ফড়িয়াদের গুদামে ধান

এক্সক্লুসিভ

প্রতীক ওমর, বগুড়া থেকে | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বৃহস্পতিবার
গরিবের মোটা চালে এখন আগুন জ্বলছে। শুধুই আগুন। এই আগুন নেভানোর সব চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়সীমা অতিক্রম করেছে বেশ আগেই। তার উপর আবারো সপ্তাহখানেক ধরে প্রতিদিন বাড়ছে মোটা চাল। উপায় না পেয়ে অনেকেই ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমিয়েছেন।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে মোটা চাল কেজিতে ৮-১০ টাকা বেড়েছে।
কোয়ালিটি ভেদে গরিবের মোটা চাল ৫৩ থেকে ৫৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চালের দাম বাড়ায় এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। এতে দিশাহারা হয়ে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এদিকে মোটা চালের আমদানি বাজারে খুব কম। ব্যবসায়ীরা বলছে মিল থেকে মোটা চাল আসছে না। ছোট ব্যবসায়ী বলছে মহাজনদের হাতে চাল থাকলেও তারা গুদামজাত করে ইচ্ছেমত দাম বাড়াচ্ছেন।
ছোট মিলাররা বলছে বর্তমানে বিআর-২৮ ধান ১৩০০ টাকা মণ কিনতে হচ্ছে। এক মণ ধান থেকে চাল উৎপাদন হয় ২৫ কেজি। এই হিসেবে প্রতিকেজি চালের দাম হয় ৫২ টাকা। এক মণ ধান চাল করলে ৯ কেজি গুঁড়া বের হয়। গুঁড়া বর্তমান বাজারে প্রতি কেজি ১১ টাকা বিক্রি হচ্ছে। গুঁড়ার টাকায় চালের উৎপাদন  খরচ হয়ে যায়। মিলাররা এই চাল খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে ৫৩ টাকায়। সাধারণ ক্রেতাদের কাছে এই চাল হাত বদল হয়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৮ থেকে ৬২ টাকায়।
চাল উৎপাদন করার পর প্রতি কেজি চালে ৮ থেকে ১০ টাকা মুনাফা নিচ্ছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারি কোনো পদক্ষেপ এখনো সেভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দিন দিন তারা চালের বাজারকে ঊর্ধ্বমুখী করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বগুড়া অঞ্চল থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ মৌসুমে বগুড়া, জয়পুরহাট, পাবনা, সিরাজগঞ্জ কৃষি অঞ্চলে বোরো আবাদ হয়েছিল ৪ লাখ ৫৩ হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে। চাল আকারে এর পরিমাণ ১৯ লাখ ৬০৩৫ টন। চার জেলায়    পৃষ্ঠা ১৭ কলাম ৪
 মোট আউশ আবাদ হয়েছিল ৪৩ হাজার ২১৩ হেক্টর জমি। চাল আকারে এর উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৩ টন। দুই মৌসুমে চাল উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখ ১৮ হাজার ৯৪৮ টন। এই অঞ্চলে মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখ ৬৫ হাজার ১৪৯ জন। এই জনসংখ্যার বার্ষিক চালের চাহিদা ১৪ লাখ ২৩ হাজার ২৬০ টন। শুধুমাত্র বগুড়া কৃষি অঞ্চলেই চলতি মৌসুমে চাল উদ্বৃত্ত হয়েছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮৮ টন।
তাহলে এই উদ্বৃত্ত চাল গেলো কোথায়? সাধারণ মানুষের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মাঠ পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে অনেক ক্লুই বেরিয়ে এসেছে। বিশেষ করে ছোট ছোট চাল ব্যবসায়ী এবং ছোট মিলারদের কাছে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সাধারণ কৃষকের ঘরে এই মুহূর্ত্বে ধান নেই। তারা বলছে মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা তাদের আশি ভাগ ধান বিক্রি করেছে। এই ধান মৌসুমের শুরুতে কম দামে কিনে ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা ছোট ছোট গুদামে বস্তা জাত করে রেখেছে। ভাতের চালের এলসি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ধান রাতারাতি প্রতিমণে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেশিতে বিক্রি করছে ফোড়ে ব্যবসায়ীরা। ছোট চাতাল মালিকরা অনেকটা বাধ্য হয়েই বেশি টাকায় সেই ধান কিনে চাল করছে।
 কথা হয় গাইবান্ধার বোনারপাড়া এলাকার হাসকিং চালকল মালিক মোকছেদুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, চাতালে মাসিক বেতনে শ্রমিক নিতে হয়। কাজ থাকলেও তাদের বেতন দিতে হয় না থাকলেও বেতন দিতে হয়। বাধ্য হয়েই বেশি টাকায় ধান কিনে শ্রমিক চালাচ্ছি। তিনি আরো জানান, বিআর-২৮ তারা ৫২-৫৩ টাকায় চাল ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছে। অথচ সেই চাল খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬২ টাকায়। বাজার জিম্মিকারীদের অচিরেই চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বগুড়ার চালের খুচরা গোদারপাড়ায় কথা হয় চাল কিনতে আসা সাইফুল্লা সাকির সঙ্গে। তিনি জানান, ৪০ টাকার মোটা চাল এখন বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে ৬০ টাকায়।    
এদিকে খুচরা চালের আড়তদাররা বলছে, চালের বাজার পুরোটাই  সিন্ডিকেটের হাতে চলে গেছে। কৃষি বিভাগের হিসেব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত চাল আছে। তার পরেও দেশের বাইরে থেকে প্রতিনিয়তই চাল দেশের বাজারে আসছে। তার পরেও হাতেগোনা কিছু অসাধু ব্যক্তির কারসাজিতে চালের দাম এখন আকাশচুম্বি।    
এদিকে উত্তরের আট জেলায় দুই দফা বন্যায় কৃষকের লক্ষাধিক হেক্টর বিভিন্ন ফসলি জমি পানির নিচে চলে যাওয়ায় ব্যাপক ফসল হানি হয়েছে। এর সঙ্গে আগে থেকেই চাল আতঙ্ক আছেই। সব মিলে এই অঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ চরম বিপকে পড়ে আছে। সিন্ডিকেটদের দৌরাত্ম্য এখনি থামানো না গেলে বাজার পরিস্থিতি আরো অস্বাভাবিক হতে পারে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি খাদ্যগুদামগুলো চলতি মৌসুমে চাল সংগ্রহে ব্যর্থ হয়েছে। প্রভাবশালী মিলাররা এবার খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহ করেনি বলেই চলে। যতটুকু চাল সংগ্রহ হয়েছে তার সবটাই ক্ষুদ্র মিলারদের কাছ থেকে এসেছে। যারা চাল দিয়েছে তারা বরাবরই বলেছে সরকার চালের দাম বেঁধে দিয়ে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি করেছে। তারা বরাবরই ধনের দাম নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আসছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধানের দাম কোনো পক্ষ থেকেই ঠিক রাখা যায় নি। সরকারি খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত চাল না থাকার সুযোগ নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। বাজারে চালের দাম বাড়ায় সরকারের বেঁধে দেয়া ৩৪ টাকা কেজিতে চাল দিতে অধিকাংশ মিলাররা শুরু থেকেই নারাজ। এবার উত্তরাঞ্চলের এক তৃতীয়াংশ মিলার খাদ্য অফিসের সঙ্গে চাল দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। এতে সরকারি খাদ্যগুদামে লক্ষমাত্র পূরণ না হওয়ার আশঙ্ক করছেন কর্মকর্তারা। চালের চলমান অস্থির বাজার এর জন্য দায়ী। মিলারা  সরকারি গুদামে চাল দেয়ার পরিবর্তে খোলা বাজারে কেজিতে ১৫-১৮ টাকা বেশিতে চাল বিক্রি করছে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ মিল এখন চালু। বাজারেও পর্যাপ্ত চালের আমদানি। তার পরেও মোটা চাল কিনতে গুনতে হচ্ছে ৬০ টাকার বেশি। চালের মূল্য বৃদ্ধি লাগামহীনভাবে সামনের দিকে যাচ্ছে। কোনো মহল থেকেই সেই লাগাম টেনে ধরা হচ্ছে না। দিন দিন পরিস্থিতি আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। খেটে খাওয়া গরিব মানুষ এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে। নওগাঁ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বগুড়া ঘুরে চালের বাজারে এমন চিত্র দেখা গেছে। এ অঞ্চলের কৃষকরা ধান কাটা শুরু থেকেই বাজারে ধান বিক্রি করছে। বর্তমানে কৃষকের ঘরে ধান নেই। রাঘব বোয়াল মিলার এবং স্টক ব্যবসায়ীদের হাতে গুদামজাত হয়ে আছে উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ ধান। অসাধু মিলার এবং স্টক ব্যবসায়ীরা সেই ধান চাল করে উচ্চমূল্যে বাজারে ছাড়ছে। এতে রাতারাতি হাতেগোনা কিছু ব্যবসায়ী হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। অসাধু ব্যক্তিরা দেশের মানুষকে জিম্মি করলেও সরকার তাদের কিছু বলছে না। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অসাধু স্টক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে  সরকারের উচ্চপর্যায়ের আঁতাত আছে।
বগুড়া জেলা চাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শাহ মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের উৎপাদিত চাল দেশের মধ্যেই আছে। কোথায় আছে সরকার ইচ্ছে করলেই খুঁজে বের করতে পারবে। রাঘব বোয়ালদের সবাই চেনে। তিনি বলেন এদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালেই বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তিনি চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ জানান।  

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

‘অভিযোগ কাল্পনিক ও বানোয়াট’

মইনকে আশ্বস্ত করেছিলেন প্রণব

ব্লু হোয়েল গেম জায়েজ নয়

শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন চায় জেপি

রোহিঙ্গাদের দেখতে আসছেন জর্ডানের রানী

পেপ্যাল ‘জুম’ সার্ভিস বাংলাদেশে

হাওরে সরকারি প্রকল্পে লুটপাট হয়েছে

প্রার্থী নিয়ে নির্ভার আওয়ামী লীগ-বিএনপি

গণমাধ্যম-সশস্ত্র বাহিনীর সম্পর্ক নিয়ে সেমিনার

সিলেটে ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত, সেক্রেটারিসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা

খালেদা জিয়ার পুরো জবানবন্দি

বরিশালে বিচারকের ভূমিকায় বেঞ্চ সহকারী, তোলপাড়

গাজীপুরে প্রাক্তন তিন সেনা সদস্যসহ ৪জন গ্রেপ্তার

খান আতা ইস্যুতে এফডিসিতে চলচ্চিত্র পরিবারের সংবাদ সম্মেলন

আদালত অঙ্গনে খালেদার আইনজীবীদের হাতাহাতি

বন্যায় ৩০ শতাংশ ধান উৎপাদন কম হতে পারে