চির বসন্তের দেশে, ১

মা হুয়া থানের চোখে চীনের মুসলিম জনগোষ্ঠী

চলতে ফিরতে

কাজল ঘোষ, চীন থেকে ফিরে | ৬ অক্টোবর ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:০৪
চীন। কমিউনিস্ট দেশ। চারপাশে পাহাড় ঘেরা। বন্ধ দুয়ার। পরিচিত মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার যেখানে অপ্রতুল। যারা নিজেদের। কেবলই নিজস্বতায় বিশ্বাসী। সেই চীনে দেড়শ’ কোটি মানুষের ধর্ম কি এমন কৌতূহল অনেকদিন থেকেই। হিমালয় কূলের যেসব দেশ তার বেশিরভাগই বৌদ্ধ প্রধান। কিন্তু ধীরে ধীরে মুক্তবাজারের দিকে ঝুঁকে পড়া চীনে এখন ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেখানকার বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী নির্দিষ্ট কোনো ধর্ম বা বর্ণের মধ্যে নেই। তাদের কাছে সময়টাই ধর্ম। বিশ্বাসটাই ধর্ম। কর্মটাই ধর্ম। তবে তাদের রয়েছে নানান গোষ্ঠীর সম্মিলন। রয়েছে বছরের বিভিন্ন সময় নানান ফেস্টিভ্যাল। বাংলাদেশ-চীন ইয়ুথ সামার ক্যাম্প-২০১৭ তে অংশ নিয়ে জেনেছি নানা তথ্য। আমাদের বাস ছিল ইউনান ইউনিভার্সিটি টাউন এলাকায়। চংখং জেলায় অবস্থিত ইউনান ইউনিভার্সিটির পাশেই ছিল ম্যাপল প্যালেস হোটেল। বাংলাদেশের প্রায় দেড়শ’ শিক্ষার্থী এই ইয়ুথ সামার ক্যাম্পে অংশ নিয়েছে। আয়োজকরা প্রথম থেকেই একটি বিষয় নির্দিষ্ট করে জানতে চেয়েছিল কে কী খেতে পছন্দ করি। নির্দিষ্ট ফরম পূরণ। তারপর ফোনে ফের চূড়ান্ত করা। এটা নির্দিষ্ট করে জানার কারণ বুঝতে পারি কুনমিং পৌঁছে। তবে এর খানিকটা আভাস আগেই মিলেছে চায়না ইস্টার্নের বিমানে চড়ে। দুই ঘণ্টার বিমান ভ্রমণে গরম ভাত, রুটি, মুরগির টুকরো মাংস আর গরুর মাংসের ঝোল যাই ছিল সবই হালাল। প্যাকেটের উপরে হালাল স্টিকার দেখে অবাকও হয়েছি কিছুটা। আসা-যাওয়ার পথে দুবারই একই রকম। আর দু’সপ্তাহ কুনমিং অবস্থানকালে আমাদের সবসময়ই হালাল রেস্তরাঁয় লাঞ্চ-ডিনারের ব্যবস্থা ছিল। তা লক্ষ্য করেছি স্টোন ফরেস্ট আর ত্বালিতে অবস্থানের সময়ও। নানা অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার মধ্যে আমার জানার আগ্রহ ছিল চীনের দরিদ্রতম এলাকা ইউনানের জনগোষ্ঠীর চিত্র কী? সেখানে হান সম্প্রদায়ের বাইরে অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা কেমন আছে? তার সুযোগ মিললো কুনমিং-এর প্রথম জুমার দিন। ১৫ই সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। লাঞ্চ শেষে যারা নামাজ পড়বে তাদের ইউনিভার্সিটির বাসে করে নিয়ে যাওয়া হলো প্রায় ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে একটি মসজিদে। এটি হুইহুই মসজিদ। মসজিদে প্রায় ৫/৬শ’ মুসলিম নামাজ আদায় করছেন। আমার বেশক’জন ক্যাম্পম্যাট হাতে জুতো আবার অনেকেই বগলদাবা করে জুতো নিয়ে ঢুকার চেষ্টায় স্থানীয়রা বিব্রত। খানিকটা হতচকিতও। মনচিয়ালা পিপল (বাংলাদেশের মানুষ) কী করছে? আসলে ওরা তো জানে না আমাদের দেশে মসজিদের বাইরে জুতো চুরি যায়। কিন্তু কুনমিং-এর চিত্র ভিন্ন। সেখানে সাইকেল সারি ধরে রাস্তায় রেখে দেয়া হয়। ক্যাফেতে খেতে গেলে বাইরে ছাতার জন্য আলাদা স্ট্যান্ড রাখা আছে। প্রত্যেকেই তাদের ছাতা সেই স্ট্যান্ডে রেখে খেতে যায়। খাওয়া শেষে ছাতা নিয়ে ফেরে। একইভাবে মসজিদের বাইরেও জুতো রেখেই সবাই নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। তা হলো থরে থরে নানান ধরনের খাবার সাজানো টেবিলে। ফলমূল, কেক-পেস্ট্রি থেকে শুরু করে গরুর মাংসের বিভিন্ন আইটেম। প্রত্যেকেই তাদের ইচ্ছেমতো খাবার নিয়ে নিচ্ছে। আরো খেয়াল করার বিষয় রান্না আর মাংস কাটায় ব্যস্ত মুসলিম মেয়েরা। মসজিদ এলাকাটি কুনমিং শহর থেকে একটু দূরে। এটি চংখং জেলাতেই। এলাকাটা অনেকটাই গ্রাম। ছোট ছোট একতলা বাড়ি আছে অনেকগুলো। আশেপাশে বেশকিছু মুসলিম বসতি আছে এ এলাকায়। সব শুনে আমার আগ্রহ আরো দ্বিগুণ হলো। কিন্তু আমাদের অন্যান্য প্রোগ্রাম এতো বেশি চাপে রেখেছে যে, পৃথকভাবে আর জানার সুযোগ হয়নি। তবে ২১শে সেপ্টেম্বর ত্বালি শহরে থ্রি প্যাগোডা দেখে আমরা যাই পার্শ্ববর্তী একটি মুসলিম এলাকায় লাঞ্চ করতে। সেখানে একঘণ্টার বিরতিতে মা শাওয়া হোটেলের পেছনে ঢুকে পড়ি। সঙ্গে ছিলেন মিশকাত শরীফ। যিনি চাইনিজ ভাষা ভালো বলতে পারেন। আমি আর আমার অপর সহযাত্রী আজিমউদ্দিন হাঁটতে থাকি সরু গলি ধরে। এলাকাটি ছিল নান ওলি চিয়াও। হঠাৎ আমাদের তিনজনেরই চোখে পড়ে একটি বাড়ির সদর দরোজায় আরবি হরফে লেখা। ভেতরে বারান্দায় এক মুরব্বি বসে আছেন। মাথায় টুপি। মুখ শ্মশ্রুম-িত। আসসালামু আলাইকুম বলে ঢুকে পড়লেন মিশকাত ভাই। আমার অনুসন্ধিৎসু চোখ আটকে গেল বাড়িটির অন্দরে। কলম আর নোটবুক আমাকে খোঁচাচ্ছিল। চাইনিজ ভাষায় আমরাও ওয়েলকামিং-টিউন ‘নিন হাউ’ বললাম। ভেতরে বসার অনুমতি পেলাম। কথাও টুকটাক শুরু হলো। মা হুয়া থান। বয়স হয়েছে ৮২। নান ওলি চিয়াও এলাকাতেই ওনাদের তিন-চার প্রজন্মের বাস। পুরো এলাকায় প্রায় হাজারখানেকের মতো মুসলিম বাস করে। এখানে মসজিদ আছে। আছে মাদরাসাও। যার ছাত্রসংখ্যা তিনশ’র মতো। থানের পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জন। তার পরিবারের তিন সদস্য হজেও গিয়েছেন। চীনে মূলত হান সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি। তাদের সঙ্গে মিলেই বাস করতে হয়। পাশের নাম পে এলাকাতেই হানদের বাস। ত্বালি এলাকার চারপাশেই পাহাড়বেষ্টিত। যেখানেই তাকাই না কেন পাহাড় যেন দেখছে। মা হুয়া থান অভিজ্ঞতার চোখ দিয়ে পাহাড় দেখিয়ে বললেন, পাহাড় নিয়ে সুখী না অসুখী তা বলা যাবে না। এটা নির্ভর করে আমরা কে কিভাবে জীবনধারণ করছি তা দিয়ে। ধর্ম ও মানসিকতা দুটো মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সরকার পরিবর্তন বড় কথা নয়। মানুষের পরিবর্তনেই সরকার বদলায়। আমরা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছি।
মানুষ পরিবর্তন হচ্ছে বলে চীন বদলাচ্ছে। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার মা হুয়া থান। নিজের আবাসস্থল নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। মেয়ে-নাতনি দুজনই শিপ বিল্ডার্স কোম্পানিতে কাজ করেন। বাড়ির অন্দর মহল ইট-সুরকিতে ঠাসা। ফাঁকে ফাঁকে তদারকি করছেন আর কথা বলছেন। জানালেন, তিনি মনচিয়ালার (বাংলাদেশ) কথা শুনেছেন। বাংলাদেশ যে মুসলিম প্রধান তা তিনি জানেন। তবে কখনও আসার সুযোগ হয়নি। থান আরো বলেন, আমরা কি ভাবছি আমাদের তাই এগিয়ে দিচ্ছে। ত্বালিতে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান আছে। যা মুসলিমরা পরিচালনা করে। নান ওলি চিয়াও এলাকায় একসঙ্গে অনেকেই আছি বলে ভালো আছি। কিছু সমস্যাও হয়। যেমন রমজানে অনেকেই ছুটি পায় না। তখন কিছু কিছু অসুবিধা হয়। থানের সঙ্গে কথা বলে ইউনান প্রদেশের মুসলিমদের সামগ্রিক চিত্রটাও ঝালাই করে নেই। গুগল সার্চ করে জানতে পারি চীনের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১.৭ শতাংশ মুসলিম। গাণিতিক হিসেবে ২৩ মিলিয়ন। এর মধ্যে ইউনানে অর্থাৎ কুনমিং-সহ অন্য জেলাগুলোতে আশি হাজারের মতো মুসলিম বাস করে। চীনের ৫৬টি মাইনরিটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে মুসলিমদের অবস্থান সপ্তম। প্রায় সাতশ’ বছর আগে ইউনানে মুসলিম জনবসতির সূচনা। কুবলাই খাঁ এবং পরবর্তীতে তার দৌহিত্র চেঙ্গিস খাঁর সময় এ অঞ্চলে মুসলিমরা শাসক ছিল। ইউনানের কুনমিং-এর সানচেং স্ট্রিট এলাকা। যা পুরনো টাউন বা ডাউন টাউন বলে পরিচিত। সে এলাকায় সবচেয়ে বড় মসজিদটি অবস্থিত। যা নানচুং মসজিদ বলেই সকলেই জানেন। ২,৫৫৭ মিটার এলাকা নিয়ে এই মসজিদটি। এর নির্মাণ হয়েছে থাং ডাইনেস্টির (৬১৮-৯০৭) সময়কালে। এর পুনঃনির্মাণ হয় থাং ডাইনেস্টির পরবর্তী চিং ডাইনেস্টির (১৬৪৪-১৯১১) সময়কালে। চীনে মুসলিমদের বলা হয় ‘হুয়েই’ (ঐঁর)। আর সম্প্রদায়কে চীনা ভাষায় বলে ‘চু’। অর্থাৎ মুসলিম সম্প্রদায়কে তারা বলে ‘হুয়েই চু’। ইউনানের বাইরে পার্শ্ববর্তী  সিচুয়ান প্রদেশে একটি বড় অংশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস রয়েছে। যাদের বলা হয় উইগোর। ইউনানে হুয়েই চু’র বাইরে বেশকিছু উইগোর মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকও বাস করে। নানচুং মসজিদ এলাকায় প্রচুর হালাল রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আর এই বড় মসজিদ ছাড়াও চংদি, সানচেং স্ট্রিট, ইয়ংনিং মসজিদ মুসলিম সম্প্রদায়ের বড় প্রার্থনা স্থান।

কাল পড়–ন: পাথরে লেখা
অমর কাব্যগাঁথা





 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

amir hossain

২০১৭-১০-০৭ ২৩:৩৪:৪৪

thanks body thanks a lot kip it up men god bless you

Md manowar Kamal

২০১৭-১০-০৬ ১০:২৯:৪০

Wonderful.

Citizen

২০১৭-১০-০৬ ১০:০২:২৪

Good. Thank you. Please continue writing more.

শাহান কামাল

২০১৭-১০-০৬ ০৪:১০:৩২

লিখাটা পড়ে সেই দিনগুলো মনে পরে যাচ্ছে! তাছাড়া লেখক কাজল ভাইয়ের দৃষ্টিকোণও অসাধারণ। ভাল লাগল পড়ে :-)

Md.Shahadat Akhand.

২০১৭-১০-০৬ ০২:০৫:৩৭

অজানাকে জানতে অচেনাকে চিনতে বড়ই ভাল লাগে।সুদূর চীনের মুসলিম জনগোষ্টী সম্পর্কে এ ধারনার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

Synergreen Fashion

২০১৭-১০-০৫ ১৯:৪৬:৫৯

এশিয়ার বৃহদ রাষ্ট্র চীন সম্পর্কিত সুন্দর লেখার জন্য লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ. পরবর্তী লেখাগুলোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি!

আপনার মতামত দিন

চারদিকে তখন আতঙ্ক

ফ্যামিলি ভিসা নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়- ট্রাম্প

নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলাকারী আকায়েদের বাড়ি চট্টগ্রামে

প্যারিসে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী

নিউ ইয়র্কে বোমা হামলাকারী বাংলাদেশী আকায়েদ উল্লাহ আইএসের অনুসারী, দায় স্বীকার আইএসের

শাহজালালে বিপুল পরিমান আমদানী নিষিদ্ধ ঔষুধসহ আটক ১

নব্য জেএমবির দুই সদস্য গ্রেপ্তার

‘রাজকোষ চুরি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক’

রোহিঙ্গা নির্যাতন: মিয়ানমারের মহামূল্যবান রত্ন শিল্পে আঘাত

‘এটা আমার জন্য বড় একটি ব্যাপার’

২০ লাখ পাউন্ড ঘুষ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও সাবেক ডেপুটি-মেয়রের নাম

পাচার অর্থ ফেরতে নানা জটিলতা

ম্যানহাটন হামলায় আটক ব্যক্তি বাংলাদেশি?

২৯ রোহিঙ্গা নারীর মুখে ধর্ষণযজ্ঞের বর্ণনা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ এক সপ্তাহ স্থগিত

বাকেরগঞ্জে সাবেক এমপি মাসুদ রেজার ভাই গুলিবিদ্ধ