঘে ভিজে শীতল হয়ে যায়।

সব ঋতুতেই বালিকা অঙ্গে ফুলের বাহার
ইউনান চির বসন্ত এবং ফুলের শহর। বিশেষ করে কুনমিংকে বলা হয় ফুলের রাজধানী। বছরজুড়েই শত শত বর্ণের ফুল এসে হাজির হয় কুনমিং-এ। আর তার প্রকাশ দেখা যায় কুনমিং-এর মেয়েদের পোশাকেও। তাদের পরনে থাকে নানান ফুলের তৈরি পোশাক। বাহারি এই পোশাকে ফুলের ব্যবহার সত্যিই মুগ্ধতা ছড়ায় শহরজুড়ে।

পাথরে তৈরি দেয়াল
ইউনান হচ্ছে পর্বতে ঘেরা। আর এই পর্বত থেকেই তাদের জীবন-যাপন পদ্ধতিও যেন পর্বত রঙে সাজানো। বিভিন্ন ধরনের পাথরে সমৃদ্ধ ইউনান। সেজন্য এখানকার অধিবাসীরা তাদের বাড়ি তৈরিতেও ব্যবহার করতো পাথর। পাথরের তৈরি খাঁড়া দেয়াল ছিল ইউনানের বাড়িঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কুনমিং-এর মেয়েরা পাহাড়বেষ্টিত জনবসতির জন্য খাঁড়া পাহাড়গুলোতে আরোহণে অভ্যস্ত। বলা হয়ে থাকে, এখানকার মেয়েরা বানরের চেয়েও দ্রুতগতিতে পাহাড়ে ওঠতে পারে।

তেতো সবজি কিন্তু তেতো নয়
দক্ষিণ ইউনানে প্রচুর সবুজ সবজি উৎপন্ন হয়। আর এই সবুজ সবজিগুলো পাখির পালক এবং কিছুটা সুগন্ধি জাতীয় ভ্যানিলার মতো। যা খেতে তেতো নয় কিন্তু প্রচলিত আছে এই সবুজ সবজির স্বাদ তেতো। এর মধ্যেও একটি দর্শন রয়েছে। তা হচ্ছে, জীবনে চলার পথে যদি কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা না থাকে তবে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য কি তা বোঝা যায় না।

বাঁশ যখন ধূমপানের পাইপ
ইউনান তামাকের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানকার ধূমপানের রীতিও কিছুটা অদ্ভূত। বয়সী লোকেরা বড় বাঁশের তৈরি পাইপ দিয়ে ধূমপান করে থাকে। এটা অনেকটা আমাদের দেশের হুক্কার মতো মনে হলেও দৈর্ঘ্যে এটি আড়াই থেকে তিন ফুট লম্বা। আর এ ধরনের পাইপে নিচ দিকে সিগারেট ধরিয়ে ওপর থেকে টেনে ধোঁয়া বের করা হয়। চীন-জাপান যুদ্ধের সময় তিয়ান সেনারা এই বাঁশের পাইপ ধূমপানের জন্য ব্যবহার করতো। তবে তারা যুদ্ধের সময় একই সঙ্গে এই বাঁশের পাইপ কাঁধে রাখতো বন্দুকের সঙ্গে। এই জন্য তিয়ান সেনাদের বলা হতো-‘দুই বন্দুকের সেনা’।

গাদায় গাদায় চা-পাতা বিক্রি
ইউনানকে বলা হয় চা-এর জন্মভূমি। চায়ের অনেক অরিজিন প্রজাতি এখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে। পুয়ের-এর চা এদের মধ্যে অন্যতম। পুয়ের চা মাটির নিচে কয়েক মাস রেখে দেয়া হয়। তারপর তা নিকষ কালো হলে পরিবেশন করা হয়। আর এই এলাকা পরিচিত টি-হর্স রোড বলে। তাছাড়া বাই নৃ-গোষ্ঠীর থ্রি-কোর্সটি পৃথিবীব্যাপী সমাদৃত। ইউনানে চা বিক্রির পদ্ধতিও ভিন্ন রকমের। ইউনানের তেং কাউন্টির ঝিম্পু সম্প্রদায়ের লোকেরা চা পাতা কখনও মেপে বিক্রয় করে না। তারা স্তূপে স্তূপে চা বিক্রয় করে। এমনকি কুনমিং-এর বড় বড় শপিং   
 মলগুলোতেও চা বিক্রয়ের নানা ব্যতিক্রমী পদ্ধতি লক্ষ্য করা গেছে।

চার ঋতুতে একই পোশাক
আমরা ষড়ঋতুর সঙ্গে পরিচিত হলেও ইউনানের চার ঋতু। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ও বসন্ত। সেখানকার গড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। বছরজুড়ে একই রকম তাপমাত্রার কারণে ইউনানে বাসরত মানুষের পোশাকেও খুব একটা বৈচিত্র্য দেখা যায় না। বিষয়টি সহজ করে বললে বুঝা যাবে। যেমন, বাংলাদেশে শীত আর গ্রীষ্মের পোশাক এক নয়। কিন্তু ইউনানে বছরজুড়েই যেহেতু বসন্ত। কাজেই তাদের পোশাকও একই রকম।

মেয়েদের তামাক বিলাস
ইউনানের লোকেরা তামাকপ্রিয় এটা আর নতুন কোনো কথা নয়। তবে এখানকার মেয়েদের তামাক সেবন নিয়ে রয়েছে নানান মিথ। এখানকার পর্বতময় অঞ্চলের নানান নৃ-গোষ্ঠীর মেয়েরা তামাক সেবনে নানান রীতি অনুসরণ করে। একটি হচ্ছে তারা তামাক পাতা চুইংগামের মতো চিবিয়ে খায়। আর তা ব্যাগে ঝুলিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেমন, লিসু সম্প্রদায়ের মেয়েরা ধূমপান করে এবং তাদের মুখে তামাক থাকে সব সময়। বিবাহিত-অবিবাহিত মেয়েদের কোমরে তামাকের ব্যাগ যেন একটা বাড়তি শোভা তৈরি করে। এছাড়া, তারা বন্ধুত্বের নিদর্শন বা উৎসবে একে অপরকে তামাকের ব্যাগ উপহার দিয়ে থাকে।

ট্রেনের চেয়ে দ্রুত চলে গাড়ি
বলা হয়ে থাকে অনেক সময় ট্রেনের চেয়ে হেঁটে আগে যাওয়া যায় ইউনানে। তার কিছু যৌক্তিকতাও আছে। ইউনানের বেশির ভাগ এলাকা পর্বতে ঘেরা। রাস্তাঘাট আঁকাবাঁকা। আর প্রচুর টানেল রয়েছে। এই পথ ট্রেনে যাতায়াতের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক নয়। দেখা গেছে ট্রেনের চেয়ে বাস বা কার দ্রুত চলে। যদিও সময় বদলেছে। তবে ইউনানের অভ্যন্তরীণ রুটে ট্রেন চলাচল পরিস্থিতির এখনো খুব একটা উন্নতি হয়নি।

পা বলে দেয় বাইরের রূপ
ইউনানের পর্বতময় এলাকায় আগে লোকজন খড়ের তৈরি বিশেষ ধরনের জুতা পরতো। সারা বছর জুড়ে একই ধরনের তাপমাত্রার কারণে লোকজন প্রায় অধিকাংশ সময় এই খড়ের জুতা পরতো। আর এর বিশেষত্ব হচ্ছে সবসময় পায়ের আঙুল অনাবৃত থাকতো।

তিন মশায় উদরপূর্তি
ইউনানে এক ধরনের লম্বা পাযুক্ত মশা আছে। এই মশার আবার কোনো বিষ নেই। এই মশা প্রথম দেখাতেই এতো বড় লাগতো যে, বাইরের লোকেরা মনে করতো তিনটি মশা দিয়ে একবারের খাবার হয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে পোকামাকড় খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ম্যানহাটন হামলায় আটক ব্যক্তি বাংলাদেশি?

২৯ রোহিঙ্গা নারীর মুখে ধর্ষণযজ্ঞের বর্ণনা

বাংলাদেশের দুই নেত্রীর লড়াইয়ের ইতি

বাড়ির পাশে ম্যারাডোনা

আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো কোনো দলই নেই

৩ দিনের সফরে ফ্রান্স গেলেন প্রধানমন্ত্রী

৫০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসম্পন্ন সেবা পায় না

বিএনপি’র পিন্টু না টুকু নতুন প্রার্থীর খোঁজে আওয়ামী লীগ

তন্নতন্ন করে খুঁজেও বিদেশে সম্পদের অস্তিত্ব মেলেনি

ঢাকা-রংপুর ফাইনাল আজ

জনগণের মুখোমুখি রসিক মেয়র প্রার্থীরা

‘যাদেরকে টিফিন খাওয়ালো তারাই হত্যা করলো’

ওয়াসা আর ফ্লাইওভারে লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রামের সব সড়ক

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ এক সপ্তাহ স্থগিত

বাকেরগঞ্জে সাবেক এমপি মাসুদ রেজার ভাই গুলিবিদ্ধ

কংগ্রেসের নতুন প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী