চির বসন্তের দেশে, ১৩

চা নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ১৮ অক্টোবর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:২৬
চীন আর চা যেন সমার্থক। ছোটবেলায় শুনেছি বৃটিশরা ভারতীয়দের বিশেষত এ অঞ্চলের মানুষদের বিনামূল্যে চা খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করে। তারপর এখানকার লোকজন চা কিনে খাওয়া শুরু করে। যদিও চায়ে তিতকুটে স্বাদ বদলে লাগানো হয়েছে নানা রঙ। এর সঙ্গে দুধ মিশিয়ে বদলে দেয়া হয়েছে স্বাদ। যা আসলে এখানকার সংস্করণ।
আমরা যেখানে দুধ আর চিনি ছাড়া চায়ের কথা অনেকেই ভাবতে পারি না কিন্তু চায়ের জন্মস্থানে গিয়ে দেখেছি অন্যরূপ। গুগল প্রাপ্ত তথ্যে জেনেছি বার্মা আর চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থাৎ ইউনান এলাকাতেই চায়ের জন্ম। এর ঐতিহাসিক কিছু সত্যতাও আছে। কারণ, টি হর্স ট্রেড রোড বা সিল্ক রোড বলে পরিচিত প্রাচীন বাণিজ্য পথ এ এলাকাতেই। ত্বালি শহরের মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে তিব্বত, বার্মা, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া এবং ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে এই রোড। আর এই চা’কে জনপ্রিয় করতে সহায়তা করেছে ইংরেজ ও পর্তুগিজ বেনিয়ারা। সর্বপ্রথম পর্তুগিজ এক ব্যবসায়ী চীনের চা-কে পরিচিত করেন। তারপর এ অঞ্চলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চা নিয়ে বাণিজ্য করে। স্থানীয়রাও তাদের তৈরি চায়ের স্বাদ নিতে শুরু করে ধীরে ধীরে।
বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প ২০১৭-তে অংশ নিয়ে ফাঁকে ফাঁকেই চায়ের স্বাদের রকমফের পরক করেছি। তা সামার ক্যাম্পের শুরু আর শেষে করেছি এমনটি নয়। বিভিন্ন মার্কেট আর শপিং কমপ্লেক্সের বড় বড় দোকানেও চায়ের স্বাদ নিয়েছি। চা যেন চীনা সংস্কৃতির অপরিহার্য অঙ্গ। যাপিত জীবনের সর্বত্র তাদের বন্ধুত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউটে কর্মরত সকল লাওসিকে (শিক্ষক) দেখি একটি বড় ফ্ল্যাক্স সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। তাদের অফিস ডেস্কেও দেখি একই দৃশ্য। গ্লাস আকৃতির লম্বা ফ্ল্যাক্স-এ গরম পানি আর তার মধ্যে ছেড়ে দেয়া আছে সবুজ পাতা। চীনা ভাষায় এরা গ্রিন টিকে বলে লুই চা। এই লুই চা চীনের কুনমিং, ত্বালি সবখানেই চোখে পড়েছে। টানা চৌদ্দ দিন আমাদের যে গাড়িচালক বয়ে নিয়ে যেত সেই লিওকেও দেখতাম সঙ্গে করে এক ফ্ল্যাক্স গরম পানি তাতে গ্রিন টি নিয়ে আসতো। গাড়ি চালাবার ফাঁকে ফাঁকে দিনভর এটাতেই চুমুক দিতো। তাছাড়া, সামার ক্যাম্পের উদ্বোধনী এ সমাপনী, লাইব্রেরিতে ছবি প্রদর্শনীর সময় সবখানেই লুই চা পরিবেশন করেছে স্বেচ্ছাসেবীরা। তবে দুধ চা একেবারেই পরিত্যাজ্য। চিনির বংশও নেই। চা বলতে লুই চা। হাল্কা তেতো স্বাদ যা জীবনী শক্তি দেয়। ক্লান্তি দূর করে। হাল্কা ঠা-ায় দেয় উষ্ণতা। এমনকি হোটেল লবিগুলোতেও তাই দেখেছি। ম্যাপল প্যালেস হোটেলের লবিতে একটি টেবিলে লুই চা থাকতো সবসময়। কাচের কেটলি মোমের আলোয় বসানো থাকতো। পাশেই ট্রেতে ছোট ছোট কাপ। আমরা দলবলসহ বাইরে থেকে এসেই একটু উষ্ণতার খোঁজে ছুটতাম লুই চায়ের ট্রেতে। ছোট কাপে তেষ্টা আরো বেড়ে যেতো। তাতে কি! যত কাপ চাই তাতে বাধা নেই। হোটেল রুমেও দেয়া ছিল লুই চা। প্রতিদিন নতুন নতুন প্যাকেট দেয়া থাকতো। যত খুশি খাও। কিন্তু বাঙালির অভ্যাস বলে কথা। সুপার শপ থেকে আমার পাশের রুমমেট হাসান চিনি নিয়ে এসেছে দুধ চায়ের জন্য। রাতে দুধ-চিনি সহকারে চায়ের আড্ডা জমে উঠতো দেশীয় ফ্লেভারে। যা হোক ত্বালিতে গিয়ে চায়ের অন্য এক অভিজ্ঞতা হয়েছে। যেটাকে থ্রি কোর্স টি বলে। এটা বাই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য। তাদের সকল উৎসব আনন্দে থাকে থ্রি কোর্স টি। ত্বালি ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন ওয়েস্ট লেকে নৌকাবাইচ শেষে ঐতিহ্যবাহী বাই নৃত্য উপভোগ শেষে আমাদের দেয়া হয়েছিল থ্রি কোর্স টি।
চা নিয়ে জটিল অবস্থা চীনের রেস্টুরেন্টগুলোতে। বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টে খাবার সময় পানি দিতে দেখিনি। আবহাওয়া ঠা-া বলে কিনা জানি না। তারা খাবার সঙ্গে কখনও পানি খায় না। তবে তাদের জীবনাচরণ যেমন তাতে পানি খাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। পানি বলতে খালি পানির কথা বলছি। যদিও সকাল থেকে রাত অবধি চায়ের পাতা ভেজানো পানিই তারা খেয়ে থাকে। আর গ্রিন টি’র মজা হচ্ছে এই পাতা যত ভিজবে ততই এর স্বাদ বাড়বে। চীনে খাবারের শুরুতেই লুই চা দেয়া হয়। মূল খাবারের মধ্যে অথবা যে কেউ যখন খুশি চাইলেই তা পেতে পারে। এর জন্য কোনো বাড়তি পয়সা খরচ করতে হয় না। বছরের পর বছর চীনারা এভাবেই চলছে। আমাদের চৌদ্দ দিনের অভিজ্ঞতায় তাই দেখেছি। পথঘাটে, অফিস ফেরত বা অফিসে, বিভিন্ন শপিংমলে কর্মরতদের, ক্লাসে লাওসিদের, শিক্ষার্থীদেরও তাদের ব্যাগে এই ফ্ল্যাক্স নিয়ে ঘুরতে দেখেছি। শুধু যে গ্রিন টি তা নয় নানান ফুলের সৌরভ আচ্ছাদিত সুগন্ধিযুক্ত চা রয়েছে চীনের বাজারে। একেক রকম চায়ের একেক গন্ধ আর স্বাদ।
থ্রি কোর্স টি
বাই পিপলদের ঐতিহ্যগুলোর অন্যতম থ্রি কোর্স টি। চীনা ভাষায় একে বলে সানতাও। এই চায়ের রয়েছে একটি দার্শনিক ভিত্তি। এটি তাই ত্বালিতে জনপ্রিয়। শুরুর দিকে বাড়ির বড়দের এই চা পরিবেশন করা হতো। আর আগত তরুণদের জীবন দর্শন সম্পর্কে শিক্ষা দেয়ার জন্য চালু হয়েছিল এই থ্রি কোর্স টি। তিন দফায় তিন রকম স্বাদের চা পরিবেশন করা হয় বলে একে থ্রি কোর্স টি বলে। ইবঃঃবৎ ঃবধ, ংবিবঃ ঃবধ, ধভঃবৎঃধংঃব ঃবধ। প্রথমদিকে এক ধরনের তিতকুটে বা গ্রিন টি পরিবেশন করা হয়। এ পদ্ধতিতে চায়ের পাতা অনেকক্ষণ গরম পানিতে সিদ্ধ

করা হয়। এর গন্ধ ছড়ালে একে কাপে করে পরিবেশন করা হয়। এর মধ্যে এটাই বুঝানো হয় জীবনের শুরুটা সব সময় তিক্ততাপূর্ণ থাকে। নানা বিরক্তিকর ও দুঃখজনক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। জীবনের এই সব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
দ্বিতীয় দফায় পরিবেশিত চা-কে বলে মিষ্টি চা। এই চায়ে ত্বালিতে তৈরি ছাগলের দুধে তৈরি পনির, আখরোট এবং বাদামি রঙের চিনি অর্থাৎ ব্রাউন সুগার সহযোগে পরিবেশন করা হয়। এর সঙ্গে চা দিয়ে তৈরি স্যুপও অনেক সময় ব্যবহার করা হয় এবং মিষ্টি চা বড় কাপে পরিবেশন করা হয়। এর অর্থ হচ্ছে তিক্ততার পড়েই জীবনে মিষ্টি আসে। তৃতীয় এবং শেষ ধাপ হচ্ছে খাবার পরের ধাপ। অর্থাৎ সবশেষে যে চা পরিবেশিত হয় এতে মরিচের গুঁড়ো, আদা, মিষ্টি সহকারে পরিবেশন করা হয়। একে তিক্ততা এবং মিষ্টতা এই দুটির মিশ্রণ বলা যায়। মানুষের জীবন আসলে সবকিছুর সমন্বয়ে এগিয়ে চলে। সকল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পা ফেলতে হয়; তবেই জীবনকে উপভোগ করা যায়।
টি হর্স ট্রেড রোড
টি হর্স ট্রেড রোড। সাউথ সিল্ক রোড। এই দুটি নামই ঐতিহাসিকভাবে শোনা যায়। কারণ এক সময় চীনের এ অঞ্চলের সঙ্গে তিব্বত, ভিয়েতনাম, বার্মা, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সিল্ক এবং চায়ের বাণিজ্য হতো। আর ঘোড়ায় করে চায়ের বাক্স তখন দল বেঁধে এগুতো বিভিন্ন দেশের পথে। চায়ের অন্যতম বাণিজ্য কেন্দ্রও ছিল ইউনানের ত্বালি। এ কারণে এই রাস্তাটিকে টি হর্স ট্রেড রোড বলা হতো। তাং ডায়নেস্টি এবং পরবর্তীতে সাং ডায়নেস্টির সময় চা কেনাবেচা প্রসার লাভ করে। কারণ ইউনানের চায়ের রয়েছে নিজস্ব ধরন। আর এই চায়ের সঙ্গে এই জনপদে প্রসার লাভ করে ত্বালির সংস্কৃতিরও। আর ইউনানের চা নিজস্ব ধাঁচে তৈরি হয় বলে হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবীজুড়ে তা সমাদৃত। যেমন, ইউনানের পূ’য়ের এলাকার উৎপন্ন চা পূ-এর চা নামেই খ্যাত। এটা কালো ধরনের গ্রিন টি।

কাল পড়–ন: দুই লেকের দুই ধারা

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

তাবিথ আউয়ালই ডিএনসিসির উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী

ফের টেস্ট অধিনায়ক সাকিব

দুই বছর ওএসডি ছিলেন মারুফ জামান

সারা দেশ গুম-খুনে জর্জরিত

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্কের যাত্রা শুরু

চালের দাম ফের বাড়ছে

কুড়িগ্রামে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

আওয়ামী লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি নির্ভার বিএনপি

সিলেটে শামীমের বিরুদ্ধে রুমার মামলা, তোলপাড়

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপা প্রার্থীর ভাবনা

এবি ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ ৪ জনকে দুদকে তলব

আড়াইহাজারের এমপির সঙ্গে মাওলানা হাবিবুরের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ভাইরাল

রাবি চারুকলা অনুষদের সেই ডিনের পদত্যাগ

সাভারে জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৯

সাকিব ফের বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক

এমপি মুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসিকে দুদকের চিঠি