চির বসন্তের দেশে, ৯

ক্যালিগ্রাফি, নট, চপস্টিক

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ১৪ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫২
১২ই সেপ্টেম্বর ঘড়িতে তখন সোয়া ৬টা। কুনমিং চেংশুই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রাদেশিক বিমানবন্দর হলেও চীনের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোর একটি। ৭৮টি গেট রয়েছে এর। ঈগল পাখির আকৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিমানবন্দরটি। খুবই ছিমছাম পরিচ্ছন্ন। সবার উৎসুক দৃষ্টি নতুন কী আছে এখানে? একটি হচ্ছে তাপমাত্রা। কুনমিং-এ ২০ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা সব সময়। আমাদের সকলের হাতে থাকা ওভারকোট জড়িয়ে নিলাম। এই প্রথম চীন আসা। মানুষ, পরিবেশ সবকিছুই নতুন। প্রথমদিনের অভিজ্ঞতায় রাতে চেংশুই বিমানবন্দর থেকে ইউনিভার্সিটি টাউনের ম্যাপল প্যালেসে পৌঁছা পর্যন্ত দু’টি বিষয় ঔৎসুক্যের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিকতায় যুক্ত বলে যেকোনো নতুন বিষয় প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমি চেষ্টা করি বাসে জানালার পাশে সম্ভব হলে সামনের দিকে বসতে। প্রথম যাত্রায় সৌভাগ্যক্রমে বাসে ওঠে শুরুর আসন পেয়েছি। কারণ একটাই যেন পুরো লুকিংগ্লাস আর জানালা দিয়ে কুনমিং-এর প্রথম সন্ধ্যা অবলোকন করতে পারি। ঘণ্টা দেড়েকের এই পুরো পথটাই অবাক করলো আমাকে। মাঝখানের ল্যাম্পপোস্টে দেখতে পেলাম একটি প্রতীকী বিষয় জ্বলজ্বল করছে। লাল রঙের প্রতীক। পরে জেনেছিলাম দ্বিতীয়দিনের ওরিয়েন্টশন ক্লাসে এটিকে বলা হয় চাইনিজ ভাষায় নট। এটা শুভ প্রতীক অর্থে চীনারা সবখানেই ঝুলিয়ে রাখে। উপহার দেয়। এর অর্থও বলা হয়েছে আমাদের। প্রতীকী এই নটের সিম্বল গাড়ির হেডলাইটে পুরো চৌদ্দ দিনই আলোকিত হয়ে থাকতো রাতের বেলায়। চোখ বন্ধ করলেও যেন তা ভাসতো। আর যত রকম স্যুভেনিয়রশপে গিয়েছি চাইনিজ নটের কতো প্রকার যে দেখেছি তা বলে শেষ করা যাবে না। একেবারে শেষদিন ২৪শে সেপ্টেম্বরের শেষ ক্লাসে আমাদের হাতে কলমে শেখানো হলো কিভাবে বাধতে হয় চাইনিজ নট। তার কিছু নমুনা ঢাকা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছি। প্রথমদিন রাতে ম্যাপল প্যালেসের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে হোটেল কক্ষ-বরাদ্দ নিয়ে যখন এগিয়েছি লিফটের দিকে তখন খেয়াল হলো ডানদিকের একটি টেবিলে রাখা আছে ক্যালিগ্রাফি সামগ্রী। যে কেউ চাইলে দাঁড়িয়ে ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে লিখে সময় কাটাতে পারে। এটা একধরনের শিল্পচর্চা। চীনের সংস্কৃতি যা হাজার হাজার বছর ধরে তারা বয়ে চলেছে এক নিমিষেই তা জানা গেল। আমাদের অ আ ক খ বর্ণমালার মতোই ক্যালিগ্রাফির কিছু প্রতীক ছক কাটা আছে। তুলি পানিতে ভিজিয়ে সেখানে লাইন অনুসরণ করলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে একেক রকম ক্যালিগ্রাফি। ১৮ই সেপ্টেম্বর ইউনান ইউনিভার্সিটিতে ওয়েন ম্যাং যখন আমাদের ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস ও পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয় তখন জানতে পারি এর পথচলা। বর্তমান চাইনিজ ভাষায় হানজিও ক্যালিগ্রাফির ধারাবাহিকতা। আর তৃতীয় যে বিষয়টির মুখোমুখি হই তা পরদিন সকালে। ম্যাপল প্যালেস হোটেলের নাস্তার টেবিলে গিয়ে দেখি চারপাশে যারা চাইনিজ তারা চপস্টিকে খাচ্ছে। আর বুফে পদ্ধতিতে একটি কর্নারে রাখা আছে কাঠে তৈরি চপস্টিক। আমি কখনো চপস্টিকে খাইনি। মুহূর্তে মনে পড়লো খ্যাতনামা লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা। তিনি সুলিখিত দেশে-বিদেশে বইয়ের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি আফগানে যাবো তবে কেন কাবুলিওয়ালা হবো না।’ ঠিক আমার মাথায় এটিই খেয়াল হলো। আমিও শুরু করলাম চপস্টিকে খাওয়া। প্রথম প্রথম হচ্ছিল না। কিন্তু ওই যে একবার না পারলে দেখ শতবার। প্রথম দু’দিন চর্চার পর থেকে আমিও চপস্টিকে অভ্যস্ত হলাম। ক্যালিগ্রাফি, নট আর চপস্টিক এই তিনটি বিষয় যে চাইনিজ সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। যেখানেই গিয়েছি এই তিনটি বিষয়ের উপস্থিতি অনিবার্য দেখেছি।
বিমূর্ত শিল্প ক্যালিগ্রাফি
কবে কিভাবে শুরু এটা হলফ করে বলা যায় না। তবে হাজার হাজার বছর ধরে চীনের মানুষের জীবনযাত্রার শিল্পিত প্রকাশ ক্যালিগ্রাফি। এটাকে অনংঃৎধপঃ বা বিমূর্ত আর্ট বলা হয়। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্যালিগ্রাফি তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে থাকে। চীনা শিল্পের একটি প্রধান রূপ ক্যালিগ্রাফি। চীনা ভাষায় লিখতে ও পড়তে হলে ক্যালিগ্রাফি জানতে হবে। এ পদ্ধতি অনুসারে চীনের সকলেই আসলে শিল্পী। যেকোনো বিষয়কে প্রকাশ মাধ্যম হিসেবে চাইনিজরা তৈরি করেছে ক্যালিগ্রাফি। ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে তত্ত্বের প্রকাশ ঘটে লাইন, রিদম আর লাইন আঁকার মধ্য দিয়ে। ইউনান ইউনিভার্সিটিতে ওয়েন ম্যাং লাওশি আমাদের জানালেন এর চর্চা পদ্ধতি এবং ইতিহাস। ব্রাশ দিয়ে ক্যালিগ্রাফি লেখা হয়। এর জন্য চারটি বিষয় প্রয়োজন পড়ে। চাইনিজ ভাষায় এগুলো হলোÑমাউপি (ইৎঁংয), মো (ণধহ), ইয়েন থাই (ণধহ ংঃড়হব), শুয়েন ছি (চধঢ়বৎ)। আর চীনে পাঁচ ধরনের ক্যালিগ্রাফির প্রচলন রয়েছে। যথাক্রমে চুয়ান শু (ঝবধষ ংপৎরঢ়ঃ), লি শু (পষধৎরপধষ ঝপৎরঢ়ঃ), খাই শু (জবমঁষধৎ ঝপৎরঢ়ঃ), ছিং শু (জঁহহরহম ঝপৎরঢ়ঃ), ছাও শু (ঈঁৎংরাব ঝপৎরঢ়ঃ)। ইতিহাসের পতা উল্টালে জানা যায়, আড়াইশো বছর আগে চীনের লোকেরা চুয়ান শু ব্যবহার করতো। যা বর্তমানে খুব বেশি প্রচলন নেই। লি শু অফিসিয়াল ভাষা। যা হলো তাং ডায়নেস্টির সময় থেকে প্রচলন। থাই শু হচ্ছে চীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারা। যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটা থাং ডায়নেস্টির সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। পরবর্তীতে থাং-এর পর সুং ডায়নেস্টিও থাই শুকে ব্যবহার করে। ছিং শু ও জনপ্রিয় ধারার ক্যালিগ্রাফি। ১৮০০ বছর আগে এ ধারার ক্যালিগ্রাফির সূচনা। শেষ পদ্ধতি ছাও শু হচ্ছে শুধু ছবি। ছবির মাধ্যমে এর অর্থ প্রকাশ হয়।
প্রতীকী অর্থের প্রকাশ নট
চীনে হাজার হাজার বছর আগ থেকেই নট ব্যবহারের প্রচলন চলে এসেছে। এই নট পাঁচটি অর্থ প্রকাশ করে। হ্যাপিনেস (ঐধঢ়ঢ়রহবংং), আসপিসাসনেস (অঁংঢ়রপরড়ঁংহবংং), লাক (খঁপশ), সলিডারিটি (ঝড়ষরফধৎরঃু), সেফটি (ঝধভবঃু)। বাংলায় সুখ, ভাগ্য, শুভযোগ, দেশপ্রেম, নিরাপত্তা এর প্রকাশ হচ্ছে নট। চীনের সর্বত্র এই নট ব্যবহার করতে দেখা যায়। এটা নানাভাবে তৈরি করা হয়। বাসা, অফিস, গাড়ি, ব্যাগে এমনকি বর্তমানে নানা ছাপার কাজেও শুভ প্রতীক অর্থে নট ব্যবহার করা হয়। তবে চীনে ব্যাপক অর্থে এর ব্যবহার শুরু হয় তাং ডায়নেস্টিতে। এর সময়কাল ৬১৮-৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ। থাং ডায়নেস্টির পর সং ডায়নেস্টিও একই ধারাবাহিকতায় নট ব্যবহার করে। সাধারণ দুই স্তরে প্রতীকী এই নট তৈরি হয়ে থাকে। চীনে যেকোনো উৎসব-আনন্দে নট ভিন্নতা নিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন ম্যারেজ নট রয়েছে। যা শুধু বিয়েতে ব্যবহৃত হয়।
খাবারে অনিবার্য চপস্টিক
চীনে নেমেই যেদিকে তাকিয়েছি চপস্টিক আছেই। আমি আর বাদ থাকি কেন? দু’সপ্তাহের এই সময়টায় তিনবেলা খাবারের সময় এমনকি এর বাইরেও কোনো কিছু খেতে হলে চপস্টিক। আমরা যেখানে হাতে খাই সেখানে চীনারা কেন চপস্টিক? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। প্রথমত, চীনারা সব সময় গরম খাবার খেতে পছন্দ করে। দ্বিতীয়ত, তারা নুডুলস ধরনের খাবারে বেশি অভ্যস্ত। আর নুডুলস যে বাটিতে পরিবেশন করা হয় তা থেকে আঙ্গুল ডুবিয়ে বা চামচে খাবার খুঁজে নেয়া সত্যিই দুরূহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত নয়। তৃতীয়ত, হাতে যে ময়লা বা অপরিচ্ছন্ন অবস্থা থাকে তা খাবারের সঙ্গে পেটে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই চপস্টিক ব্যবহারে। প্রায় ছয় হাজার বছর আগ থেকে চীনে চপস্টিকের প্রচলন। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, ক্যাম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামে। আর বেশিরভাগ দেশের নাগরিকরা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছে সেখানেই চপস্টিক পৌঁছে গেছে। চপস্টিক বাঁশ, কাঠ, প্লাস্টিক, স্টিল ও ব্রোঞ্জে তৈরি হয়। এর ব্যবহারেও দরিদ্র এবং ধনী শ্রেণিী মধ্যে তফাৎ রয়েছে। রাজ-রাজারা ব্যবহার করতেন স্বর্ণ বা রৌপ্য নির্মিত চপস্টিক। সাধারণের ব্যবহৃত চপস্টিক সাদামাটা। তিন আঙ্গুলের এই চপস্টিকে দ্রুত খাওয়া যায়। মুখেও গরম লাগে না। হাতের ময়লা খাবারে যায় না। খোঁজ নিয়ে জেনেছি চীন আর জাপানে চপস্টিক ব্যবহারে রয়েছে পার্থক্য। জাপানে পুরুষদের জন্য আট ইঞ্চি লম্বা চপস্টিক আর মেয়েদের জন্য ৭ ইঞ্চি লম্বা চপস্টিক ব্যবহারের চলন রয়েছে। আর সন্তান এক বছর হতেই হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় এই চপস্টিক। নিখুঁতভাবে চপস্টিকে খাওয়ার অভ্যাস সেই থেকেই শুরু।

কাল পড়–ন: বিলুপ্ত প্রায় ২৬ জাতিগোষ্ঠীর খোঁজে


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ম্যানহাটন হামলায় আটক ব্যক্তি বাংলাদেশি?

২৯ রোহিঙ্গা নারীর মুখে ধর্ষণযজ্ঞের বর্ণনা

বাংলাদেশের দুই নেত্রীর লড়াইয়ের ইতি

বাড়ির পাশে ম্যারাডোনা

আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো কোনো দলই নেই

৩ দিনের সফরে ফ্রান্স গেলেন প্রধানমন্ত্রী

৫০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসম্পন্ন সেবা পায় না

বিএনপি’র পিন্টু না টুকু নতুন প্রার্থীর খোঁজে আওয়ামী লীগ

তন্নতন্ন করে খুঁজেও বিদেশে সম্পদের অস্তিত্ব মেলেনি

ঢাকা-রংপুর ফাইনাল আজ

জনগণের মুখোমুখি রসিক মেয়র প্রার্থীরা

‘যাদেরকে টিফিন খাওয়ালো তারাই হত্যা করলো’

ওয়াসা আর ফ্লাইওভারে লণ্ডভণ্ড চট্টগ্রামের সব সড়ক

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ এক সপ্তাহ স্থগিত

বাকেরগঞ্জে সাবেক এমপি মাসুদ রেজার ভাই গুলিবিদ্ধ

কংগ্রেসের নতুন প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী