চির বসন্তের দেশে, ১৭

ক্যাশলেস ইকোনমি যুগে চীন

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ২২ অক্টোবর ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৪১
বেড়াতে বেরিয়েছেন শহরে। কিছু খেতে মন চাইছে। অথবা কোথাও যেতে বাসে চড়বেন। শহরের সবচেয়ে পুরনো বুদ্ধ মোনাস্ট্রি দেখবেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দর্শনীর বিনিময়ে গান শুনবেন। সমস্যা হলো আপনার পকেটে নগদ টাকা নেই।
তাই বলে কি খায়েস পূরণ হবে না?। নগদ অর্থ নিয়ে মাথা ঘামাবার কিছু নেই। আপনার স্মার্টফোনে বারকোডই যথেষ্ট। উইচাট পে অথবা আলী পে অ্যাপস ইনস্টল থাকলেই হলো। বাসে ওঠে বারকোড স্ক্যান করে দিন। ভাড়া পরিশোধ। ফুটপাথে নুডুলস খাবেন টেবিলেই রাখা আছে আলী পে সার্ভিস বক্স। বুদ্ধ মোনাস্ট্রিতে গিয়ে কিছু দক্ষিণা দিতে চান তা-ও সম্ভব ইলেক্ট্রনিক্স অ্যাপসের মাধ্যমে। রাস্তায় স্ট্রিট মিউজিশিয়ানকেও পে করবেন? সমস্যা নেই। সবখানেই রয়েছে বারকোড স্ক্যানের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা। এ চিত্র চীনের পূর্বদিকের শহর হানঝুতে। যে শহরে দুনিয়াজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়া অনলাইন শপিং-এর সম্রাট আলীবাবার বেড়ে ওঠা। চীনে সাধারণ নুডুলস বিক্রেতা থেকে বড় শপিংমল- সবখানে মোবাইল ফোনে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা আছে। একেবারে ক্যাশলেস বিপ্লব ঘটে গেছে চীনে। যারা ক্রেডিট কার্ডকে মনে করতো অমঙ্গল আর ঋণের বোঝা। যারা কঠিন রকমের বিরুদ্ধাচারণ করতো সব রকম ক্রেডিট কার্ডের। সেই চীনের নাগরিকরাই করেছে ইউটার্ন। তারা কেউই এখন নগদ অর্থ বহন করতে চান না। এ চিত্র শুধু হানঝুতেই নয়। ইউনানের কুনমিং ও ত্বালি শহরে তাই দেখেছি। আর পেইচিং বা সাংহাই শহরের চিত্র সম্পূর্ণ ডিজিটাল। বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মিশকাত শরীফ একটি বার্গারশপে খেতে ঢুকেছে কুনমিং শহরে। দাম বিশ আরএমবি। নগদ টাকা পকেটে নেই। সঙ্গে আরেক বন্ধু। দুটি বার্গার চল্লিশ আরএমবি। দোকানি কাউন্টারে থাকা উইচাট বারকোড স্ক্যানের যন্ত্রটি দেখিয়ে দিলো। বারকোড স্ক্যান করে খুব সহজেই মূল্য পরিশোধ করা হয়ে গেল বার্গারের। যখন লেখাটি লিখছি তখন চীনে শি জিনপিং-এর কংগ্রেসে দেয়া ভাষণ খুবই আলোচনায়। প্রতি পাঁচ বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয় কেন্দ্রীয় কংগ্রেস। সারা দেশের ডেলিগেটস অংশ নেন। বাছাই হয় নতুন নেতৃত্ব। প্রায় তিন ঘণ্টার বেশি সময় দেয়া ভাষণে তিনি চীনের অগ্রগতি তুলে ধরেছেন। তার এই ভাষণে বড় অংশ জুড়ে ছিল চীনের অর্থনীতির ক্ষেত্রে ডিজিটাল বিপ্লবের কথা।
অর্থনীতির তথ্য-উপাত্তও সাক্ষী দিচ্ছে চীন এগিয়ে যাচ্ছে ক্যাশলেস ইকোনমির দিকে। মোবাইল পেমেন্ট ও শেয়ারিং অর্থনীতি খাতে বিপ্লব ঘটে গেছে গত ৫ বছরে। প্রতি বছর গড়ে ৪ ট্রিলিয়ন আরএমবি করে পেমেন্ট হয়েছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে। এই ৫ বছরেই বাইসাইকেল শেয়ারিং ধারণা বাস্তবায়িত হয়েছে। এক কোটি সাইকেল বর্তমানে চীনের বিভিন্ন শহরে। ১০ কোটিরও বেশি লোক চলছে এই সাইকেলগুলোতে। চীনে অনলাইন বাণিজ্যে ২০১২ সালে ৮.১ ট্রিলিয়ন আরএমবি লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে অনলাইনে খুচরা বিক্রয়ের পরিমাণ আগের চেয়ে ১.৩ ট্রিলিয়ন আরএমবি থেকে বেড়ে গতবছর হয়েছে ৫.২ ট্রিলিয়ন ইউয়ান। অনলাইনে চীনে খুচরা পণ্য বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিক্রয় হয়। কুনমিং-এ থাওপাও নামে একটি অ্যাপস রয়েছে। যার মাধ্যমে ১ আরএমবির মরিচ থেকে শুরু করে ১ কোটি আরএমবি পর্যন্ত পণ্যের অর্ডার দেয়া যায়। যেখানেই থাকুন চারদিনের মধ্যে আপনার পণ্য পৌঁছে যাবে দোরগোড়ায়। এটা হচ্ছে আলী বাবা ডটকমের খুচরা পণ্য বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান। আর আলীবাবা ডটকমে পাওয়া যায় সব পাইকারি পণ্য।
বদলে যাওয়া এই নতুন চীনের নাগরিকরাই বলেছেন কেন তারা একসময় ক্রেডিট কার্ডের বিরুদ্ধে ছিলেন আর কেন তারাই এখন উইচাট পে বা আলী পে ঝড়ে কুপোকাত। চীনারা পুনঃপুন ঋণগ্রস্ত হবে এই ভাবনা থেকেই ক্রেডিট কার্ডের বিরুদ্ধে ছিল। ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ডেবিট কার্ড যখন মোবাইল ফোনের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হলো তখন থেকেই মানুষের মনোভাবে পরিবর্তন ঘটে। ধীরে ধীরে তাদের ব্যাংক একাউন্টে সঞ্চিত অর্থ ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় করতে শুরু করে তারা। তৃণমূল জনগোষ্ঠী সহজে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারছে- এটাই বড় মনে করতে শুরু করে। এক্ষেত্রে তারা ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে না। বর্তমানে প্রতিটি দোকান, রেস্তরাঁ, বার- এমনকি ছোট প্যানকেকের দোকানেও রয়েছে মোবাইলে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা। সুতরাং ভোক্তাদের এই ব্যবস্থায় কোনো নগদ অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। সত্তর শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মনে করে নগদ অর্থ বহনের দরকার নেই। চীনে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৭১০ মিলিয়ন বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর এরাই মূলত উইচাটে বা আলী পে’র মাধ্যমে সবকিছুর মূল্য পরিশোধ করে। এর অর্থ বেশির ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই ক্যাশলেস পদ্ধতির পক্ষে। অন্য এক জরিপে দেখা গেছে, চীনের বেশির ভাগ নাগরিক মনে করে নগদ অর্থ বহনের কোনো দরকার নেই। যেখানে অনলাইনে মূল্য পরিশোধ একই সঙ্গে নিরাপদ ও ঝামেলামুক্ত। সারা বিশ্বে উইচাটের ৯৩৮ মিলিয়ন সক্রিয় ব্যবহারকারী রয়েছে। এর নানামুখী ডিজিটাল ব্যবহারে সম্পৃক্ত এই গ্রাহকরা। শুধু চীনেই রয়েছে ৪৯৪ মিলিয়ন ব্যবহারকারী। চীনের মুঠোফোন ব্যবহারকারী লোকদের ৭৯.১ ভাগ মানুষ ম্যাসেজ অপশন ব্যবহারে অভ্যস্ত। এটার কার্যকারিতা ও বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ থাকায় বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হচ্ছে উইচাট। এখনো উইচাট বিশ্বব্যাপী ততটা জনপ্রিয় না হলেও তারা উইচাট পে-অ্যাপস এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে। উইচাট পে-এর মাধ্যমে নগদ অর্থ ছাড়াই কাজ করছে ব্যবসায়ীরা আর উইচাট ব্যবসায়ী ও ব্যাংকের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক তৈরির কাজটিই করছে। যার মাধ্যমে নগদ অর্থ না দিয়েও উইচাট পে-এর মাধ্যমে সকল প্রকার ক্রয়-বিক্রয়সহ বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালাতে পারবে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে কোনো গ্রাহক উইচাট পে অ্যাপস ইনস্টল করলে এর মাধ্যমে বারকোড (ছজ ঈড়ফব) স্ক্যান করলেই লেনদেনের সুবিধার্থে সরাসরি ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ সালে চীনারা ৫.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে মোবাইল পেমেন্টের মাধ্যমে। যা আমেরিকার তুলনায় ৫০ গুণ বেশি। এটা খুবই অবাক করার বিষয় যে, চীন সর্বপ্রথম কাগজের মুদ্রা আবিষ্কার করে আর সেই চীনই এখন নগদ অর্থ ব্যবহারে বিমুখ হচ্ছে। এর বিস্ফোরণ ঘটেছে পূর্ব চায়নাতে।
আলী পে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, চীনের প্রায় ২ মিলিয়ন রেস্তরাঁ, শপিংমলে আলী পে রয়েছে। খেলাধুলা দেখতে ২০,০০০ স্টেডিয়ামে টিকিট এবং ৩০টি প্রদেশে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে টিকিট অগ্রিম ক্রয় করা যায় আলী পে-এর মাধ্যমে। আলী পে চীনে ৩,০০০ হাসপাতালে রোগীদের অর্থ পরিশোধেও ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এখন মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ক্যাশলেস পদ্ধতির সুবিধা গ্রহণকারীর সংখ্যাও।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন