পাহাড় কেটে বসতি হকার থেকে কোটিপতি মশিউর

বাংলারজমিন

আবদুল্লাহ আল ফারুক, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) থেকে | ১৩ আগস্ট ২০১৭, রবিবার
নারী ধর্ষণ, হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রসহ ২২ মামলার আসামি কাজী মশিউর রহমান সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরের আড়াই হাজার একর জায়গার অঘোষিত মালিক। তার রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। এই বাহিনী দিয়ে এলাকায় অবৈধভাবে সরকারি জায়গায় দখল ও পাহাড় কেটে বসতি তৈরি করে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে সে এখন কোটিপতি। ১৯৯৬ সালে খুলনা থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে আসেন কাজী মশিউর রহমান। ফেরিওয়ালা হিসেবে কাজ শুরু করে। এর বছর দুয়েকের মধ্যে চট্টগ্রাম হকার সমিতির সভাপতিও হন।
২০০৩ সালে সীতাকুণ্ড জঙ্গিল সলিমপুরের ত্রাস আক্কাস আলীর হাত ধরে জঙ্গিল ছলিমপুর পাহাড়ি এলাকার ছিন্নমূলে অবস্থান নেন। কিছুদিন পর সন্ত্রাসী আক্কাস আলী বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয়। পরে ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম কমিটির সভাপতি রোকন উদ্দিনের সঙ্গে কাজ করতে থাকে মশিউর। এর ফাঁকে আওয়ামী লীগেরযোগ দেয় কাজী মশিউর রহমান। বর্তমানে সে সলিমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বলে তিনি দাবি করেছেন। গড়ে তোলে তার সাম্রাজ্য। অল্প কয়েকদিনেই সরকারি পাহাড় দখল করে সেখানে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে বনে যায় কোটিপতি। বর্তমান চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন এলাকায় তার রয়েছে বিশাল বাড়ি। এছাড়াও জঙ্গল সলিমপুরেও রয়েছে কয়েকটি দালান বাড়ি। কিছুদিন আগে বিএনপি সমর্থিত রোকন উদ্দিনকে হটিয়ে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ দখলে নেন তিনি। সূত্র মতে, গত ২১শে জুলাই শুক্রবার সংঘটিত পাহাড় ধসে শিশুসহ পাঁচজন নিহতের ঘটনাও এখানকার অপরাধ সম্রাজ্যের লোকজন দ্বারা সৃষ্ট একটি ঘটনা মাত্র। রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এসব অপরাধ কর্মকান্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে মশিউর ও তার দলবল। পাহাড় বেচা টাকায় গত কয়েক বছরে দেশের নানা প্রান্তের সন্ত্রাসীদের অবায়শ্রম হিসেবে জঙ্গল সলিপুরকে গড়ে তুলেছে মশিউর। কিছুদিন আগে মশিউর চাঁদাবাজি মামলায় জেলে বন্দি থাকলেও এখন আবার বের হয়ে নিজের গড়া অপরাধ সম্রাজ্যের আধিপত্য গ্রহণ করেছে। বর্তমানে নিজের দুই বিশ্বস্ত সহযোগীকে নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা।  চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড ও নগরের বায়েজীদ থানার মধ্যবর্তী পাহাড়ি এলাকার নাম জঙ্গল সলিমপুর। যাতায়াত ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় এ এলাকায় সাধারণ মানুষদের যাতায়াত কম। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে গা ঢাকা দিতে মশিউর বাহিনীর শরণাপন্ন হয় সন্ত্রাসীরা। শেষতক নিজের দল ভারী করতে ওইসব সন্ত্রাসীদের ঠাঁয় দেয় সে। তাদের দিয়ে চলে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি, জবরদখলসহ সব রকম অপরাধ। গত ২১শে জুলাই শুক্রবার পাহাড় ধসের ঘটনায় টনক নড়ে প্রশাসনের। জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান থেকে শুরু করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এখানকার অপরাধ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন।  ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে অপরাধের স্বর্গরাজ্য আখ্যা দিয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের উপ-পরিদর্শক পদ মর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, এখানকার থানায় দায়িত্ব পালনকালে নগর ও জেলার অনেক সন্ত্রাসী এ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। কিন্তু স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী লোকজনের ছত্রছায়ায় থাকায় তাদের ধরা সহজ হয়নি। এদিকে ২০১৩ সালের ১০ই জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে একটি অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র‌্যাব। ওই অভিযানে দেশীয় তৈরি ৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৬ রাউন্ড গুলি ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে তারা। সংশ্লিষ্ট আরো জানা যায়, গত জুলাই মাসের প্রথম দিকে পুনর্গঠন করা হয় তাদের কমিটি। এতে সভাপতি হয় গাজী সাদেক ও সেক্রেটারি হয় মশিউর রহমান। আর এলাকা ছাড়তে হয় রোকন উদ্দিনকে। সাবেক সভাপতি রোকন উদ্দিন বলেন, ২০০৪ সালে পাহাড়ে বাগান এবং সমতলে বসবাস করব বলে সরকারের কাছে আবেদন করে বসবাস শুরু করি। তখন কোনো ধরনের পাহাড় কাটা হয়নি। ২০১০ সালের পরে মশিউরের নেতৃত্বে পাহাড় কাটা শুরু হয়। মশিউরের বিরুদ্ধে বায়েজিদ, হাটহাজারী, সীতাকুণ্ড, খুলশীসহ বিভিন্ন থানায় ২২টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে ৩ থেকে ৪টি হত্যা মামলা। তার অনুসারী ৩০ জন সন্ত্রাসী পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া তার সহযোগী গফুর মেম্বারের বিরুদ্ধে ৪ থেকে ৫টি মামলা রয়েছে।  ছলিমপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মো. গোলাম গফুর বলেন, আমার বিরুদ্ধে বায়েজিদ ও হাটহাজারী থানায় ৫টি মামলা ছিল। ৩টি মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে আর ২টি মামলায় জামিনে আছি। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি মামলায় তাদের ফাঁসানো হয়েছে দাবি করে চিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদের সাধারন সম্পাদক মশিউর রহমান বলেন, আমার বিরুদ্ধ ৭টি ধর্ষণসহ ১৯টি মামলা রয়েছে, এগুলো সব মিথ্যা মামলা। একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আমাদের বেকায়দায় ফেলার উদ্দেশ্যে এসব মামলা দায়ের করেছে। তিনি বলেন, এখানে যে পাহাড়গুলো কাটা হয়েছে তা ২০১০ সালের পূর্বে। মশিউর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অসংখ্য মামলা থেকে আলোচিত মামলার মধ্যে রয়েছে, ২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট নগরীর বায়েজীদ বোস্তামী থানার আরেফীন নগর এলাকায় হকার বেলাল হোসেনকে নির্মমভাবে খুন। ২০১১ সালে হাজেরা বেগম (২৩) নামে এক নারীকে রাতভর গণধর্ষণ। ২০১২ সালে সুমি আক্তার (১৯) নামে এক অসহায় গার্মেন্টস কর্মীকে পাহাড়ে নিয়ে গণধর্ষণ ও অবর্ণনীয় নির্যাতন। গত বছর ১১ই জুলাই মধ্যরাতে সীতাকুণ্ড উপজেলার ছলিমপুর ইউনিয়ন যুবদলের সহ-সভাপতি শাহাদাত হোসেন ছোটনকে তার ভাড়া বাসা থেকে মারতে মারতে অপহরণ করে নিয়ে যায় মশিউরের সহযোগীরা। এরপর তার আর খোঁজ মেলেনি। এ ঘটনায় মশিউরকে প্রধান আসামি করে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। তবে কয়েকটি মামলার বাদী আদালতে হাজির না থাকার কারণে মশিউর খারিজ হয়ে যায়। তবে মশিউর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার অধিকাংশ এখনো বহাল রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে আলোচিত কয়েকটি মামলার বাদিকে হুমকি-ধমকি দিয়ে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। বাকিদের কেউ কেউ রয়েছেন নিরুদ্দেশ। অপহৃত ছোটনের ছোট ভাই মোহাম্মদ মাসুদ জানান, অপহরণের পর স্থানীয় সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে অবশ্য মশিউরকে এজাহার থেকে বাদ দেয়ার শর্তে পুলিশ মামলা গ্রহণ করে। এরপর মাসুদ বাদী হয়ে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মশিউরকে প্রধান আসামি করে পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করে। মামলা দায়েরের পর থেকে অপহৃত ছোটনের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার তার চার সন্তান নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। মাসুদকেও মেরে ফেলার জন্যে মশিউরের লোকজন খুঁজছে। তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত রানা জবানবন্দিতে মশিউর ও আরমানের নির্দেশে তার ভাইকে হত্যা করা হয় বলে স্বীকার করে।
এদিকে গত রোববার চট্টগ্রাম ডিসি অফিসে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবিতে স্মারকলিপি দিতে গেলে সংগঠটির সভাপতি গাজী মো. সাদেকুর রহমানসহ ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে জেলা প্রশাসন। পরে তাদের সীতাকুণ্ড থানায় আনা হয়। ঐদিনই সীতাকুণ্ড ভাটিয়ার ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বাদী হয়ে আটকদের বিরুদ্ধে অবৈধ ভাবে সরকারি সম্পত্তি দখল, পাহাড় কাটার অভিযোগে মামলা করেন। তবে আটকরা বর্তমানে জেলহাজতে থাকলেও মূল হোতা মশিউর রহমান এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, মশিউরের বিরদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। স্থানীয় সাংসদ আলহাজ দিদারুল আলম বলেন, সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। যে দল ক্ষমতায় আসে তারা সে দলের লেভাস ধারণ করে। মশিউরসহ তার সহযোগীরা সরকারি পাহাড় কেটে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে তিনি জানান।


 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Equus asinus

২০১৭-০৮-১৩ ০৪:৩৯:০০

he re kew Pahar Padok 2017 dey na khereeee...!

আপনার মতামত দিন

মসজিদে গুলি ছোড়ার পর পাল্টে গেল এক মার্কিনীর জীবন

দৃশ্যপট একই

আয় বৈষম্য বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্ত

নকলা উপজেলা চেয়ারম্যানের লাশ উদ্ধার

রিভিউর প্রস্তুতি

বাংলাদেশির বীরত্বে ধর্ষকদের হাত থেকে রক্ষা পেলো ইতালীয় তরুণী

ঢাবিতে ‘ঘ’ ইউনিটের প্রশ্ন ফাঁস?

সিলেট টার্মিনালে গুলিবর্ষণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি

রোহিঙ্গা স্রোত থামছে না

বড় দুই দলেই প্রার্থীর ছড়াছড়ি

সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবেছে চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে নগরজুড়ে দুর্ভোগ

নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই

দিনে গড়ে দেড় হাজার মামলা

‘বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে’

পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে রোহিঙ্গাদের উপর আক্রমণ: মতিয়া চৌধুরী