কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ? (পর্ব-৪)

যদিও তাঁদের রক্তের উত্তরাধিকার অভিন্ন

বই থেকে নেয়া

| ২৬ আগস্ট ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২৬
চার বছর আগে বইটি প্রকাশের পরই বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তুলেছিল। বইটির নাম কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ। ‘হোয়াই নেশনস ফেইল? দি অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রোসপারিটি অ্যান্ড প্রোভার্টি’। সেই পুরনো প্রশ্ন, মানুষ গরিব কেন? এটা তার নিয়তি নাকি অন্যকিছু? একই প্রশ্ন উঠেছে দেশ ও জাতির প্রশ্নে। কিছু দেশ ধনী, আর ধনী। তাদের টাকা-পয়সা, ধনদৌলত শুধু বাড়ে আর বাড়ে।
আর কিছু দেশ দরিদ্রই থেকে যায়। তার উন্নয়নের নামে কত রাজনীতি হয়, কিন্তু গরিবেরা গরিবই থেকে যায়। এটা কেন? কী তার কারণ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, বিশ্বখ্যাত দুই অর্থনীতিবিদ এসিমগলু এবং রবিনসন। তাদের নজর এড়ায়নি দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো।

(পর্ব-৪)
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, অ্যারিজোনার নোগালেসের বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষরা কারা ছিলেন, তারা কোথা থেকে এসেছেন, সেদিকে নজর দেবো? ইউরোপ থেকে আসা অভিবাসীদের নাতি-নাতনি হওয়ার কারণেও কি তারা একটি উন্নত জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পেরেছে। আর দক্ষিণের বাসিন্দারা কি অ্যাজটেক্সদের উত্তরসূরি? সেটা কিন্তু মোটেই নয়।
বরং সত্য এটাই সীমান্তের উভয় পাশের বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষরা একই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছেন। ১৮২১ সালে স্পেন থেকে মেক্সিকো স্বাধীনতা লাভ করে। মেক্সিকোর একটি এলাকার নাম ‘স্টেট অব ভেজা ক্যালিফোর্নিয়া’। ‘লজ ডোজ নোগালেস’ এই প্রশাসনিক এলাকারই একটি অংশ। ১৮৪৬-৪৮ সালে মেক্সিকো-আমেরিকা যুদ্ধের পরেও তার প্রশাসনিক মর্যাদার কোনো হেরফের ঘটেনি। তবে ১৮৫৩ সালে গ্যাডসডেন ক্রয়ের পরে এই এলাকায় মার্কিন সীমান্তের বিস্তৃতি ঘটে। লেফটেন্যান্ট এন. মিখলার এখানকার সীমান্ত অঞ্চলের জরিপ করেছিলেন। তিনি তার রিপোর্টে ‘লজ নোগালেসের অনিন্দ্য সুন্দর উপত্যকা’ সম্পর্কে একটি বর্ণনা দেন। আর সেই থেকেই সীমান্তের দুই পাশে দুটি শহর বেড়ে উঠতে শুরু করে। দুই শহরের মানুষের পূর্বপুরুষরা একই রক্তের উত্তরাধিকার বহন করেছে। তাদের খাবার অভিন্ন এবং এটা বলা আমাদের জন্য ঝামেলাপূর্ণ, কিন্তু তবুও বলব, উভয় শহরের ‘সংস্কৃতি’ অভিন্ন।
কিন্তু দুই শহরের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কোথায়, তার একটি সহজ ব্যাখ্যা নিশ্চয় আছে। আর সেটা যে আপনি অনুধাবন করতে পারছেন, সেই বিষয়ে আমরা নিঃসন্দেহ। আর সেটি হলো সীমান্ত। একটি সীমান্তরেখাই দুই শহরকে আলাদা করেছে সব দিক থেকে। অ্যারিজোনা অংশের মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার রয়েছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোয়। আমেরিকার মাটিতে থেকে তাদের প্রত্যেকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারেন। তারা স্কুলে যেতে পারেন। বাড়াতে পারেন কর্মদক্ষতা এবং তারা তাদের চাকুরেদাতাদের উৎসাহ যোগাতে পারেন, যাতে তারা প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। কারণ, তারা জানেন প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটলে তাদের বেতন স্ফীত হবে। একইসঙ্গে তারা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে অংশ নিতে পারেন। এর ফলে তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারেন। তারা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বসাতে পারেন। আবার অসদাচারণ করলে তারা ভোট দিয়ে তাদের সরাতেও পারেন। এর ফলে রাজনীতিকরা নাগরিকদের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে সদা জাগ্রত থাকেন। ভোটাররা যাতে বেজার না হন, সেজন্য তারা সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলেন। জনস্বাস্থ্য থেকে সড়ক এবং সড়ক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পর্যন্ত সবটাই তাদের খেয়ালে রাখতে হয়। মানুষ কী ভাবছে, সেদিকে তাদের নজরদারি না থাকলে তারা তাদের গদির টলানি টের পান।
কিন্তু সনোরার নোগালেসবাসীরা ততটা ভাগ্যবান নন। তারা একটি ভিন্ন জগতে বাস করেন। তাদের সেই জগত গড়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সেকারণে দুই শহরের মানুষেরা ভিন্ন ভিন্ন প্রণোদনা লাভ করেন তাদের চারপাশের চেনা জগত থেকে। উত্তরের ব্যবসায়ীরা যতটাই উদ্যমী, দক্ষিণের ব্যবসায়ীরা ততটাই হতোদ্যম। সুতরাং তারা মানুষ হিসেবে একই রক্ত-মাংসের হলেও তাদের চেনাজগত তাদের সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে, তারাও সেভাবে নিজেদের পরিচালিত  করেন। আর সেকারণেই উত্তরের অর্থনীতি একরকম, দক্ষিণের অর্থনীতি আরেকভাবে গড়ে উঠেছে।
প্রশ্ন হল কী কারণে আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে ব্যবসাবান্ধব হতে পারল, আর মেক্সিকো তথা গোটা দক্ষিণ আমেরিকায় সেটা হতে পারল না। এর উত্তর ঔপনিবেশিক আমলের গোড়ায় দুই সমাজ কীভাবে গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে নিহীত। সেই সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানগত বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব আজ পর্যন্ত চলমান রয়েছে। এই যে বৈচিত্র্য সেটা বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই উত্তর ও লাতিন আমেরিকায় কী করে উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল সেদিকে নজর দিতে হবে।
বুয়েন্স আয়ার্সের প্রতিষ্ঠা
জুয়ান দিয়াজ দ্য সেলিস পাল তুলেছিলেন ১৫১৬ সালের গোড়াতে। তিনি একজন স্পেনীয় নাবিক। তাঁর পূর্বমুখী যাত্রায় তিনি (সেলিস) স্পেনের জন্য যে ভূখ-ের সন্ধান পেয়েছিলেন, সেখানে তিনি নদীর নামকরণ করেছিলেন ‘রিভার অব সিলভার’। আদিতে এর নাম ছিল রিও দি লা প্লাতা। সিলভার নাম দিয়েছিলেন তার কারণ হলো স্থানীয় বাসিন্দরা নদী থেকে সিলভার কুড়াতেন। এসময় তিনি এর দুই পাশে যে আদিবাসীদের দেখা পেয়েছিলেন, তাদের ভূখ- ছিল আজকের উরুগুয়ে এবং আধুনিক আর্জেন্টিনার পম্পাস অঞ্চল। উভয় স্থানে নবাগতদের জন্য অপেক্ষা করেছিল বৈরিতা। এসব অঞ্চলের স্থানীয়রা ছিলেন শিকারি, যারা ছোট ছোট গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে বাস করতেন। তারা কোনো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অধীনে ছিলেন না। সোলিস তাঁর স্বদেশ স্পেনের জন্য নতুন ভূখ- অধিগ্রহণে উদ্যোগী হলে উরুগুয়ের একদল মানুষ তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেছিল।
১৫৩৪ সালে স্পেনীয়রা ওই ভূখ- অধিগ্রহণে পুনরায় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তারা সহজে হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না। পেদ্রো দ্য মেনদোজার নেতৃত্বে স্পেন একদল বসতিস্থাপনকারীকে সেখানে প্রেরণ করে। তারা একই বছরে বুয়েন্স আয়ার্সের দিকে একটি শহর গড়ে তোলে।  সেটা ইউরোপীয়দের জন্য একটি আদর্শ স্থান হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। বুয়েনস এয়ারসের আক্ষরিক অর্থ হলো সুবাতাস। শহরটির জলবায়ু ও তাপমাত্রা বসবাসের জন্য অনুকূল ছিল। তবে সেই সময়ে যেসব স্পেনীয় সেখানে গিয়েছিলেন, তারা বেশি দিন টেকেননি। তার কারণ তারা উত্তম আবহাওয়ার পরশ পেতে নয়, তারা গিয়েছিলেন সম্পদ আহরণের উদ্দেশ্যে। তারা জবরদস্তি শ্রমসুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চালায়। উরুগুয়ের মানুষেরা তাদের একদম সুনজরে দেখেনি। কুয়েরান্ডির লোকেরাও নয়। উভয় এলাকার মানুষ স্পেনীয়দের খাবার ও অন্যান্য রসদ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এমনকি তারা ধরা পড়ার পরেও শ্রম বিকোতে রাজি ছিল না। তারা তাদের তীর-ধনুক দিয়ে নবাগতদের ওপর আক্রমণ চালায়। স্পেনীয়রা দ্রুত খাদ্যাভাবে পড়ল। তারা ভাবতেই পারেনি যে, এমন অবস্থায় তাদের পড়তে হবে। তারা যে স্বপ্ন নিয়ে বুয়েন্স আয়ার্সে এসেছিলেন, তারা দেখলেন, সেই স্বপ্নের শহর এটা নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জবরদস্তি শ্রমে ভেড়ানো যাবে না। আবার ওই এলাকায় রৌপ্য বা স্বর্ণ কোনোটিই আহরণ করার নেই। আর তাদের নাবিক সোলিস যে রৌপ্যের সন্ধান পেয়েছিলেন, তা দেখা গেল সেটা ওই এলাকার  নয়, বরং তার উৎস হলো আরো পশ্চিমে আন্দিজের ইঙ্কা রাজ্যে অবস্থিত।
 স্পেনীয়রা তখন নতুন পথের সন্ধান শুরু করে। তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম চালানোর পাশাপাশি তারা নতুন নতুন সমুদ্র অভিযানে বের হয়। এর লক্ষ্য নতুন জায়গা খুঁজে বের করা, যেখানে অনাবিষ্কৃত সম্পদ রয়েছে। রয়েছে সস্তা শ্রম। ১৫৩৭ সালে এরকম একটি অভিযাত্রার নেতৃত্ব দেন জুয়ান দ্য আয়োলাস। তিনি ইনকা যাওয়ার পথে পারানা নদী খুঁজে পেয়েছিলেন। এই যাত্রায় তিনি গুরানি নামীয়  এক গোত্রের সন্ধান পান, যারা একটি কৃষি অর্থনীতি তৈরি করেছিল। এর ভিত্তি ছিল যব এবং কাসাভা (গ্রীষ্মম-লীয় উদ্ভিদ)। মি. আয়রাস দ্রুত বুঝতে পারলেন যে, উরুগুয়ে ও কুয়েরেন্দির চেয়ে এই জনগোষ্ঠী একেবারেই আলাদা। তাই তারা তাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন এবং তাদের সঙ্গে এক সংক্ষিপ্ত লড়াই শেষে সেখানে একটি নগর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আর সেই নগরটিই হল আজকের প্যারাগুয়ের রাজধানী।

(চলবে)

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

S.M Nazrul Islam

২০১৭-০৯-০১ ২০:২৮:২৪

ইউরোপীয়রা কখনো মানবিক সভ্যতার অধিকারী ছিলনা।ইতিহাসের সকল যুগে তারা ছিল খুনে,লুটেরা ও ধর্ষক এর দল। মনে রাখতে হবে মানবিক সভ্যতা মানবিক মুল্যবোধের উপর প্রতিস্টিত আর দানবিক সভ্যতা নীতি প্রধান নয় বরং তা যন্ত্রপ্রধান।

আপনার মতামত দিন

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় হাইকোর্টের রায় কাল

বরিশালে রানী এলিজাবেথের পুত্রবধূর একদিন

ইরান-সৌদি আরব বাকযুদ্ধ

বরখাস্ত তিনজন, তদন্ত কমিটি

‘শিগগিরই সুখবরটি শুনতে পাবেন’

যে রাস্তাগুলো বন্ধ থাকবে আজ

জেলা, উপজেলা, পৌরসভা এবং ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চূড়ান্ত

সমঝোতার পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাধার পাহাড়

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের দাবি

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি