টাকা পাচারের নয়া কৌশল

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৩ আগস্ট ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৪৯
 তারা সবাই মেধাবী। দেখতে স্মার্ট। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থী। বয়স ২২ থেকে ৩০ এর মধ্যে। কথা বলে ইংরেজি বাংলায়। কেউ কেউ অভিজাত ঘরের সন্তান।
চলাফেরা করেন রাজকীয় স্টাইলে। কারণ পকেটে অনেক টাকা আছে। তাদের পরিবারের টাকা খরচ করতে হয় না। নিজের আয় করা টাকা দিয়েই বিলাসী জীবন যাপন করে। রাত দিন তারা কাজ করে। রয়েছে দেশে-বিদেশে বড় নেটওয়ার্ক। তাদের আবিষ্কার করা পণ্যের বিজ্ঞাপনও আছে অনলাইনে। কিন্তু তারা জানে না তাদের কাজটা অবৈধ। সমপ্রতি ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফারের একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। যারা অবৈধ ভাবে বিদেশে পাচার করছে কোটি কোটি টাকা। উন্নত বিশ্বে চালু থাকলেও বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো ব্যাংক-মোবাইল কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই লেনদেন হয় বিপুল অর্থ। কারো বুঝার উপায় নাই কিভাবে পাচার হয় এতো টাকা। অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে তাদের কৌশল শুনে অবাক হয়েছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। কারণ এসব পাচার হওয়া অর্থের কোনো রেকর্ড কোথাও নাই। ভুয়া নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ও ই-মেইল ব্যবহার করে বিদেশে আবেদন করা হয় পাইওনিয়ার প্রিপেইড মাস্টার কার্ডের। দেখে বুঝার উপায় নাই এ সবই ভুয়া। আর ভুয়া থাকলেও কিছু যায় আসে না। কারণ দেশে বিদেশে যারা এই কাজ করছে তারা সবাই অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত। এসব বিষয়ে জানে না দেশের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলো। সকল তথ্য দিয়ে আবেদন করার ১৫ দিনের মাথায় চলে আসে কার্ড। এক দুটি নয় হাজার হাজার কার্ড আসছে প্রতি সপ্তাহে। সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব কার্ড যাদের নামে ইস্যু করা হয়েছে তাদের কোনো অস্তিত্ব নাই। তাদের ইচ্ছামতো নামে-বেনামে কার্ড তৈরি করা হয়েছে। কারণ সিন্ডিকেট নিজেরাই জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করছে। সেই সঙ্গে বেনামে ই-মেইল আইডিও খুলছে। সেখানে এমন কিছু নাম ব্যবহার করছে যা বাস্তবে কোনো মানুষের নাম হতে পারে না। ভুয়া ঠিকানা ও ব্যক্তির নামে আসা এসব কার্ড দেশে ডাক বিভাগের, ডাক বিতরণ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হাতে নিচ্ছে সেই সিন্ডিকেট। কার্ড হাতে আসার পর শুরু হয় অনলাইন বিজ্ঞাপন। এসব কার্ড পেতে মরিয়া হয়ে থাকে আরো কিছু ক্রেতা। ২৩ ডলার সমপরিমাণ বাংলাদেশি টাকা হলেই কার্ডটি কিনতে পারে যে কেউ। বিশেষ করে যারা দেশের বাইরে টাকা পাচার, ভ্রমণ, শপিং করতে যায় তারাই এই কার্ডের মূল ক্রেতা। শুধু কার্ড বিক্রি করেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। এই চক্রটি প্রথমে ভুয়া নাম-ঠিকানা দিয়ে অনলাইনে অ্যাকাউন্ট খুলে। তারপর অবৈধভাবে ডলার ক্রয় করে এবং পরে মুদ্রা পাচারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের অ্যাকাউন্টে ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর করে। এভাবে খুব সহজে মুদ্রা পাচারকারীরা দেশ থেকে বিদেশে পাচার করছে। তারা তাদের ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে বিদেশে অবস্থানরত পার্টনারদের ভুয়া অ্যাকাউন্টে খুব দ্রুত সময়ে আনলিমিটেড পরিমাণ মুদ্রা পাচার করছে অনলাইন প্লাটফর্ম মানি ট্র্যান্সফার ব্যবহার করে। এজন্য কে কতো টাকা দেশ থেকে পাঠালো তার কোনো হিসাব থাকছে না। কারণ এতে কোনো গ্রাহকের অনলাইন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লিঙ্ক থাকে না। বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের সঙ্গে সংযোগ না থাকার কারণে ট্রানজাকশন স্ট্রেটমেন্ট নেয়া যায় না। তারা অবৈধ ডলার কেনা বেচার জন্য স্কিরিল, পাইওনিয়ার, নেটেলার, ফার্স্ট চয়েজ, পেপাল, পায়জা, পারফেক্ট মানি, ওয়েব মানি, বিটকয়েন মাধ্যম ব্যবহার করে থাকে।
যেভাবে পাচার হয় টাকা: অবৈধ ডলার কেনাবেচার জন্য অ্যাকাউন্ট তৈরির জন্য তারা ভুয়া নাম, ঠিকানা, পরিচয় পত্র ও অন্যান্য তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট আবেদন করে। এরপর অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে তা সচল করে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা ঐ অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে ক্রয়-বিক্রয় শুরু করে। এরপর অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়ে মুদ্রা পাচারকারীদের কাছে ডলার ক্রয়-বিক্রয় করে। আর এসব কাজ করে থাকে আরো কিছু অসৎ ব্যক্তি। তারা প্রিপেইড মাস্টার কার্ডে মুদ্রা পাচারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রা লোড বা রিচার্জ করে দিচ্ছে। মুদ্রা পাচারকারীরা এই মাস্টার কার্ড ব্যবহার করতে বেশ আগ্রহী থাকেন। কারণ এতে তাদের পরিচয় গোপন থাকে। ফলে তাকে কোনোভাবেই ট্র্যাক করা যায় না। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডির) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার রায়হান উদ্দিন খান বলেন, অর্থ পাচারের এই নয়া কৌশল বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নতুন। এটি একটি ভয়ংকর সিস্টেম। যার মাধ্যমে মিনিটেই পাচার করা যাচ্ছে আনলিমিটেড টাকা। চোখের সামনে তারা এই কাজগুলো করে থাকলেও কোনো ভাবে বুঝার উপায় নাই।
সিআইডি কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির যন্ত্র, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, স্কেনার। এসব মেশিন দিয়েই তারা তাদের কর্মকাণ্ডে প্রয়োজনীয় সব কিছু তৈরি করে। এই চক্রের মূল হোতা রিয়াজুল ইসলাম ইমরান। সে ঢাকা কলেজের পরিসংখ্যান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার সহযোগী হিসাবে ছিলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শেষ বর্ষের ছাত্র আসকার ইবনে ইসহাক শাকিল, সরকারি তিতুমির কলেজ থেকে মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করা মেহেদি হাসান, ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী জহিরুল হক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হায়দার হোসেন। তাদের সবাইকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। গত এক বছর ধরে তারা অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। এ বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, এই চক্রের সঙ্গে বিদেশের একটি চক্র জড়িত আছে। আমরা তাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছি। কারণ এই সিন্ডিকেটরা বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই এই লেনদেন করছে। সুতরাং তারা অবৈধভাবে এই কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া ডাক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা বিদেশ থেকে আসা কার্ড টাকার বিনিময়ে সিন্ডিকেটের কাছে তুলে দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ওআইসি’র ঘোষণা নেতানিয়াহু’র প্রত্যাখ্যান

প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরেছেন

ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা

গাজীপুরে মসজিদের ভেতর নৈশ প্রহরীকে গলা কেটে হত্যা

‘প্রেম’ করে বিয়ে, চাকরি হারালেন শিক্ষক দম্পতি

চবি শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির সত্যতা মিলেছে

প্রশ্ন ফাঁস হতো প্রেস থেকে

আবাসিক এলাকায় রাতে হর্ন বাজানোয় নিষেধাজ্ঞা

‘বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনে বাধা নেই’

কুয়ালালামপুরে গ্রেপ্তার ২ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা

জামিনে আপন জুয়েলার্সের তিন মালিক

নারী সহশিল্পীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয় আমাকে

বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক নিষিদ্ধ করার আবেদন প্রত্যাখ্যাত ইন্দোনেশিয়ায়

প্রথম ১ মাসে ৬৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে মিয়ানমার, বাংলাদেশ সফরের আহ্বান

৪ সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় ভূমিমন্ত্রীপুত্র কারাগারে