কেন জাতিসমূহ ব্যর্থ-২

রাজনৈতিক অধিকার হরণ ছিল সবার মূলে

বই থেকে নেয়া

| ২২ আগস্ট ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:২৪
‘হোয়াই নেশনস ফেইল? দি অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রোসপারিটি অ্যান্ড প্রোভার্টি’। সেই পুরনো প্রশ্ন, মানুষ গরিব কেন? এটা তার নিয়তি নাকি অন্য কিছু?  একই প্রশ্ন উঠেছে দেশ ও জাতির প্রশ্নে। কিছু দেশ ধনী, আর ধনী। তাদের টাকা-পয়সা, ধনদৌলত শুধু বাড়ে আর বাড়ে। আর কিছু দেশ দরিদ্রই থেকে যায়। তার উন্নয়নের নামে কত রাজনীতি হয়, কিন্তু গরিবেরা গরিবই থেকে যায়।
এটা কেন? কি তার কারণ?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, বিশ্বখ্যাত দুই অর্থনীতিবিদ এসিমগলু এবং রবিনসন। তাদের নজর এড়ায়নি দক্ষিণ এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোও।

(পর্ব-২)

মিসরের দারিদ্র্য কি নির্মূলের অযোগ্য নাকি এটা দূর করা চলে? আমরা দেখব কি করে মিসরীয়রা নিজেদের সমস্যা নিয়ে ভাবছেন, কেন তারা হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন? কায়রোতে কর্মরত ২৪ বছর বয়সী হামেদ। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কর্মরত। এই ভদ্রমহিলা তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।
‘আমরা দুর্নীতি, নিপীড়ন এবং খারাপ শিক্ষার যাতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছিলাম। আমরা এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি যা দুর্নীতিগ্রস্ত।’ তাহিরির স্মৃতিচারণ করলেন মোসাব আল শামি। ২০ বছর বয়সী এই যুবা ফার্মেসির ছাত্র। ‘আমি আশা করি বছর শেষে আমরা একটি নির্বাচিত সরকার পাব এবং তাতে সার্বজনীন স্বাধীনতার নীতির প্রতিফলন ঘটবে। আর আমরা দুর্নীতির পাঁক থেকে মুক্তি পাব।’
তাহিরির স্কোয়ারের বিক্ষোভকারীরা একটি কণ্ঠে বিক্ষোভ করেছিলেন। আর তা হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে। সরকার যে জনগণকে তাদের পাবলিক সার্ভিস দিতে পারছিল না তার বিরুদ্ধে, সরকার যে সবার জন্য সমান সুবিধা দিতে পারছিল না, তার বিরুদ্ধে। তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে মুখ খুলেছিলেন। রাজনৈতিক অধিকার যে তাদের কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হয়েছিলেন।
২০১১ সালের ১৩ই জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিচালক আল বারাদি টুইটার বার্তায় লিখেছিলেন, ‘তিউনেসিয়া: নিপীড়ন+সামাজিক বিচারের অভাব=একটি টাইম বোমা। তিউনিসীয় ও মিসরীয় জনগণ দেখলেন তারা একটি সমস্যাকে অভিন্নভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছেন। তারা চিহ্নিত করতে পেরেছেন তাদের জীবনে কিসের অভিশাপ নেমে এসেছে। কেন তাদের সব থেকেও সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে? আর সেই কারণটি তারা সমস্বরে বলেছেন, আমরা অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছি। তার মৌলিক কারণ হলো সরকার আমাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করেছে। এক পর্যায়ে দেখা গেল প্রতিবাদকারীরা পদ্ধতিগত ভাবে প্রতিবাদ করতে শুরু করেছেন। ওয়ায়েল খলিলই হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি প্রথম বারো দফা দাবি পোস্ট করেছিলেন। খলিল একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং ব্লগার। যারা ভাবেন, পরিবর্তনের জন্য ডাক দিতে হলে তাকে পেশাদার রাজনীতিক হতে হবে, তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন খলিল। পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে হলে কোনো দলে আপনাকে অবশ্যই নাম লেখাতে হবে, বিশ্ব সেই সময় পার করে এসেছে। এখন ইন্টারনেটের যুগ। পল্টনের সমাবেশে বড় দলের মঞ্চে ভাষণ না দিলে আপনাকে কেউ চিনবে না, সেই যুগ বাসি হয়ে গেছে। এখন আছে সদা জাগ্রত ডিজিটাল মঞ্চ। খলিল কিন্তু ব্লগার হিসেবেই মিসরীয় গণআন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন। এই আন্দোলনের সবটারই ধরন ছিল একান্তভাবে রাজনৈতিক। ন্যূনতম মজুরির মতো কিছু ক্রান্তিকালীন দাবি ছিল, কিন্তু তা পরে বাস্তবায়ন করা হবে সেটাই সবার কাছে পরিষ্কার ছিল।
মিসরীয়দের যা পিছিয়ে রেখেছিল, তার মূল ছিল একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর রাষ্ট্র। হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনে সেখানে এমন একটি সমাজ গড়ে উঠেছিল, যেখানে মানুষ তাদের মেধা, অভিলাষ, উদ্ভাবনপটুতা এবং যে শিক্ষা তাদের প্রাপ্য ছিল তাতে ঘাটতি ছিল। একইসঙ্গে তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল যে, তাদের সমস্যার মূলে রাজনীতি। সব ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা, দৈনন্দিন জীবনে তারা যার মুখোমুখি হচ্ছিলেন, তার মূলে ছিল একটি বিশেষ অস্বাভাবিক অবস্থা। যেখানে একটি ক্ষুদ্র অভিজাত গোষ্ঠীর কাছে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে পড়েছিল। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন তথাকথিত স্থিতিশীলতার। তারা দোহাই দিচ্ছিলেন প্রলম্বিত শাসনের। উন্নয়ন ও স্থিতি দীর্ঘমেয়াদি চাও? তাহলে দীর্ঘমেয়াদি শাসন দাও। এই যে শাসকের মন্ত্র।
আর জনগণ তাই সহজেই শনাক্ত করতে পারেন যে, তাদের জীবনের নানা স্তরে জগদ্দল পাথরের মতো যা চেপে বসেছে তার মূলে রয়েছে রাজনীতি। আর তাই তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন। তারা সংকল্পবদ্ধ হলেন, এই ক্ষমতাপূজারী কোটারি গোষ্ঠীকে হটাতে হবে।
এভাবে তারা ঐক্যবদ্ধ হলেন যে, পরিবর্তন আনতেই হবে।
শুধু এই একটিই হয়ে উঠেছিল জনগণমন্ত্র। এমনটা কিন্তু মোটেই নয় যে, তাহিরির স্কোয়ারে যারা জড়ো হতে শুরু করেছিলেন, তারা আগে থেকে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। তারা বিপ্লবী মন্ত্রে উদ্দীপ্ত ছিলেন। তারা কমিউনিস্ট কি ইসলামি কোনো সংগঠিত দলের দ্বারা নির্দিষ্টভাবে প্রভাবিত ছিলেন না। তাদের কোনো সংগঠনগত পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। সবটাই ছিল মন ও মননে। কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ, যা অনেকের কাছে কোনো পরিবর্তন আনার জন্য পূর্বশর্ত মনে হয়, কারো মনে হয়, পরিবর্তনের জন্য কোনো একটি দলের আদর্শ দরকার, একটি দলের পতাকা কিংবা কোনো অভিজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার, তা কিন্তু মোটেই নয়, যারা সেদিন জড়ো হয়েছিলেন তারা ছিলেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তারা শুধু একটি বিষয় বুঝেছিলেন, পরিবর্তন একটা আনতে হবে। আর সেটা হলো রাজনৈতিক পরিবর্তন। এছাড়া তাদের মধ্যে অন্য কোনো ঐক্যসূত্র ছিল না। যখন জানতে চাওয়া হবে মিসর গরিব কেন, অন্যান্য জাতি এগিয়ে যায়, মিসর কেন থমকে থাকে, তখন কিন্তু এর উত্তরে কোনো একটি নির্দিষ্ট উত্তর মেলে না। অধিকাংশ শিক্ষাবিদ এবং ভাস্যকার ভিন্ন ভিন্ন মতামত দিয়ে থাকেন। কিছু লোক গুরুত্ব আরোপ করেন যে, মিসরের দারিদ্র্য প্রধানত তার ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা মূল্যায়িত হওয়া দরকার। এর কারণ দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখ- মরুভূমি, বৃষ্টিপাতের দারুণ অভাব, খরা লেগেই থাকে। তার মাটি ও জলবায়ু উৎপাদনশীল কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। অন্য অনেকে আবার মিসরের সংস্কৃতিগত কারণসমূহকেও বাধা হিসেবে দেখেন। তারা মনে করেন সংস্কৃতিই তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায়। অনেকের মতে মিসরের সংস্কৃতিগত ও কর্মগত নৈতিকতার মধ্যে আপনি এমন কিছু উপাদান দেখতে পাবেন, যা তাদের নিজেদের নয়, বরং অন্যদের সমৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করার কাজে লাগে। আবার অর্থনৈতিক ও নীতি প্রণয়ন বিষয়ক প-িতদের মধ্যে এই ধারণাও প্রবল যে, মিসরের শাসকরা আসলে জানেন না যে দেশটিকে কোন পথে টেকসই উন্নয়নের পথে নিতে হবে? অতীতে তারা ভুল নীতির দ্বারা দেশকে পরিচালিত হতে দিয়েছেন। এই শাসকরা যদি সঠিক ও উপযুক্ত উপদেষ্টাদের দ্বারা সঠিক উপদেশ পেতেন, তাহলে তারা দেশকে সমৃদ্ধি দিতে পারতেন। এই প-িতরা যুক্তি দিয়েছেন যে, এই শাসকদের তাঁবেদাররা দেশকে এমনভাবে চালিত করেছে, যেখানে গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য লাভ করেছে। একটি সেতু কি কালভার্ট তৈরি করা হবে, স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে ঠিকাদার বাছাই পর্যন্ত সবটাতেই বিবেচনা ছিল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। সমাজের বা বৃহত্তর জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এই গোষ্ঠীর কাছে সবসময় অগ্রাধিকার পেয়েছে সেই সব স্বার্থরক্ষা, অথচ তাদের কাছে দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের বিষয় সর্বদা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। চলবে

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ধুম পটাশ

২০১৭-০৮-২২ ০২:২০:১৪

বর্তমানে বাংলাদেশে গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য লাভ করেছে। একটি সেতু কি কালভার্ট তৈরি করা হবে, স্থান নির্বাচন থেকে শুরু করে ঠিকাদার বাছাই পর্যন্ত সবটাতেই বিবেচনা ছিল ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। সমাজের বা বৃহত্তর জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় নেয়া হয়নি। দুর্নীতি, ঘুষ লেনদেন, চোরাকারবারী, মজুতদারী, মানবপাচার, নিষিদ্ধ ড্রাগ ব্যাবসা, খুন, রাহাজানী ও ধর্শন এখন বাংলাদেশে নিত্য-নৈমত্মিক ঘটনা, অন্যসব স্বাভাবিক কর্মকান্ডের মতো এগুলো সব আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে অথচ আমরা প্রতিকারতো করছিইনা এমনকি প্রতিবাদ করতেও যেন ভূলে গিয়েছি । কিন্তু কেন ? কারন একটাই মৃতু্যভয় , এদেশে এখন প্রতিবাদ করলেই গুলি চলে, বাংলাদেশের পুলিশ এখন এদেশর জনগনের ভাগ্যবিধাতায় পরিনত হয়েছে ।

আপনার মতামত দিন

জিন্দাপার্ক নিয়ে দ্বন্ধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ৫

টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে আবার বিতর্কে ট্রাম্প

চট্টগ্রামে নারীঘটিত কারণে আইনজীবি খুন

‘নতুন বাকশাল দেখছি’

আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দুদের সম্পদ দখল করছে

মিশরে বিপুল সংখ্যক ‘হামলাকারী’ নিহত

বারাক ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

‘ভারত ও চীন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর নির্মাণে সহায়তা করবে’

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি