৮১ পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৩ আগস্ট ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩২
গত তিনদিনের অবিরাম বর্ষণ ও ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯০টি স্টেশনের ৮১টি পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় লাখ লাখ মানুষ। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে কমপক্ষে ৫০টি স্কুল। গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাসের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা এই তিন অববাহিকার পানি এক সঙ্গে বৃদ্ধি  পাওয়ায় উত্তরের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, গতকাল সকাল ৯টার মধ্যে নদ-নদীর ৯০টি সমতল স্টেশনের মধ্যে ১৭টি স্টেশনে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ৬টি স্টেশনের পানি হ্রাস পেয়েছে। ২টা পয়েন্টের পানি অপরিবর্তিত রয়েছে এবং একটি পয়েন্টের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনা অববাহিকায় মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকার ফলে বিগত ২-৩ দিনের মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে এই তিন নদীর ভারতীয় অংশে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ সেমি. ও বাংলাদেশ অংশে ৫৫ সেমি. গঙ্গা-পদ্মা নদীর ভারতীয় অংশে ১৬ সেমি. ও বাংলাদেশ অংশে ১৫ সেমি. এবং মেঘনা অববাহিকায় গড়ে ১ মিটার করে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার বাংলাদেশ অংশের বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ১১ সেমি. সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেমি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ১ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে। পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর ভারতীয় অংশে ৭০ সেমি. পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে জানানো হয়,  একই সময় তিন অববাহিকার পানি বৃদ্ধির ফলে উত্তরের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে বিস্তৃতি লাভ করতে পারে।
বিশেষ বুলেটিনে জানানো হয়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, পদ্মা ও গঙ্গা এবং সুরমা-কুশিয়ারা নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বৃদ্ধি আগামী ৭২ ঘণ্টায় অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানিও বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ২০৫ মিলি মিটার, দিনাজপুরে ১৮৭ মিলি মিটার, ডালিয়া পয়েন্টে ১৮৬ মিলি মিটার এবং ময়মনসিংহে ১৮২ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ সময় মনু নদীর মনু রেলওয়ে ব্রিজের পয়েন্টে ৩৬৮ সে.মি, খোয়াই নদীর বাল্লা পয়েন্টে ২২১ সে. মি, খোয়াই নদীর হবিগঞ্জ পয়েন্টে ৪৭০ সে.মি, ধলাই নদীর কমলগঞ্জ পয়েন্টে ২৭৮ সে.মি. এবং ভুগাই নদীর নাকুয়াগাঁও পয়েন্টে ৩২০ সে.মি পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকায় দ্বিতীয় পর্যায়ের বন্যা শুরু হয়েছে। এটি তিস্তা এবং ধরলা অববাহিকায়ও বিস্তার লাভ করতে পারে। এছাড়া ভারত থেকে আসা পানির কারণে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকাতেও বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।  
প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে দেখা যায়, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। রাত সাড়ে ১১টার দিকে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
দু’দিনের হালকা ও ভারি বর্ষণে দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডুবে গেছে, রাস্তা-ঘাট,পুকুর, জলাশয় ও ফসলি জমি। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পুনর্ভবা ও আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার বেশ কিছু এলাকায় পানি ঢুকে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ওইসব এলাকার মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
কুড়িগ্রামের উলিপুরে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ৩ দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ওই এলাকার ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৫২ চর প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩ হাজার পরিবারের ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে গোটা ইউনিয়ন তলিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ২০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ২ হাজার পরিবারের প্রায় ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন বিএসসি জানান, চর গুজিমারী, চর দাগারকুটি, বাবুরচর, গাবুরজান, নয়াডারা, শ্যামপুর, তাঁতিপাড়া, হাতিয়া ভবেশ, অনন্তপুরসহ নদ অববাহিকার বেশিরভাগ গ্রাম তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের ১ হাজার পরিবারের প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী অববাহিকার দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ প্রধান-প্রধান নদ-নদীতে পানি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। গতকাল বিকাল ৩টায় ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার  ৪৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। চর, দ্বীপচর ও নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। কুড়িগ্রাম সদরের হলোখানা, পাঁচগাছি, ভোগডাঙা, যাত্রাপুর, মোঘলবাসা, উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ, নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ, নুনখাওয়া ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা, ভাঙামোড় ও শিমুলবাড়ী ইউনিনের অনেক গ্রামে পানি ঢুকে ঘর-বাড়ি প্লাবিত হয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে লোকজন স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র, বাঁধ ও উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। অনেকে নৌকার অভাবে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারছেন না। প্রায় ৫০টি স্কুলে পানি ওঠায় পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। শত শত হেক্টর রোপা আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে।  ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৫০ হাজার মানুষ।
অন্যদিকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে গত দুই দিনে জয়পুরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলা শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানা গেছে গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ছোট যমুনা ও তুলশীগঙ্গা নদীর পানি উপচে প্রায় ৭শ’ হেক্টর জমির ধান ডুবে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সুধেন্দ্রনাথ রায় জানান, ২-১ দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে ধানের কোনো সমস্যা হবে না।
গত চারদিনের অবিরাম বর্ষণে রংপুরের কাউনিয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে উপজেলার প্রায় ৫০টি গ্রাম। এতে প্রায় আড়াই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় নিচু এলাকার রাস্তা ঘাট, আমন ক্ষেত, সবজি ক্ষেত এবং মৎস্য খামার পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে ওই এলাকায় গো খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।
বন্যার কারণে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় লাইনে চলাচলকারী শাটল ট্রেন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ঠাকুরগাঁও থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত রেল লাইনের উপর বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ায় একাধিক জায়গায় রেল লাইন ১ থেকে ৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া এবং কিছু গর্ত হওয়ার কারণে এ লাইনে ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। রেল লাইন থেকে বন্যার পানি অপসারিত হলেও লাইন সংস্কার শেষে এই রুটে পুনরায় ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা করা হবে।
গত দুইদিনের হালকা ও ভারি অবিরাম বর্ষণে দিনাজপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডুবে গেছে, রাস্তা-ঘাট, পুকুর, জলাশয় ও ফসলি জমি। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশংঙ্কা করা হচ্ছে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন জানান, পুনর্ভবা ও আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার বেশ কিছু এলাকায় পানি ঢুকে প্লাবিত হয়েছে। অন্যদিকে দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক সহিদুল ইসলাম জানান, এ মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে দু’দিনে। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে শনিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২১৬ দশমিক ১ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে দিনাজপুরে। এ পরিস্থিতি আরো দু’একদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তিনদিনের আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে। অন্যদিকে শনিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়া চিত্রের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়েছে, মৌসুমী বায়ুর বর্ধিতাংশের অক্ষ পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজ করছে।
 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন