কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ? (পর্ব-৫)

বিরোধী দল দমনের শ্রেষ্ঠ উপায়!

বই থেকে নেয়া

বিশেষ প্রতিনিধি | ৩১ আগস্ট ২০১৭, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:১১
বুয়েন্স আয়ার্সকে বলা হয়, প্যারিস অব সাউথ আমেরিকা। পম্পাসের সমৃদ্ধ কৃষি সম্পদের ভিত্তিতেই ইউরোপীয় ধাঁচে গড়ে উঠেছিল এই শহর। কিন্তু ১৫৮০ সালের আগে শহরটিতে বসতি স্থাপনকারীরা পুনরায় ফিরে আসেনি।
এভাবে বুয়েন্স আয়ার্সকে পরিত্যক্ত করা এবং পরে বুরানীদের দ্বারা সেটির বিজয় এই সত্যের প্রতি ইঙ্গিত দেয় যে, মার্কিনিরা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ শুরু করেছিল। স্পেন থেকে যারা সেখানে আদিতে গিয়েছিলেন, ইংলিশ উপনিবেশবাদীরা তাদের মতোই অনাবাদি জমি নিজেদের জন্য আবাদ করতে চাননি। তারা চেয়েছিলেন, অন্যেরা একাজ তাদের জন্য করে দেবেন। তবে তারা নিজেদের আরো ধনী করতে চেয়েছিলেন। লুটে নিতে চেয়েছিলেন, বুয়েন্স আয়ার্সের সোনা ও রৌপ্য।

পেরুর কাজামার্কা শহর থেকে
দ্যা সলিস, দ্যা মেন্দোজা এবং দ্যা আয়োলসের সমুদ্র অভিযানগুলো ঘটেছিল এমন একটি সময়ে যার কাছাকাছি সময়ে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের চোখের সীমায় একটি দ্বীপ ভেসে উঠতে দেখা গিয়েছিল। সেই দ্বীপ ছিল বাহামার দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। তারিখ ১২ই অক্টোবর ১৪৯২। আমেরিকায় স্পেনীয় সম্প্রসারণ এবং উপনিবেশবাদের সূচনা ঘটেছিল ১৫১৯ সালে, হারনান কোর্তেজ কর্তৃক মেক্সিকোর আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে। এর দেড় দশক পরে পেরুতে ফ্রান্সিসকো পিজারোর সমুদ্র অভিযান ঘটেছিল। এই ঘটনার মাত্র দুবছর পরে রিও দ্যা ল্যা প্লাতায় মি. পেদ্রো দে মেন্দোজার সমুদ্র অভিযানটি ঘটেছিল। এর পরবর্তী একশ বছরে স্পেন মধ্য আমেরিকা, পশ্চিম আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাংশ জয় করেছিল। আর ওই সময়ে ব্রাজিলের পূর্ব প্রান্ত দখলে নিয়েছিল পর্তুগাল।
স্পেনিশ উপনিবেশবাদের কৌশলগুলো ছিল অত্যন্ত কার্যকর। মেক্সিকোর কোর্তেজ হলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রথম দিকের সফল উপনিবেশবাদীদের অন্যতম। আর তার কৌশলের মূল ভিত্তি ছিল এটা বিবেচনায় নেয়া যে, বিরোধী দলকে পদানত করার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে, সবার আগে আদিবাসী নেতা পাকড়াও করা। এই কৌশল অবলম্বন করায় স্পেনিশদের পক্ষে আদিবাসী নেতাদের সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে বশ্যতা এবং খাদ্য আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এর পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল, আদিবাসী সমাজের চোখে দখলকারীদের শ্রদ্ধার আসনে বসানো। এবং ধীরে ধীরে তাদের জন্য বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থা, সামাজিক মর্যাদার হানি ঘটানো এবং বিশেষ করে জবরদস্তি শ্রমকে একটি প্রথা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য করার মতো ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো হয়।
১৫১৯ সালের ৮ই নভেম্বর যখন কোর্তেজ এবং তার লোকলস্কর অ্যাজটেকের রাজধানীতে পৌঁছালেন তখন তাদেরকে অ্যাজটেক সম্রাট মক্তেজুমা স্বাগত জানিয়েছিলেন। সম্রাটকে তার উপদেষ্টারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, স্পেনিশদের শান্তিপূর্ণভাবে স্বাগত জানানোটাই সঠিক হবে। এরপরে কি ঘটেছিল সে বিষয়ে সবচেয়ে ভালো সংকলন যিনি করেছেন; তিনি একজন প্ল্যান্সিসকান পাদ্রী। তিনি এর সংকলন করেছিলেন ১৫৪৫ সালের পরে। পাদ্রী বর্ণার দিনো দ্যা সাহাগুন তাঁর বিখ্যাত ফ্লোরেনতাইন সংকলন গ্রন্থে লিখেছেন, “যেইমাত্র স্পেনিশরা মক্তেজুমাকে তাদের করতলগত করতে পারলো, তখন তাদের প্রতিটি বন্দুক গর্জে উঠেছিল। ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেলো। অবস্থাটা এমনই সৃষ্টি হয়েছিল, যেন প্রতিটি মানুষ তাদের হৃদয় গিলে ফেলেছিলেন। যদিও চারদিকে একটা ভয়াল পরিবেশ ঘনীভূত হওয়ার আগেই সেখানে সন্ত্রাস ছিল। মানুষের চোখে ছিল বিস্ময়। ছিল তাদের দুচোখে শঙ্কা। কোনো কোনো ঘটনায় মানুষ ছিল হতভম্ব।
এবং এরকম সবকিছুই যখন তাদের জীবনে জাঁকিয়ে বসল, তখন স্পেনিশদের চাহিদার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করল। তাদের দরকার পড়ল, মুরগির রোস্ট, ডিম, সুপেয় পানি, জ্বালানি কাঠ আরো কত কি। এভাবেই মক্তেজুমা স্পেনিশদের চাহিদা পূরণের এক অনবদ্য হাতিয়ারে পরিণত হলেন।

অতঃপর স্পেনিশরা যখন তাদের আসন পাকাপোক্ত করতে সক্ষম  হলেন, তখন তারা সম্রাট মক্তেজুমার কোথায় কি আছে, সেসব তারা হন্যে হয়ে খুঁজতে শুরু করলেন। তাদের নজর এড়ালো না নগরীর প্রাকৃতিক সম্পদ থেকেও। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় তারা লুটতে শুরু করল স্বর্ণ। কিছুদিনের মধ্যে দেখা গেলো মক্তেজুমা শাসিত স্থানীয় বাসিন্দাদের চেয়ে তারা সবকিছুতেই এগিয়ে গেছেন। একদিন দেখা গেলো স্পেনিশরা স্টোর হাউজের সন্ধান পেলেন। সেই জায়গায়টির নাম তিওক্যালকো। স্টোর হাউজ থেকে তারা একে একে সব দামি দ্রব্যাদি লুফে নিল। তার মধ্যে ছিল অত্যন্ত দামি ও কারুকার্য খচিত নানা ধরনের অলঙ্কার ও ব্যবহার্য সামগ্রী। যেমন গোল্ডেন ডিস্ক, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট, দি গোল্ডেন লেক ব্যান্ডস, দি গোল্ডেন আর্মস ব্যান্ডস, দি গোল্ডেন ফোরহেডস ব্যান্ডস। তারা এ সময় আরো একটি কাণ্ড করলেন। ঐতিহ্যগত সব বস্তুগত (যেমন কোনো কাঠ) নিদর্শন থেকে সোনা আলাদা করলেন। এরপর বাকিসব জড়ো করে ধরিয়ে দিলেন আগুন। আর তাতে সব পুড়ে গেলো। তারা শহরময় চষে বেড়ালো। যেখানে যা কিছু বহনযোগ্য অথচ মূল্যবান পাওয়া গেলো তার সবটাই লুটে নিলো। সব শেষে তারা গেলেন যে স্থানটিতে সেটির নাম ততো ক্যালকো। এখানেই রাষ্ট্রের সব থেকে মূল্যবান জিনিসপত্রের তোষাখানা অবস্থিত। হিরা-জহরত, মণি-মুক্তার চোখ ধাঁধানো সব ঐতিহাসিক সংগ্রহ। একটি রাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত অহঙ্কারের যা কিছু থাকে তার সবটাই তারা লুটে নিয়েছিল।

অ্যাজটেক্সদের সামরিক বিজয় শেষ হয়েছিল ১৫২১ সালে। কোর্তেজ যখন নয়া স্পেন প্রদেশের গভর্ণর, তখন তিনি সব থেকে বেশি মূল্যবান সম্পদ ‘ভাগ কর ও শাসন কর’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করলেন। আর সবথেকে দামি সম্পদ ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তাদের মধ্যে যাতে বিভেদ ও হানাহানি সৃষ্টি হয়, এজন্য তিনি এনকোমিয়েন্দা নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেন। এনকোমিয়েন্দা প্রথম দেখা গিয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর স্পেনে। আর তখন স্পেনিশরা তাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বসতি স্থাপনকরী মুর এবং আরবদের উৎখাতে সংগ্রামরত ছিলেন। দক্ষিণ স্পেনে মুর এবং আরবরা অষ্টম শতাব্দীর শেষে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তবে দক্ষিণ স্পেনে স্পেনিশদের এই পুনঃবিজয়ের পর্বটি একটি ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি অবলোকন করেছিল। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে স্পেনিশদের কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল। আর ইতিহাসে এটাই এনকমেন্দরো হিসেবে খ্যাত। আদিবাসীদেরকে স্পেনিশদের কাছে নিজেদের মর্যাদা বিকিয়ে দিতে হয়েছিল। সস্তায় কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে দিতে হয়েছিল শ্রম। তবে এনকমেন্দরো পর্বটি যে কারণে বিশেষভাবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল, তার মূলে ছিল আদিবাসীদের জবরদস্তি খ্রিষ্টান ধর্মে দিক্ষিত করানো।

স্পেনের ইতিহাসে এনকমিয়েন্দা কি ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, তার সবথেকে জীবন্ত ও একেবারের গোড়ার দিকের বিবরণ যিনি আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন; তার নাম বার্তোলমি দ্যা লাস ক্যাসাস। তিনি একজন ডমিনিকান খ্রিষ্টীয় ভিক্ষু। তাঁর লেখায়, স্পেনিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার এক ভয়াল চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ১৫০২ সালে দ্যা লাস ক্যাসাস স্পেনিশ দ্বীপ হিস্পানিওলায় পৌঁছেছিলেন। তিনি এসেছিলেন একটি জাহাজ বহরে। যার নেতৃত্বে ছিলেন, নতুন গভর্নর নিকোলাস দ্যা ওবান্দো। মি. ক্যাসাস ক্রমবর্ধমানভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপরে স্পেনিশদের অন্যায় অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছেন। এসব প্রতিদিন দেখে তিনি যারপরনাই ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছেন। ১৫১৩ সালে স্পেনিশদের কিউবা বিজয়ের সময় তিনি একজন যাজক হিসেবেই অংশ নিয়েছিলেন। এবং তার দেয়া সার্ভিসের জন্য তাঁকে একটি খেতাবও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি দ্রুত তাঁকে দেওয়া এনকমিয়েন্দা সংক্রান্ত খেতাব বর্জন করেন। এবং স্পেনিশ ঔপনেবেশিকক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের জন্য এক দীর্ঘ ক্যাম্পেইনে অংশ নেন। তাঁর সমুদয় প্রচেষ্টা পরবর্তীকালে গ্রন্থিত হয়েছিল। ১৫৪২ সালে তার লেখা বই ‘অ্যা শর্ট অ্যাকাউন্ট ডেস্ট্রাকশন অব দ্য ইন্দিজ।’ তিনি সেই বইয়ে স্পেনিশ শাসনের বর্বরতার বিরুদ্ধে আক্রমণ চালান। নিকারাগুয়ায় ধর্মান্তকরণের ফল কি বয়ে এনেছিল, তাও তিনি সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন।     চলবে

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ এক সপ্তাহ স্থগিত

বাকেরগঞ্জে সাবেক এমপি মাসুদ রেজার ভাই গুলিবিদ্ধ

বিরাট-আনুশকার বিয়ে সম্পন্ন

কংগ্রেসের নতুন প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী

কলকাতায় ডিয়াগো ম্যারাডোনা, খেলবেন ফুটবল

আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো দল নেই: জয়

কুমিল্লাকে হারিয়ে রংপুর ফাইনালে

স্বর্ণের দাম কমেছে

‘আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে ছাত্রলীগ নেতাকে গুলি করি’

১৫টি পদের ১৪টিতেই আওয়ামীপন্থীদের জয়

ফি বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলনে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ

রাজধানীতে গলাকাটা লাশ উদ্ধার

অতিরিক্ত সচিব হলেন ১২৮ জন

ভুয়া ডাক্তারকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

এবি ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ ৪ জনকে দুদকে তলব