সব পরীক্ষা কি রাজপথ থেকেই আদায় হবে?

মত-মতান্তর

কেফায়েত শাকিল | ৮ অক্টোবর ২০১৭, রবিবার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত রাজধানীর সাতটি কলেজের সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। একই শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এক সঙ্গে শেষ বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু বিধিবাম একপক্ষের রেজাল্ট হওয়ায় চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্যদিকে অপর পক্ষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে চেয়ে রয়েছেন ফলাফলের দিকে। এটা পরীক্ষা দেয়া চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের কথা। তবে যেসব বর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনও পরীক্ষা দিতে পারেননি বা কবে নাগাদ পরীক্ষা দিতে পারবেন সেটাও জানেননা, তাদের এখন আর স্বপ্ন বলতে কিছু নেই।
চলতি বছরের ১৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ও মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এর পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের উদাসীনতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে কলেজগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম। মাসের পর মাস ধরে আটকে থাকছে বিভিন্ন পরীক্ষা ও ফলাফল। নিয়মিত পাঠদান, নির্ধারিত পাঠ্যসূচি ও একাডেমিক ক্যালেন্ডারেরও লেজে গোবুরে অবস্থা। নেই কলেজগুলোর পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট ও যথোপুযুক্ত নিয়ম-কানুন। ফলে বাড়ছে সেশনজট। প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন জটিলতা। আর এতে হুমকির মুখে পড়ছে এসব কলেজের প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। এমন পরিস্থিতিতে অধিভুক্ত হওয়া কলেজগুলোর ব্যাপারে নীতিমালা প্রণয়ন এবং প্রকাশ (একাডেমিক সিলেবাস, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্নের ধরণ, প্রশ্নের মানবন্টন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কলেজসমূহের সম্পর্ক ইত্যাদি), সম্মান ২য় ও ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের মৌখিক/ব্যাবহারিক পরীক্ষা অল্প সময়ে সম্পন্ন করে দ্রুত ফল প্রকাশ, সম্মান ৩য় বর্ষ এবং মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষা দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রহণ, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্স শেষ পর্বের ভর্তি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা, ডিগ্রিতে আটকে থাকা সকল বর্ষের পরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করা, অধিভুক্ত কলেজসমূহের সকল তথ্য সংবলিত একটি ওয়েবসাইট তৈরি, শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং সেশনজট নিরসনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত ২০ই জুলাই শাহাবাগে মনববন্ধনের ডাক দেয় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। সেই মানববন্ধনে হামলা চালায় পুলিশ। এসময় পুলিশের টিয়ার শেলের আঘাতে চোখ হারান তিতুমীর কলেজের রষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র সিদ্দিকুর রহমান। আহতও হয় অনেক। পরে ১২০০ শিক্ষার্থীকে আসামি করে মামলাও দায়ের করে পুলিশ। এতে আরো তীব্র হয় আন্দোলন। পরে অবশ্য রাতেই গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে সকালে সাত কলেজের অধ্যক্ষ ও ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকে বসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এসময় তিনি জানান, ইতিমধ্যে পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করা হয়েছে। উপাচার্যের শিগগিরই সমস্যা সমাধানের আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে ফিরে আসেন। কিন্তু ঘোষিত রুটিন অনুযায়ী মাস্টার্স শেষ পর্বের পরীক্ষা ১০ই সেপ্টেম্বর, অনার্স তৃতীয় বর্ষের ১৬ই অক্টোবর এবং ডিগ্রি প্রথম ও তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা ৪ই নভেম্বর শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা অনুষ্ঠিত হয়নি। এসবের হয়নি সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি বা দেখা মিলেনি যথাযথ রুটিনেরও। অপরদিকে সুন্দরভাবে পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।
ঢাবি অধিভুক্ত কলেজগুলোর ব্যাচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিছিয়ে পড়ছে দ্বিগুন বা তারও বেশি। তাদের ২০১১-১২ সেশনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা ফলাফল পেয়ে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরীক্ষা দিয়ে ফল পাওয়ার আশায় প্রহর গুনছে ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে ঢাবি অধিভুক্ত কলেজগুলোর ২০১১-১২ সেশনের শিক্ষার্থীরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একসঙ্গে পরীক্ষা দিলেও এখনো প্রকাশিত হয়নি তাদের ফলাফল। ফলে এবার বিসিএসসহ কোনো চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেননা এসব শিক্ষার্থী। এতে অন্তত দুই ব্যাচ পিছিয়ে পড়ছেন তারা। চতুর্থ বর্ষের ফল প্রকাশসহ ৫ দফা দাবিতে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে দেয়নি ঢাবি প্রশাসন। মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. এ এম আমজাদ আলী বলেন, অধিভুক্ত সাত কলেজের কোনো শিক্ষার্থী ঢাবি ক্যাম্পাসে আন্দোলন করতে পারবে না। কেননা, এই ক্যাম্পাস তাদের নয়। অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থীদের মূল জায়গা হচ্ছে তাদের ক্যাম্পাস। তারা সেখানে সংবাদ সম্মেলন বা অন্য কোনো আন্দোলন করতে পারে। অথবা অন্য কোনো জায়গায় আন্দোলন করতে পারে। ঢাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ভালোই বলেছেন। নিজেদের ক্যাম্পাস নয় তাই সেই ক্যাম্পাসে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করা যাবে না। তিনি শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস ছেড়ে রাজপথে যাওয়ার পথ দেখিয়েছেন। তিনি বলছেন, সরাসরি ঢাবির ছাত্র নয় বলে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। কিন্তু মধুর ক্যান্টিন একটি ঐতিহাসিক স্থান। এখান থেকে দেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের অনেক ডাক এসেছে। এসেছে ঐতিহাসিক অনেক আন্দোলনের ঘোষণা। এসব কর্মসূচির জন্য শুধু ঢাবি ছাত্র হতে হবে এমন বাধ্য বাধকতা আছে বলে আমার জানা নেই। তাছাড়া বেশি দূরের নয় কাছেরই ইতিহাস বলছে, ঐতিহাসিক ‘নো ভ্যাট আন্দোলন’র ঘোষণাও কিন্তু এই মধুর ক্যান্টিন থেকেই দেয়া হয়েছিল। পাওনা যেহেতু ঢাবির কাছে শিক্ষার্থীরা ঢাবির কাছেই দাবি করবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা স্ব স্ব ক্যাম্পাসে কোনো কর্মসূচি পালন করলে তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু আসে যায় না এবং এর ফলে কোনো পদক্ষেপও নেয়া হয় না। অপরদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতে ক্ষমতা না থাকায় তাদের কাছে কোনো দাবি করেও লাভ নেই। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসব কলেজের পরিচালক সেহেতু দাবি করতে হবে ঢাবির কাছেই। আর ঢাবি কর্তৃপক্ষ যদি কলেজগুলোর দায়িত্ব নিতে না চায়। যদি কলেজগুলোকে তিন নম্বর বাচ্চা মনে করে ফেলে রাখে, তাচ্ছিল্য করে যদি এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগও না দেয় তাহলে ন্যায্য দাবি আদায়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের স্বর্থে শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে রাজপথেই যেতে হবে। আর প্রক্টর মহোদয় ‘অন্য কোথাও’ বলতে সম্ভাবত সেটাই বুঝিয়েছিলেন। সেটাই হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের দেখানো পথ অবলম্বন করে আজ রাজপথে নেমে পুরো রাজধানী অচল করে দিয়েছে। নীলক্ষেতে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে রাজধানীর প্রায় সব সড়কে যানজট তৈরি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। সড়ক অবরোধ করে অবশ্য শিক্ষার্থীরা সফলও হয়েছে। স্বয়ং উপাচার্যের কাছ থেকে পেয়েছে নভেম্বরের মধ্যে ফল পাওয়ার আশ্বাস। পেয়েছে তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার ঘোষণাও। এর আগেও রাজপথ অবরোধ করে, চোখ হারিয়ে ও মামলা মাথায় নিয়ে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষার ঘোষণা পেয়েছিল সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আবার থেমে যায় সব। হারিয়ে যায় পরীক্ষার শিডিউলও। এখন প্রশ্ন হলো, সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের বার বার রাজপথ অবরোধ করেই কি আদায় করতে হবে সব পরীক্ষা আর ফলাফল? বার বার মানুষকে হয়রানি করেই কি নিতে হবে শিক্ষার মৈলিক অধিকার? আর কতো বার হয়রানি হতে হবে সাধারণ মানুষকে? চোখ হারাতে হবে কয়জন সিদ্দিকুরকে?

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ছাত্রদের সঙ্গে একই হলে থাকার দাবিতে আন্দোলনে ছাত্রীরা

সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব অনু আর নেই

আইন ও জবাবদিহিতার উর্ধ্বে নই আমরা: মেয়র নাছির

ডাকাতি হওয়া ১১৮ বস্তা চাল মুন্সীগঞ্জে উদ্ধার

‘ক’ ইউনিটে ২৩.৩৭ ও ‘চ’ ইউনিটে ২.৭৫ শতাংশ উত্তীর্ণ

আফগানিস্তানে সিরিজ হামলায় নিহত ৭৪

কায়রো মেয়েদের জন্য সবচেয়ে ‘বিপজ্জনক শহর’

মুসলমানের মতো দেখা যায় তাই...

‘চীন ও রাশিয়ার অবস্থান আগের চেয়ে পরিবর্তন হয়েছে’

ভোলায় যাত্রীবাহি বাস খাদে, নিহত ১

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ সহ্য করা হবে না

চট্টগ্রামে মহাসড়কের পাশে নারীর লাশ

চট্টগ্রামে হোটেলে জুয়ার আসর, ব্যবস্থাপকসহ আটক ৬২

‘আওয়ামী লীগ ইসিকে স্বাধীনতা প্রদান করেছে’

বাংলাদেশেও সেখানকার মতো বিচার ব্যবস্থা দেখতে চান