চির বসন্তের দেশে, ৮

খাবার টেবিলে অক্টোপাস পোকামাকড় ভাজি থাকতো মাছ-সবজিও

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ১৩ অক্টোবর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:৪৯
চীনে যাচ্ছি। সবকিছুই ঠিক। কনফুশিয়াস ইনস্টিটিউট লিখিয়ে নিয়েছে আমার পছন্দ। কি খেতে চাই? কি খাবো না? দ্বিতীয় দফায় তারা চূড়ান্তও করেছে। চাইনিজ ভাষায় ফোনে তাই লাওশি ভাঙা ভাঙা গলায় জানতে চাইলেন কাজু (চাইনিজ ভাষায় কাজলকে বলা হয় কাজু) নো বিফ, নো পর্ক। আমি বললাম, আই লাইক ভেজিটেবল।
আই লাইক চিকেন। নো প্রবলেম। তবু দ্বিধা তো রয়েই গেল। শুনেছি চীনারা সাপ-ব্যাঙ-শামুক সবই খায়। ওদের হালাল-হারাম বলে বিষয় নেই। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পঁয়তাল্লিশ জন শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই বিফ আর চিকেন লিখে দিয়েছি ফরমে। সুতরাং সে অনুযায়ীই সবকিছু করবে এমনটাই অরিয়েন্টেশন ক্লাসে মিনডি লাওশি সবাইকে জানিয়েছেন। আমাদের সহযাত্রী আলোকচিত্রী কামাল ভাই (চাইনিজ নাম মাথাও বলে পরিচিত) এর আগেও কুনমিং গিয়েছেন। অভিজ্ঞ মানুষ। পরামর্শ করলাম জরুরি কী কী নেয়া দরকার। তিনি বললেন, কী নেন আর না নেন তবে এক প্যাকেট চিড়া আর গুড় অবশ্যই সঙ্গে নেবেন। এটা খুব কাজে দেবে। আমি বললাম কি বলেন? চিড়া-গুড়! খুলে বলেন ঘটনা কি? বেশ ক’টা কারণেই নেয়া ভালো। এক. চীনাদের খাবার-দাবার বিশেষ করে যে মসলা তা আপনার ভালো নাও লাগতে পারে। অনেক রকম সবজি সেদ্ধ পাবেন টেবিলে। আর কুনমিং আমাদের চেয়ে দুই ঘণ্টা আগে। সুতরাং যখন সকাল সাতটায় ওদের ব্রেকফাস্ট টাইম। আমাদের এখানে তখন ভোর পাঁচটা। দুপুর ১১টায় ওদের লাঞ্চ টাইম, ১২টার মধ্যে শেষ। তার মানে আমাদের এখানে তখন সকাল দশটা। আমাদের অনেকে এ সময় নাস্তা পর্যন্ত শুরু করে না। অন্যদিকে ওদের ডিনার বিকাল পাঁচটা থেকে ছয়টা আমাদের এখানে তখন দুপুর ঠিক ৩টা। দাদা সমস্যা হয়ে যাবে রাতে। এত আগে ডিনার করে লম্বা সময় খাওয়া নেই। ক্ষুধা লাগতে পারে। সুতরাং তখন একমুঠো চিড়া আপনার পাকস্থলীতে প্রশান্তি দিতে পারে। মনে হলো, ভালোই তো সহজ বুদ্ধি। কিন্তু চীন যাবো চিড়া নিয়ে? আমার বাসায় সব জানালে অবাক হলেও যুক্তিটা মেনে নিলো। পরে যাবার আগের দিন আমার ট্রলি ব্যাগে দেখলাম ঠিকই পুষ্পিতা এক প্যাকেট চিড়া দিয়ে দিয়েছে। তবে এটা পুরোটাই ঝুঁকি মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেয়া। শেষ পর্যন্ত দু’সপ্তাহ অবস্থানকালে কুনমিং-এ খাবার নিয়ে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। আয়োজকরা আমাদের কথা মাথায় রেখে সব সময় প্রতিটি ভিজিটিং প্রোগ্রামে হালাল খাবার রেখেছেন। সারাদিন বাইরে থাকাকালীন চিকেন বার্গার, চিকেন নাগেট আর কোক দিয়েছেন। তিনবেলা খাবারের মধ্যে সবচেয়ে রাজসিক খাবার পেতাম নাস্তার টেবিলে। ম্যাপল প্যালেসে উদারভাবে আমাদের নানান পদ সরবরাহ করা হতো। স্যুপ, চা, কফি, দুধ থেকে শুরু করে অন্তত তিরিশ রকমের খাবার সাজিয়ে রাখতো। কাজেই পুরো দিন আর কোথায় কি খাওয়া হচ্ছে না ভেবে আমরা সকলেই উদরপূর্তি করে ফুর্তিতে বের হতাম। সকালের খাদ্য তালিকায় ম্যাপল কর্তৃপক্ষ মজাদার সব খাবার সরবরাহ করতো। তাই শখ করে একদিন সেই তালিকার নোট নিয়েছিলাম।Millet congee (এক ধরনের চালের তৈরি স্যুপ), Porridge (ফল মিশ্রিত চালের স্যুপ), Carrot fruit lotus while (গাজর, পদ্মফল সেদ্ধ), Pickle (সালাদ), Cucumber (শসার তৈরি সালাদ),Braised Vegetable with Masrum (মাশরুম সহযোগে সবজি সেদ্ধ), Fride chicken rice flower (চিকেন রাইস), Salt &‌ pepper chips (লবণ মরিচে তৈরি আলুর চিপস), Poached Corn (মিষ্টি পানিতে ভুট্টা সেদ্ধ), Raw Roasted sweet potato (মিষ্টি আলু সেদ্ধ), Stir fried cabbage with carats (গাজর ও শসা সেদ্ধ), Pritter (এক ধরনের রুটি), Carrot fried melon (গাজর ও বাঁধাকপি পাতা সেদ্ধ), Steamed salt (বরবটি সেদ্ধ),Rice oil not (সবজিসহ নুডুলস সেদ্ধ), Rice noodles (বার রকমের মসলা সহযোগে রাইস নুডুলস), water mixed with fermeted black bean (মটরশুটি সেদ্ধ), Rice chicken fry (চিকেন রাইস মিক্সড করে ভাজা), Sweet cornflex (সুইট কর্নফ্লেক্স), Non Sweet Cornflex (নন-সুইট কর্নফ্লেক্স)। এর বাইরে ডিম থাকতো তিন ধরনের। সাধারণ ডিম পোচ-এর বাইরে রাজ হাঁসের ডিম আর মুরগির ডিম সেদ্ধ। দুধ দুই ধরনের- সয়া আর সাধারণ। জুস দুই তিন ধরনের। এর বাইরে রুটি, মাখন, জেলি তো ছিলোই।
দিন এবং রাতে আমাদের লাঞ্চ-ডিনারের ব্যবস্থা ছিল ইউনান ইউনিভার্সিটির ইউওয়েতং ক্যাফেটেরিয়ায়। সেখানকার তিন তলায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হালাল ফুডের কর্ণার ছিল। দুপুর এবং রাতে বিশ রকমের আইটেম থাকতো। বিফ, চিকেন আর ভেজিটেবল দিয়ে তৈরি নানান পদ। কখনো কখনো মাছ ভাজি বা মাছ অল্প মসলায় সেদ্ধ করে পরিবেশন করতে দেখেছি। চীনে গিয়ে খাবারে সবচেয়ে বেশি দেখেছি আলু দিয়ে তৈরি নানান রকমের আইটেম। সব রকম আলুর ব্যবহার তারা খাবারে করে থাকে। মিষ্টি আলু সেদ্ধ পোড়া-অল্প তেলে ভাজা সবরকম। আলু সেদ্ধ, আলু বড় করে ভাজি, আলুর চিপস প্রতিদিনই কোনো না কোনো আইটেম পেতামই। আর পেতাম ভুট্টা দিয়ে নানান রকম খাবার। ভুট্টা চিনি দিয়ে ভাজা, ভুট্টা সেদ্ধ, ভুট্টা চিনি পানিতে সেদ্ধ, ভুট্টা ফ্রুট সালাদের সঙ্গেও ব্যবহার করতে দেখেছি। টেবিলে প্রচুর তরমুজ সরবরাহ করতে দেখেছি। চীনে গিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছি খাবারের সঙ্গে পানি পরিবেশন না করা। চীনারা পানি কম খায়। হয়তো আবহাওয়া ঠাণ্ডা বলে। আর বাইরে দোকানগুলোতে খেয়াল করেছি পানির চেয়ে সেখানে বিয়ার সস্তা। যেখানে তিন বা চার আরএমবিতে বিয়ার পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে পানি বা কোক কিনতে পাঁচ বা ছয় আরএমবি। সন্ধ্যায় ম্যাপল প্যালেসের উল্টোদিকে পাঁচতলা একটি মলে তরুণ-তরুণীরা দলে দলে বসে আড্ডা দিতো। তাদের টেবিলে একটি বড় পাত্রে গরম গরম নুডুলস পরিবেশন করতে দেখেছি। সবাই মিলে তা চপস্টিক দিয়ে খেতো। আর প্রচুর ভাজাভুজি বা কাবাব বিক্রয় হতো। সেখানে অক্টোপাস থেকে শুরু করে নানান ধরনের মাছ, সবজি, পোকামাকড় ভাজি বিক্রয় হতো। নানান মসলা সহকারে এই খাবারে রশনা তৃপ্ত করতো চায়না যুব সমাজ। তেষ্টায় তাদের হাতে থাকতো বিয়ার। এতো গেল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা। কিন্তু অথেনটিক চাইনিজ ফুড কি? আমরা যে চাইনিজ খাবার খাই তা কি সত্যিই চাইনিজ। আসলে এটা একটা বুজরুকি। আমরা যে চাইনিজ খাবার খেয়ে থাকি তা নামেই। এটা বাংলাদেশি সংস্করণ। চীনের রাইস নুডুলস আমাদের এখানে আমি তৈরি হতে দেখিনি। চীনারা যেভাবে মাছ কাবাব করে বা বেগুন পুড়িয়ে ফুটপাথে বিক্রয় করে তা আমাদের এখানে সম্ভব নয়। দেশে ফিরে বেশকিছু চাইনিজ খাবার তৈরির চেষ্টা করেছি খুব একটা পেরে উঠিনি। যা হোক মূল কথায় আসি। কুনমিংসহ ইউনান অঞ্চলে তিনটি খাবার খুব জনপ্রিয়। এটা তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তা হলো- মুন কেক, রাইস ফ্লাওয়ার কেক, গোচিয়াও রাইস নুডুলস বা রাইস নুডুলস। এই তিনটি তিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে তৈরি। কুনমিং-এর উৎসব আনন্দে পরিবেশিত হয় এই খাবারগুলোই।
মুন কেক
চাইনিজ নিউ ইয়ারের পরে মিড অটম ফেস্টিভ্যাল হচ্ছে সবচেয়ে বড় উৎসব। আর এই উৎসব পালিত হয় লুনার ক্যালেন্ডারের অষ্টম মাসের ১৫তম দিনে। এ সময় চাঁদ সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো দেয় পৃথিবীতে। আর কৃষকরা তাদের ফসল ঘরে তোলে। এ উৎসবে চীনে ছুটি থাকে। নানা উপহার সামগ্রী বিতরণের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে দিবসটি পালিত হয়। কিন্তু এই উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে মুন কেক। মুন কেক হচ্ছে ফ্লাওয়ার কেকের একটি ধরন। ফ্লাওয়ার কেক তৈরি হয় গোলাপ থেকে। ফুলের রাজধানী কুনমিংসহ ইউনানের বিভিন্ন এলাকায় মুন কেক তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের গোলাপ চাষ করা হয়। ফ্লাওয়ার কেক চার রকমের হয়। তার মধ্যে মুন কেক। মিড অটম  ফেস্টিভ্যালে বন্ধু-বান্ধব সকলেই নিজেদের মধ্যে মুন কেক বিনিময় করে থাকে। একটি গোলাকৃতির হয়ে থাকে। মিড অটম  ফেস্টিভ্যালের বিশেষ দিনটিতে ব্রাইট মুনকে উদ্দেশ্য করে মুন কেক উৎসর্গ করে থাকে। এটিকে দেখা হয় পরিবারের সকলের বন্ধন দৃঢ় করার প্রতীক হিসেবে। চিং ডায়নেস্টির সময় থেকেই এই কেক তৈরি শুরু হয়। বর্তমানে যে মুন কেক দুনিয়াজুড়ে বিখ্যাত এর সূচনা ১৯৪৫ সালে কুনমিং-এর গোয়ানশেং অঞ্চলে। গোয়ানশেং অঞ্চল মুন কেক-এর জন্য প্রয়োজনীয় এডিবল রোজ তৈরিতে খ্যাত।
রাইচ ফ্লাওয়ার কেক
ইউনানের বিখ্যাত আরেকটি কেক।  কুনমিং শহরে ছেলে-বুড়ো সকলের মধ্যেই এই স্ন্যাকস খুব জনপ্রিয়। কুনমিং-এর বাইরে ত্বালি শহরে রাইচ ফ্লাওয়ার কেক একইরকমের জনপ্রিয়। এই কেক তৈরিতে উন্নতমানের চাল ব্যবহৃত হয়। এটা বিভিন্ন আকৃতির হয়ে থাকে। চালকে সেদ্ধ বা বাষ্পায়িত করে একে বিভিন্ন ব্লকে অথবা ছাঁচে ফেলে এই কেক তৈরি হয়। একেক রাইস ফ্লাওয়ার কেক একেক স্বাদের হয়ে থাকে। এটি তৈরির সময় এর রন্ধনপ্রণালীর গন্ধে চারপাশে মউ মউ ঘ্রাণ ছুটে।
রাইচ নুডুলস
রাইচ নুডুলস বা গোচিয়ান রাইস নুডুলস। ইউনানের একটি বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি নুডুলস। এই নুডুলস সেদ্ধ মুরগির মাংস বা শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি করা হয়ে থাকে। রাইস নুডুলস চার ধাপে তৈরি করা হয়। প্রথম ধাপে নুডুলসকে তেলে ভিজিয়ে রাখা হয়। দ্বিতীয় ধাপে তেলযুক্ত মসলা এবং লবণ-মরিচ মেশানো হয়। তৃতীয় ধাপে পছন্দানুযায়ী নানান ধরনের মাংস, সবজি সেদ্ধ, সয়া মিল্ক, ধনে পাতা দেয়া হয়। শেষ ধাপে সেদ্ধ নুডুলস মেশানো হয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ছাত্রদের সঙ্গে একই হলে থাকার দাবিতে আন্দোলনে ছাত্রীরা

সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব অনু আর নেই

আইন ও জবাবদিহিতার উর্ধ্বে নই আমরা: মেয়র নাছির

ডাকাতি হওয়া ১১৮ বস্তা চাল মুন্সীগঞ্জে উদ্ধার

‘ক’ ইউনিটে ২৩.৩৭ ও ‘চ’ ইউনিটে ২.৭৫ শতাংশ উত্তীর্ণ

আফগানিস্তানে সিরিজ হামলায় নিহত ৭৪

কায়রো মেয়েদের জন্য সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক শহর’

মুসলমানের মতো দেখা যায় তাই...

‘চীন ও রাশিয়ার অবস্থান আগের চেয়ে পরিবর্তন হয়েছে’

ভোলায় যাত্রীবাহি বাস খাদে, নিহত ১

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না

চট্টগ্রামে মহাসড়কের পাশে নারীর লাশ

চট্টগ্রামে হোটেলে জুয়ার আসর, ব্যবস্থাপকসহ আটক ৬২

‘আওয়ামী লীগ ইসিকে স্বাধীনতা প্রদান করেছে’

বাংলাদেশেও সেখানকার মতো বিচার ব্যবস্থা দেখতে চান