সুচির সভাপতিত্বে জাতি নির্মূল উৎসব

প্রথম পাতা

নিকোলাস ডি ক্রিস্টফ | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১৫
গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। নারীদের গণহারে ধর্ষণ করা হচ্ছে। নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। আর এই জাতি নির্মূল উৎসবে ‘সভাপতিত্ব’ করছেন অং সান সুচি। গত তিন সপ্তাহ ধরে সিস্টেমেটিক্যালি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার বেসামরিক সাধারণ মানুষকে গলা কেটে হত্যা করছে। এসব মানুষ রোহিঙ্গা মুসলিম।
এমন পরিস্থিতিতে তারা পালিয়ে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাবে তাদের সংখ্যা কমপক্ষে তিন লাখ ১৩ হাজার। সীমান্ত অতিক্রমের সময়ও তাদের গুলি করছে মিয়ানমারের সেনারা। বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে আসছিলেন নূর সায়মন নামে এক নারী। তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর একজন সাংবাদিককে বলেছেন, বৌদ্ধরা আমাদের গুলি করে হত্যা করছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে বাড়িঘর। আমাকেও গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করেছিল। আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী।
অং সান সুচি একজন বিধবা। তিনি মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের রক্তচক্ষুকে পাত্তা দেন নি। এজন্য তাকে মোট ১৫ বছর জেলে থাকতে হয়েছে। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। আধুনিক সময়ের ইতিহাসে তিনি একজন ‘হিরো’ ছিলেন। এখন তিনি মিয়ানমারের কার্যত নেত্রী। তার দেশে ধূসর চামড়ার রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্পেষণ চালানো হচ্ছে। তাদের টেররিস্ট আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তারা অবৈধ অভিবাসী। এটা স্পষ্টত জাতি নির্মূল। এজন্য মিয়ানমারের হয়ে অং সান সুচিকেই প্রধানত কৈফিয়ত দিতে হবে। জাতি নির্মূল বললে কমই বলা হয়। সর্বশেষ সহিংসতা শুরুর আগে ইয়েলের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা চালানো হয় তাকে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। সতর্কতা উচ্চারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের হলোকাস্ট মিউজিয়াম। তারা বলেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ঘনিয়ে আসছে।
আপনার জন্য লজ্জা, সুচি! আমরা আপনাকে সম্মানিত করেছিলাম। আপনার মুক্তির জন্য লড়াই করেছিলাম। আর এখন আপনি সেই অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে আপনার নিজের জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞকে বা কসাইখানাকে উপেক্ষা করছেন?
ফোরটিফাই রাইটস নামের মানবাধিকার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ স্মিথ বাংলাদেশ সীমান্তে আসা শরণার্থীদের সাক্ষাৎকার নেয়ার পর আমাকে বলেছেন, তারা (মিয়ানমার) আমাদের সন্তানদের হত্যা করছে। ন্যূনতম হলেও, আমরা তো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ নিয়ে কথা বলছি। ম্যাথিউ স্মিথকে একজন রোহিঙ্গা বলেছেন, ‘আমার দুই ভাতিজার মাথা কেটে নিয়েছে তারা। তাদের একজনের বয়স ৬ বছর। অন্যজনের ৯ বছর’। অন্যরা বর্ণনা দিয়েছেন আরো ভয়াবহ সব কথা। তারা বলেছেন, কোল থেকে নবজাতকদের কেড়ে নিয়ে নদীতে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। শিরশ্ছেদ করেছে একজন প্রবীণ নারীর। সীমান্ত থেকে অসাধারণ নিউজ কাভার করছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে আমার সহকর্মী হান্নাহ বিচ। তিনি বলেছেন, আমি এর আগেও শরণার্থী সংকট নিয়ে রিপোর্ট কাভার করেছি। কিন্তু এ যাবৎ যত শরণার্থী সংকট দেখেছি তার মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ।
অং সান সুচি এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করছেন না (সেনাবাহিনীর ওপর তার আসলে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই)। অথবা এমন হতে পারে তারা সবাই এখন একপক্ষ হয়ে গেছেন। ২৫শে আগস্ট ৩০টি পুলিশ স্টেশন ও একটি সামরিক ঘাঁটিতে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিরা হামলা চালায়। এরপরই শুরু মানুষ বধ উৎসব। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা বেসামরিক মানুষের ওপর পৃথিবীর সর্বনিকৃষ্ট উপায়ে জবাব দেয়।
কয়েক শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু এই বধ উৎসবের সমালোচনা করলেন না অং সান সুচি। তিনি আন্তর্জাতিক সাহায্য দানকারী গ্রুপগুলোকে দায়ী করার পরিবর্তে বিশাল মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে ‘টেররিস্ট’দের সহায়তা করার অভিযোগ করেছেন। তিনি ‘টেররিস্ট’ বলতে সম্ভবত রোহিঙ্গাদের বুঝিয়েছেন।
যখন একজন রোহিঙ্গা নারী কিভাবে গুলি করে তার স্বামীকে হত্যা করেছে সেনাবাহিনী, কিভাবে তাকে ও তার তিন টিনেজ মেয়েকে গণধর্ষণ করেছে সেনারা সেই বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন অং সান সুচির ফেসবুক পেজে মশকরা করা হচ্ছিল। এই ধর্ষণকে ‘ফেক রেপ’ বা ধর্ষণের ভুয়া অভিযোগ বলে আখ্যায়িত করছিলেন।
একবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে সুচির সঙ্গে আমার আলোচনা হয়েছিল। তার ভিত্তিতে আমি মনে করি, তিনি খাঁটি অর্থেই বিশ্বাস করেন, তারা (রোহিঙ্গারা) বহিরাগত এবং বিভ্রাট সৃষ্টিকারী। অধিকন্তু, নৈতিক আদর্শের এই জায়ান্ট এখন পরিণত হয়েছেন রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষী- এবং তিনি জানেন যে, রোহিঙ্গাদের প্রতি কোনো রকম সহানুভূতি দেখালে তা হবে তার রাজনৈতিক দলের জন্য বিরাট এক বিপর্যয়। তার দেশ তো মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ঠদের প্রতি ভীষণভাবে শত্রুতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নির্বাহী পরিচালক কেন রোথ বলেছেন, অং সান সুচি যখন নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তখন আমরা তার ভীষণ প্রশংসা করেছিলাম। কারণ, তিনি ছিলেন স্বৈরশাসকদের মুখের ওপর সাহসের প্রতীক। কিন্তু তিনিই এখন ক্ষমতায়। ভয়ঙ্কয় নির্যাতনকারী যখন রোহিঙ্গা মন্থন করছে তখন তিনিই হয়ে উঠেছেন সেই কুকর্মের কাপুরুষোচিত প্রতীক।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আরেকজন হলেন আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু। তিনি তার বন্ধু (অং সান সুচি) কে বেদনাভরা একটি চিঠি লিখেছেন। তাতে তিনি লিখেছেন- ‘আমার প্রিয় বোন: যদি আপনার নীরবতা হয় মিয়ানমারের সর্বোচ্চ পদে আপনার রাজনৈতিক মূল্যবোধ, তাহলে তা অবশ্যই হবে আরো কষ্টসাধ্য।
বিদেশিদেরকে রোহিঙ্গাদের এলাকা থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে মিয়ানমার, কিন্তু গত কয়েক বছরে আমি সেখানে দু’বার যেতে সমর্থ হয়েছি। তখনও বন্দিশিবিরে অথবা প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন রোহিঙ্গারা। তাদের বেশির ভাগকেই স্বাস্থ্যসেবা থেকে সিস্টেমেটিক্যালি বঞ্চিত রাখা হয়। শিশুরা সরকারি স্কুলগুলোতে যেতে পারে না। এটা হলো একবিংশ শতাব্দীর বর্ণবাদ।
মিনুরা বেগম নামে ২৩ বছর বয়সী একজন নারীকে দেখেছিলাম আমি। তিনি তার শিশুকে হারিয়েছেন। কারণ, কোনো চিকিৎসক তার চিকিৎসা করেন নি। ১৫ বছর বয়সী একটি মেধাবী বালিকার সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম আমি। তার স্বপ্ন ছিল একজন ডাক্তার হওয়া। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। কারণ, তাকে বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে। দুই বছর বয়সী হিরোল নামের একটি শিশুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম আমি। চিকিৎসার অভাবে তার মা মারা গেছেন। এজন্য ওই শিশুটিকে অনাহারে থাকতে হচ্ছিল।
সুচি ও মিয়ানমারের অন্য কর্মকর্তারা ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান। তারা রোহিঙ্গাদের দেখে থাকে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে। কিন্তু তাদের এই ধারণাটি অযৌক্তিক (অ্যাবসার্ড)। ১৭৯৯ সালের দলিল পর্যন্ত বলছে, তখনও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
ওয়াশিংটনে অ্যারিজোনার রিপাবলিকান দলের সিনিয়র সিনেটর জন ম্যাককেইন, ইলিনয়ের ডেমোক্রেট ডিক ডারবিন এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে দ্বিপক্ষীয় একটি রেজুলেশন উত্থাপন করেছেন। এই রেজুলেশনের অধীনে অং সান সুচির প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে ওই সহিংসতা বন্ধে কাজ করতে। আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে কথা বলবেন।
আমরা জানি যে, মিয়ানমার সরকার চাপের মুখে সাড়া দেয়। কারণ, সেই চাপেই অং সান সুচি স্বাধীনতা পেয়েছেন। এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য খুব কমই কান্না করা হয়েছে। পোপ ফ্রাঁসিস বিশ্ব নেতাদের মধ্যে ব্যতিক্রমী হয়ে সাহস দেখিয়েছেন এবং রোহিঙ্গাদের হয়ে কথা বলেছেন। ইতিহাসের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো: একটি সম্ভাব্য গণহত্যা এড়ানোর মাধ্যমেই অত্যাচারীদের উৎসাহী করা যায়।
সুচির নোবেল পুরস্কার কেড়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে অনলাইনে পিটিশন করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ওই পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার কোনো মেকানিজম বা রীতি নেই। তবে আমি আশা করি, প্রাইজ মানি বা পুরস্কারের আর্থিক মূল্য ফেরত নেয়া যেতে পারে। সেই অর্থ দিয়ে তার তত্ত্বাবধানে যেসব বিধবা ও এতিম তৈরি হয়েছে তাদের খাবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
(নিকোলাস ডি ক্রিস্টফ যুক্তরাষ্ট্রের একজন সুপরিচিত সাংবাদিক। তিনি লেখকও। দু’বার পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিয়মিত কলাম লেখেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তার এ লেখাটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ আবুল হোসেন)

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

৭ই মার্চ কেন জাতীয় ঐতিহাসিক দিবস নয়

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ ও নিয়োগ প্রসঙ্গে

তিনি আছেন থাকবেন

বাতিল হওয়া ৪ লাখ বই উপজেলায়

কংগ্রেস সভাপতি হিসেবে রাহুল গান্ধীর নাম ঘোষণা

আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমানে সমান

সশস্ত্র বাহিনী দিবস আজ

বাংলাদেশে প্রথম এলপিজি আমদানির জাহাজ কিনলো বেক্সিমকো পেট্রোলিয়াম

সৌদি আরবে আটক ২৭৩ রোহিঙ্গা নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বন্ধু হাওয়ার্ড বি শেফার আর নেই

আওয়ামী লীগ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন চায়

এই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়

উল্টো পথে এমপি’র গাড়ি আটকের ছবি ভাইরাল

সশস্ত্র বাহিনী জাতির এক গর্বিত প্রতিষ্ঠান: খালেদা জিয়া

কেরানীগঞ্জে বিএনপি অফিসে পুলিশের তালা

সিলেটের টার্গেট ১৭০