বিসিএসে চার ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন জবির চার শিক্ষার্থী

শিক্ষাঙ্গন

আশরাফুল ইসলাম, জবি থেকে | ২৪ অক্টোবর ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:১৫
: ৩৬তম বিসিএসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) চার শিক্ষার্থী চারটি ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। প্রশাসনে প্রথম ইসমাইল হোসেন, তথ্য ক্যাডারে প্রথম সারাহ ফারজানা হক ও পরিসংখ্যানে প্রথম মোহাম্মদ কামাল হোসেন, একাউন্টিংয়ে প্রথম মুহম্মদ-মনির-উজ জামান মিঠু। এছাড়া বিভিন্ন ক্যাডারে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী ৩৬তম বিসেএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ৩৪ এবং ৩৫ তম বিসিএসেও ক্যাডার প্রাপ্তির সংখ্যার দিক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্যতম ধরা হয়। প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ৫ম ব্যাচ থেকে পাস করা চাঁদপুরের ইসমাইল হোসেন। তার জীবনের প্রথম কোনো চাকরির পরীক্ষা হলো ৩৬তম বিসিএস পরীক্ষা।
যখন তিনি বিসিএসের জন্য আবেদন করেন তখন তার অনার্সের রেজাল্টও হয়নি। অ্যাপেয়ার্ড হিসেবে পরীক্ষা দেন তিনি। বিসিএস পরীক্ষার পর তিনি প্রথম হবেন, তা স্বপ্নেও ভাবেননি। ইসমাইল বলেন, আমাদের ছোট একটি বিশ্ববিদ্যালয়। হল নেই, ভালো গ্রন্থাগার নেই। প্রস্তুতি নেওয়ার বাড়তি কোনো সুযোগও নেই। এর মধ্যে বিসিএসে প্রথম হওয়া অনেক বড় ব্যাপার। ভালো লাগছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক ভাবমূর্তি সবার সামনে তুলে ধরতে পেরেছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভবিষ্যতে যাঁরা বিসিএস দেবেন, তাঁদের জন্য এটি একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। অনুজদের জন্য তিনি বলেন, লক্ষ্য ঠিক রেখে সে অনুযায়ী কাজ করলে সফলতা সময়ের ব্যপার মাত্র।
তথ্য ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সারাহ ফারজানা হক। তিনি আইন বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি অনার্সে ৩ দশমিক ২৭ ও মাস্টার্সে ৩ দশমিক ৩৬ পেয়ে পাস করেছেন। ৩৬তম বিসিএস ছিল সারাহ ফারজানার দ্বিতীয় বিসিএস। এর আগে ৩৫তম বিসিএসে ননক্যাডারে দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা ছিল প্রথম শ্রেণির চাকরি করার। তিনি বলেন, আর সেই আশা নিয়েই পরেরবার বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিই। ফলাফলের দিনে অনেক উৎকণ্ঠায় ছিলাম। আশা ছিল ক্যাডার পাব, কিন্তু কোনো ক্যাডারে প্রথম হতে পারব এটা প্রত্যাশাই ছিল না। এখন মনে হচ্ছে, প্রথম হয়ে শুধু আমার নিজের মুখ উজ্জ্বল হয়নি; আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখও উজ্জ্বল হয়েছে। সারাহ ফারজানা আরও বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে হল নেই। সবাই বিভিন্ন জায়গায় থেকে নিজের উদ্যোগে পড়াশোনা করে। হল থাকলে শেয়ার করে পড়তে সুবিধা হতো। আর তাহলে আমরা আরও ভালো করতে পারতাম। হল না থাকার এই শূন্যতার মধ্যেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডারে প্রথম হওয়া বিশাল ব্যাপার আমাদের জন্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুনেরা এ থেকে দারুণ অনুপ্রেরণা পাবেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যার বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের মোহাম্মদ কামাল হোসেন। পরিসংখ্যান ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন তিনি। তবে এটা তাঁর জীবনের প্রথম বিসিএস। ভালো ফলের কারণ বললেন নিজেই। তিনি বলেন, লেগে ছিলাম ভালো ফল হবে-এই আশায়। পড়াশোনার পথটা সহজ ছিল না। অনার্সে ৩ দশমিক শূন্য ৩ ও মাস্টার্সে ৩ দশমিক ৪৭ পেয়েছেন। তিনি বলেন, মূলত অনার্সের পর থেকে বিসিএসের পড়াশোনা শুরু করেছি। এরপর নিয়মিত পড়েছি। মনে হয়েছে, ভালো করে পড়লে একটা ভালো ফল আসবেই। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত সুযোগ-সুবিধা। তারপরও ভালো ফল করেছি বলে বেশ ভালো লাগছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীদের কিছুটা হলেও সম্মানিত করতে পেরেছি।
মাদারীপুরের মুহম্মদ-মনির-উজ জামান মিঠু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং বিভাগের চতুর্থ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। একাউন্টিং ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন তিনি। তিনি ৩৫ বিসিএসে নন ক্যাডার হয়েছিলেন। ৩৬তম বিসিএসে তিনি কোচিং না করেই গ্রুপ স্টাডি আর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নানা পরামর্শ নিয়ে পড়াশুনা করে প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। অনার্সে ৩ দশমিক ৩৫ ও মাস্টার্সে ৩ দশমিক ২৫ পেয়েছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে নান সীমাবদ্ধতা ও সংকট রয়েছে। তবে ঢাকার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এত বড় অর্জন ঢাকার মধ্যে থাকার কারণেই সম্ভব হয়েছে। ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে জাতীয় শতবর্ষী একটি কলেজ ক্যম্পাসকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ১৫৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একযুগ পার করলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি অনুষদের ৩৬টি বিভাগ ও ২টা ইনস্টিটিউট রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৩ হাজার । এটিকে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যায়ের অবকাঠামোগত সংকট, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের বসার ব্যবস্থা, বিশেষ করে ল্যাবরেটরি এবং গ্রন্থাগারের সীমাবদ্ধতাও প্রকট। প্রকৃত অর্থে সত্যিকারের গবেষণা করার মতো ল্যাবরেটরি নেই। হল, ক্যান্টিন, খেলার মাঠসহ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যা প্রয়োজন তার খুব কমই পান জবির শিক্ষার্থীরা।
তবে অচিরেই এসব সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসে ২৩০ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম চলছে দ্রুত গতিতে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই অধিগ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে জানা গেছে। এরপর সেখানে অধুনিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে। সেখানে সব ধরনের সুযোগ সুবিধা পাবেন শিক্ষার্থীরা। এত সমস্যার মধ্যেও সদ্য প্রকাশিত ৩৬তম বিসিএসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চার ক্যাডারে প্রথমসহ উল্লেখযোগ্য ক্যাডারপ্রাপ্তির ফলে বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আনন্দিত। এভাবে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান তাঁরা।
বিসিএসে এমন সফলতায় উচ্ছ্বসিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। তিনি বলেন, নবীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি বিরাট এক অর্জন। এখন সবচেয়ে মেধাবীরা এখানে ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষক হিসেবেও মেধাবীদেরকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। সকল ক্ষেত্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এখন রানার আপ দাবি করেন তিনি। ভিসি বলেন, দ্রুত গতিতে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।অবকাঠামোগত সংকটের সমাধানের জন্য দ্রুত গতিতে কাজ চলছে। একটি আধুনিক মানের ক্যাম্পাস পেতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। শিক্ষার্থীরা আরো ভালো করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন