স্বপ্ন ছিল প্রকৌশলী হব

বই থেকে নেয়া

| ১৭ আগস্ট ২০১৭, বৃহস্পতিবার
ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল, বাবার মতো প্রকৌশলী হব। লেখাপড়ায় হাতেখড়ির আগে থেকেই প্রকৌশল-সংক্রান্ত যেসব ম্যাগাজিন বাবা নিয়মিত পড়তেন, সেগুলোর পাতা উল্টে উল্টে ছবি দেখতাম। সেসবের পাতায় পাতায় থাকত সুন্দর সুন্দর ভবন ও সেতুর ছবি।
সেই থেকে নির্মাণ সম্পর্কে আমার গভীর আগ্রহ জাগে। প্রকৌশলের কোন বিষয়ে আমি পড়ব, আজ থেকে প্রায় ৫৫ বছর আগে যখন প্রকৌশল কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে তার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই পুরকৌশল বেছে নিয়েছিলাম। কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হিসেবে আমাকে কাজ করতে হয়েছিল গবেষণা-প্রকল্পে। বিষয় ছিল আমাদের দেশে ভবন বা সেতুর উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত ইট বা খোয়ার গুণগত মান কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, কংক্রিটের শক্তি কীভাবে আরও বাড়ানো যায়।
প্রায় ৫০ বছর আগে যখন উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ হলো, তখনো স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য বিষয় হিসেবে বেছে নেই ‘অ্যাডভান্সড স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।
স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে গবেষণার বিষয় ছিল উচ্চশক্তির কংক্রিট। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন উঁচু ইমারতের নকশা ও নির্মাণ বিষয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। ইমারত-নকশায় কম্পিউটারের ব্যবহার তখন মাত্র শুরু হয়েছে। ১৯৬৫ সালে পিএইচডি গবেষণার বিষয় নির্বাচনের সময় এলে আমি উঁচু ইমারতের নকশায় কীভাবে কম্পিউটার ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে কাজ শুরু করি।
১৯৬৭ সালে আমার জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। আমি পড়ছিলাম ইংল্যান্ডের সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে উঁচু ইমারতের নকশা ও নির্মাণ বিষয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন হলো। বিশ্বের বিখ্যাত কাঠামো ও নির্মাণ-প্রকৌশলীরা সে সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে এলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই নাম ছিল ড. ফজলুর রহমান খান (এফ আর খান) আর লেসলি রবার্টসন। দুজনই তখন যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ তলার চেয়েও উঁচু ভবনের নকশা ও নির্মাণে নিয়োজিত ছিলেন। এফ আর খান তখন শিকাগোর ১০০ তলা জন হ্যানকক সেন্টার এবং লেসলি রবার্টসন নিউ ইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের (যে জোড়া ইমারতটি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর হামলার শিকার হয়ে ধসে পড়ে) নকশা ও নির্মাণের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা উঁচু ইমারত-সংক্রান্ত যে দুটি গবেষণাপত্র সে সম্মেলনে উপস্থাপন করেন, তাতে বিষয়টিতে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া তখন অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিখ্যাত অপেরা হাউসের ডিজাইনটি হচ্ছিল। তার প্রধান ডিজাইনার আর এস জেনকিন্স আমাদের স্নাতকোত্তর কোর্সে একজন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে এর নকশা ও নির্মাণ সমস্যার সমাধান কীভাবে করছেন, তা তুলে ধরেন। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে আমি গবেষণা করছিলাম, তিনি দীর্ঘ সেতুর নকশা-সংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। সে সময়ে সেটি ছিল নতুন এক নকশার সেতু। সেই সেতুর নকশার জন্য তিনি আমাকে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখতে বলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য যে চার বছর আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম, তাতে নির্মাণশিল্পের বিশেষ করে উঁচু ইমারত ও সেতুর নকশার সঙ্গে এভাবে আমার পরিচিতি।
এর মধ্যে আমি বায়ুচাপ বা ভূমিকম্পের ফলে উঁচু ইমারতে যে চাপ সৃষ্টি হয়, তা হিসাব করার একটি সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিখ্যাত জার্নালে সেটি প্রকাশিত হয়।
উচ্চশিক্ষা শেষ করে ১৯৬৮ সালে আমি দেশে ফিরে এসে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকে পাঠ্যবিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করি। মাঝখানে আসে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পরপর একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণ পাই। ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় কম খরচে কীভাবে টেকসই ঘরবাড়ি নির্মাণ করা যায়, সেটি বের করা ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। আমাদের দেশে একটি ভবন নির্মাণ করতে হলে বাতাসের বেগ কত নিতে হবে, তার কোনো নির্দেশনা তখন ছিল না। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে আমি বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় আবহাওয়া অফিস থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করি এবং তা বিশ্লেষণ করে ভবন-নকশায় বাতাসের বেগ কত নিতে হবে, তার জন্য সুপারিশমালা তৈরি করি। এছাড়া ফিলিপাইনে আমাদের প্রকল্পের সহকর্মীরা কয়েকটি মডেল বাড়ি তৈরি করে বিভিন্ন গতিতে বায়ুপ্রবাহের সময় কতটা চাপ সৃষ্টি হয়, যন্ত্রপাতির সাহায্যে সেটি নির্ণয় করে। এ প্রকল্পের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং পরে আমাদের দেশের বিল্ডিং কোড প্রণয়নে ব্যবহার করা হয়।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি যখন ঢাকায় প্রথম ১৫-২০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন এগুলোর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন প্রণয়ন বা পরীক্ষার জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের কাছে আসত। সেই সূত্রে ঢাকার ১৯৭০-এর ও ’৮০-র দশকের উল্লেখযোগ্য প্রায় সব উঁচু ইমারতের নকশার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে। এ ছাড়া অন্যান্য স্থাপনা, যেমন: উঁচু ট্রান্সমিশন টাওয়ার বা এয়ারক্রাফট হ্যাঙ্গারÑ এসবের নকশার সঙ্গে আমি সম্পৃক্ত হয়ে পড়ি।
যমুনা নদীর পশ্চিম পারে, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কীভাবে গ্যাস পাইপলাইন নেওয়া যায়, ১৯৮৩ সালের দিকে সরকার সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়। তার নকশা তৈরি করেছিল ইংল্যান্ডের একটি উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান। পেট্রোবাংলা আমাকে সে নকশা সম্পর্কে মতামত দিতে আমন্ত্রণ জানায়। আমি হিসাব করে দেখি, নদীর ওপর দিয়ে পাইপলাইন নেওয়ার জন্য যে কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সঙ্গে সামান্য অতিরিক্ত কিছু অর্থ বিনিয়োগ করলে একটি সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। তাহলে সেই সেতুর কাঠামো ব্যবহার করেই আমরা গ্যাস পাইপলাইন ও বিদ্যুৎ লাইন নিয়ে যেতে পারি।
১৯৮৫ সালে সরকার যমুনা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেয়। তখন দেশীয় বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেলকে আমার নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হয়। এই সেতু নকশার বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে সেতুর স্থান নির্বাচন এবং তাতে ভূমিকম্পের কম্পন কী পরিমাণে হতে পারেÑ তা নির্ধারণ করতে আমাদের দলটি কিছু সুপারিশ প্রণয়ন করে। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৯৮ সালে আমরা সেতুটির নির্মাণ শেষ করতে সক্ষম হই। এখানে উল্লেখ করা দরকার, যমুনার মতো এত চওড়া নদীকেÑ বন্যার সময় যা ১২ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েÑ শাসন করে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে আনা সম্ভব হয়েছে। এর জন্য প্রচুর সমীক্ষা করতে হয়। পৃথিবীতে এটাই এ ধরনের প্রথম সফল বাস্তবায়ন। যমুনা নদীতে সেতু করার সময় আমাদের লক্ষ্য ছিল, ভবিষ্যতে এ ধরনের সেতুর নকশা ও নির্মাণে বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের আরও বেশি বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
গত কয়েক বছরে পদ্মা নদীতে যে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানেও বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার আমাকে একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেয়। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের মধ্যেই আমরা সে নকশা চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়েছি। তবে ২০১২ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নানা বাধাবিপত্তিতে এর বাস্তবায়ন দুই বছর পিছিয়ে যায়।
আমাদের সৌভাগ্য, সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে সরকার এ প্রকল্পটি নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রকল্পটির বহু কাজ শুরু হয়ে গেছে। মূল সেতু নির্মাণ ও নদীশাসনের কাজ চলতি মাসেই শুরু হবে। ২০১৮ সালে এ প্রকল্প সম্পূর্ণ হবে বলে আশা করছি।
আমাদের প্রকৌশলীদের জন্য এ এক বড় চ্যালেঞ্জ। আমার বিশ্বাস, এ প্রকল্পে আমাদের প্রকৌশলীরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন, তা ব্যবহার করে আমরা আরও দীর্ঘ সেতু এবং বৃহৎ স্থাপনা নির্মাণ করতে সমর্থ হব। তবে তার জন্য দেশি প্রকৌশলীদের ওপর সরকারকে আস্থা রাখতে হবে। নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদারদের অর্থায়নের ব্যবস্থা করলে অচিরেই তাঁরা অন্যান্য দেশের প্রকল্পে কাজ করে বিদেশে বাংলাদেশি প্রকৌশলী ও দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হবেন।
একজন নির্মাণ-প্রকৌশলী হিসেবে আমার স্বপ্ন দেশীয় নির্মাণসামগ্রীর সর্বোচ্চ ব্যবহার করে এ দেশের কোটি কোটি লোককে স্বল্পব্যয়ে পরিবেশবান্ধব ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে সাহায্য করা, যা ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারবে। এ ছাড়া পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো দেশের বড় শহরগুলোকে বাসযোগ্য করে তোলাও আমার আরেকটি বড় স্বপ্ন।

* জামিলুর রেজা চৌধুরী : অগ্রগণ্য প্রকৌশলী। জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৪২, সিলেট।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য।

* সূত্র মতিউর রহমান সম্পাদিত ‘সফলদের স্বপ্নগাথা: বাংলাদেশের নায়কেরা’

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন