টানা বর্ষণে ফের বন্যা

বাংলারজমিন

| ১৩ আগস্ট ২০১৭, রবিবার
সিলেটের ৪ উপজেলা প্লাবিত
স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে: উজানের পাহাড়ি ঢলে সিলেটের সীমান্তবর্তী ৪ উপজেলার নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন মানুষ। প্লাবিত উপজেলাগুলো হচ্ছে- কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কানাইঘাট। বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ওই উপজেলাগুলোতে বন্যার আরো অবনতি আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। পাউবো জানায়- শনিবার বিকাল তিনটায় কানাইঘাটে সুরমা নদী বিপদসীমার ১১৬ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমা নদী বিপদসীমার ১৬ সেন্টিমিটার এবং শেওলায় কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্ত মো. মোফজেলুর রহমান মজুমদার। বন্যার কারণে দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, জাফলং ও লোভাছড়া পাথর কোয়ারিতে বন্ধ রয়েছে পাথর উত্তোলন কার্যক্রম। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন এর সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমিক। পাহাড়ি ঢলের কারণে সীমান্ত নদী পিয়াইন ও সারি নদীর পানি উপচে গোয়াইনঘাট উপজেলার বেশির ভাগ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে সালুটিকর-গোয়াইনঘাট এবং সারি-গোয়াইনঘাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ কারণে সিলেট জেলা সদরের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পানি উঠে যাওয়ায় শনিবার বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধ ছিল। এছাড়া সারি, বড়গাং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় জৈন্তাপুরের নিচু গ্রামগুলোরও পানিতে তলিয়ে গেছে। তাছাড়া নদীগুলোর পানি বেড়ে যাওয়ায় হাওরাঞ্চলে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার দরবস্ত ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের বিশটি গ্রাম পানিতে প্লাবিত হয়েছে। কানাইঘাটে বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে বিপদ সীমার ১১৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার লোভা পাথর কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়- গতকাল সকাল ৬টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সিলেটে ১১৭ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জে ২৮৫ স্কুল বন্ধ, পরীক্ষা স্থগিত
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অবিরাম বর্ষণে সুনামগঞ্জে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি বাড়ছে সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ ও ছাতক উপজেলায়। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সাহেব বাড়ি ঘাট, পশ্চিম বাজার, মাছ বাজার, নবী নগর এলাকার রাস্তাঘাটে পানি উঠেছে। পানি বাড়ায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক ভেঙ্গে গেছে। ব্যাহত হচ্ছে যাতায়াত ব্যবস্থা। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ পৌরসভা পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় জেলার সবকটি হাওরের পানি ক্রমশ বাড়ছে। স্কুল ও স্কুল সংলগ্ন এলাকায় বন্যার পানি প্রবেশ করায় শনি ও রোববার দু’দিন সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, ধর্মপাশা, দিরাই উপজেলার ২৮৫টি স্কুল বন্ধ ও সবকয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এ সব স্কুলের প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, আরো কয়েকদিন ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল সর্বশেষ বৃষ্টিপাত ২০৫ মিলিমিটার রেকর্ড করা হয়েছে।
শ্রীমঙ্গলে দেয়ালচাপায় শিশুর মৃত্যু
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: অবিরাম বর্ষণের মধ্যে মাটির দেয়াল ধসে নাহিদা আক্তার নামে আট বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এ সময় গুরুতর আহত হয়েছেন তার ৪ বছর বয়সী অপর বোন নাঈমা আক্তার ও মা আমিনা বেগম (৩৫)। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের উত্তর পাচাউন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নাহিদা আক্তার (৮) উত্তর পাচাউন গ্রামের দিনমজুর আবদুল মালিকের কন্যা। স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. লুৎফুর রহমান বলেন, আবদুল মালিক একজন দিনমজুর। তার কোনো জমিজমা নেই। অন্যের জমিতে বেড়া দিয়ে ঘর বানিয়ে বসবাস করে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও ১২ বছরের এক ছেলেকে নিয়ে আলাল মিয়া ভাত খাচ্ছিলেন। অবিরাম বর্ষণের মধ্যে হঠাৎ পাশের ঘরের মাটির দেয়াল ধসে আবদুল মালিকের ঘরের উপরে পড়লে তার দুই মেয়ে মাটি চাপা পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের লোকজন মাটি সরিয়ে আবদুল মালিকের মেয়ে নাহিদা আক্তার ও নাঈমা আক্তারকে (৪) উদ্ধার করেন। পরে তাদের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাহিদাকে মৃত ঘোষণা করেন। মালিকের অপর মেয়ে আহত নাঈমা আক্তার কোমরে ও বাম পায়ে আঘাত পায়। আম মেয়েটির মা আমিনা কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা পান। এদিকে মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান চৌধুরী জানান, গতকাল সকালে উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ১৫ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
ডিমলায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি: উজানের ঢল ও গত চার দিনের টানা বর্ষণের ফলে নীলফামারীর ডিমলাসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে শত শত একর রোপা আমনের ফসল হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে রয়েছে। বন্যার কারণে মৎস্যচাষিদের মাছ বের হওয়ার ফলে মাথায় হাত পড়েছে। তিস্তার পাশাপাশি বুড়ি তিস্তা, কুমলাই ও নাউতরা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে নদীর দু’পাশের বসবাসরত শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে আবার বৃদ্ধি পেয়েছে। শনিবার সকাল ৬টা হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টের তিস্তা ব্যারাজে নদীর পানি বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর (বিপদসীমার ৫২ দশমিক ৪০ মিটার) দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাউবোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রে সূত্রে জানায়, গত ৪ দিনে বৃষ্টি হয়েছে ৬৪০ মিলিমিটার। গত বুধবার ১৫৮ মিলি, বৃহস্পতিবার ১৬৪ মিলি, শুক্রবার ১৩২ মিলিমিটার ও শনিবার ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে এলাকায় মৎস্যচাষিদের মাথায় হাত পড়েছে। গ্রামের লোকলয়ে রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। বাড়িঘর তলিয়ে রয়েছে কোমর পানিতে। ছোটখাতা কুমলাই মৎস্য খামার চাষি সমবায় সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে তার সমিতির ৪শ একর পুকুরের ৫ লক্ষাধিক টাকার মাছ বের হয়ে গেছে। ঝুনাগাছ চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, টানা বর্ষণের কারণে তার পুকুরের ২ লক্ষাধিক টাকা মাছ বের হয়ে গেছে। উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণের টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব খড়িবাড়ী গ্রামের শতাধিক একর রোপা আমন ক্ষেত হাঁটু পানিতে তলিয়ে গেছে। শনিবার নতুন করে ১৭টি পরিবারের বসতভিটা ভেঙে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পূর্ব খড়িবাড়ী গ্রামের মাটির বাঁধটি বিলীন হওয়ার ইতিমধ্যে ৫০ বিঘা জমির ফসল ও ২২টি পরিবারের বসতভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব খড়িবাড়ীতে তিস্তার নদীর ডাঁনতীরে তৈরি করা ২ কিলোমিটার মাটির বাঁধটি ইতিমধ্যে ৫শ মিটার নদীতে বিলীন হয়ে গ্রামটিতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ২০১৫ সালে ইউএনডিপির অর্থায়নে, সিডিএমপি বাস্তবায়নে ইউনিয়ন পরিষদ বাঁধ কাম ১ হাজার ৯৮২ মিটার দীর্ঘ রাস্তাটি মেরামত করা হয়। বাঁধটি নির্মাণ ফলে পূর্ব খড়িবাড়ী, দক্ষিণ খড়িবাড়ী, ছোটখাতা গ্রামের সহস্রাধিক পরিবারের বসতভিটায় বন্যার পানি প্রবেশ করতে পারেনি। কিন্তু বাঁধটি গত শুক্রবার ভেঙে পড়ায় সহস্রাধিক পরিবার বন্যার কবলে পড়েছে। এলাকাবাসী জরুরি ভিত্তিতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি বন্যার কবল হতে রক্ষাসহ দীর্ঘস্থায়ী করতে বাঁধটি সিসি ব্লক দিয়ে পিচিং করার দাবি তোলেন। টেপাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীন জানায়, বাঁধটি ভেঙে লোকলয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। শতাধিক পরিবারের বসতবাড়িতে হাঁটু পানিতে তলিয়ে রলশা চাপানি ইউপি চেয়ারম্যান আতাউর রহমান বলেন ছোটখাতা ও বাইশপুকুর গ্রামের শতাধিক পরিবারের বন্যার পানিতে তলিয়ে রয়েছে। পূর্ব ছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ খান বলেন, তিস্তার উজানে ঝাড়সিংহেশ্বর গ্রামে ন্যার পানি প্রবেশ করার এলাকায় বোরো ক্ষেত গত ৩ দিন থেকে তলিয়ে রয়েছে। পশ্চিম ছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার ইউনিয়নের ১ ও ৪নং ওয়ার্ডের দুটি বন্যা রক্ষা বাঁধ ভেঙে গিয়ে ৬টি গ্রামের ১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শনিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম এলাকাটি পরিদর্শন ও বানভাসিদের খোঁজখবর নেন।
অপরদিকে বুড়ি তিস্তা, নাউনতরা ও কুমলাই নদীর পানি বৃষ্টির কারনে রোপা আমনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নাউতরা ইউনিয়নের নাউতরা নদীর বাঁশের সাঁকো ভেঙে পড়ার এলাকাবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। নাউতরা ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম লেলিন বলেন, জরুরি ভিত্তিতে চলাচলের জন্য নৌকা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া পানি নিস্কাসনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ডিমলা সদরের পশ্চিম পাড়া, পূর্বপাড়া, শিংপাড়ার প্রায় ৬ শতাধিক পরিবার কোমর পানিতে তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এসব এলাকা পরিদর্শন ও বন্যার্তদের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন, নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আফতাব উদ্দিন সরকার, নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহিনুর আলম ও ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম। এছাড়া সংসদ সদস্য বন্যার্তদের পাশে থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান বলেন, তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে শনিবার সকাল ৬টা হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এছাড়া শনিবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে পানির নিচে ফসলি জমি
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: টানা তিন দিনের বর্ষণে ঠাকুরগাঁওয়ে ৫ উপজেলার ২০টি গ্রাম ও সহস্রাধিক হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে ডুবে গেছে। সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে সদর উপজেলার টাঙ্গননদীর পাড়ে অবস্থিত জমিদারপাড়া, ডিসিবস্তী, জলেশ্বরী তলা, এসিল্যান্ডবস্তী, মুজিবনগড়, শুকানপুকুরী ইউনিয়নের ৪টি গ্রাম। এছাড়াও বালিয়াডাঙ্গীর আমজানখোর, ধনতলা ও বড় বাড়ি ইউনিয়েনের ১২টি গ্রাম, পীরগঞ্জ উপজেলার ৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। মধ্যরাত থেকেই পানিবন্দি মানুষ ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরতে শুরু করে। আর কোথাও দুর্গতরা ক্ষতির শিকার হয়ে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছে। কৃষি বিভাগ বলছে, সদর উপজেলায় শনিবার সকাল পর্যন্ত ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আর জেলায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে ১৬০ মিলিমিটার। এদিকে ৭শ’ হেক্টর আবাদি জমি পানির নিচে ডুবে গেছে দাবি কৃষি বিভাগের। এদিকে ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় রেলপথের নয়ন ব্রিজ এলাকায় ২ কিলোমিটার রেলপথ ডুবে যাওয়ায় ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন পানিবন্দিদের আশ্রয়ে ৮টি কেন্দ্র খুলে দিয়েছে। জেলা প্রশাসক আবদুল আওয়াল বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্র আনা হচ্ছে। পর্যপ্ত ত্রাণ সহায়তা রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার উপরে
শায়েস্তাগঞ্জ প্রতিনিধি: অবিরাম বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি ও উজান থেকে পানি নেমে আসার ফলে খোয়াই নদীতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানায় পানি উন্নয়ন বোর্ড। খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় শায়েস্তাগঞ্জ পৌর এলাকাসহ শহরের লোকজনের মাঝে আবারো আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধির খবর শুনে নবাগত জেলা প্রশাসক মনীষ চাকমা, স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক শফিউল আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এমরান হোসেন, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম আজহারুল ইসলাম, হবিগঞ্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক, সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী মোহাম্মদ ফরিয়াদ, দৈনিক জনকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি রফিকুল হাসান চৌধুরী তুহিনসহ নেতৃবৃন্দ খোয়াই নদীর বাঁধ পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসক মনীষ চাকমার নেতৃত্বে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, সাবেক পৌর চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য শহীদ উদ্দিন চৌধুরী ও কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ফজলুর রহমান। সভায় জেলা প্রশাসক পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, বাঁধের যে সমস্ত স্থানে ভাঙার সম্ভাবনা রয়েছে সে স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে বালির বস্তা এবং লোকজন সার্বক্ষণিক রাখতে হবে। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তাওহিদুল ইসলাম জানান, রাত ১১টা পর্যন্ত খোয়াই নদীর পানি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতের খোয়াই অংশে পানি কমতে থাকার কারণে আশাকরি গতকাল সকালে কমতে পারে।
দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর থেকে: দু’দিনের হালকা ও ভারি বর্ষণে দিনাজপুরে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ডুবে গেছে, রাস্তা-ঘাট, পুকুর, জলাশয় ও ফসলি জমি। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পুনর্ভবা ও আত্রাই নদীর পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার বেশ কিছু এলাকায় পানি ঢুকে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ওইসব এলাকার মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের লোকজন গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে পড়েছেন মহাবিপাকে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন। তিনি জানান, জেলার প্রধান নদী আত্রাই ৩৯ দশমিক ৬০ সেন্টিমিটার বিপদসীমা। বর্তমানে ৩৯ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পুনর্ভবা নদী ৩৩ দশমিক ৫০ সেন্টিমিটার বিপদসীমা। সেখানে বর্তমানে ৩২ দশমিক ১ সেন্টিমিটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বলেন, অন্যান্য নদীর পানিও পর্যবেক্ষণ চলছে। নদীগুলোর পানি আরো বাড়তে পারে বলেও তিনি জানিয়েছেন। এদিকে দিনাজপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যবেক্ষক সহিদুল ইসলাম জানান, এ মৌসুমে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে দু’দিনে। শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২১৬ দশমিক ১ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে দিনাজপুরে। এ পরিস্থিতি আরো দু’একদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান। দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, অবিরাম বৃষ্টিপাতে দিনাজপুরে প্রায় নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি ডুবে গেছে।
উলিপুরে পানিবন্দি ১০ হাজার পরিবার
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) থেকে: উলিপুরে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ৩ দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রহ্মপুত্র নদ অববাহিকার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৫২ চর প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩ হাজার পরিবারের ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে গোটা ইউনিয়ন তলিয়ে যেতে পারে বলে ঐ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিক মণ্ডল জানান। বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার ২০টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ২ হাজার পরিবারের প্রায় ১২ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএম আবুল হোসেন বিএসসি জানান, চর গুজিমারী, চর দাগারকুটি, বাবুরচর, গাবুরজান, নয়াডারা, শ্যামপুর, তাঁতিপাড়া, হাতিয়া ভবেশ, অনন্তপুরসহ নদ অববাহিকার বেশিরভাগ গ্রাম তলিয়ে গেছে। এসব গ্রামের ১ হাজার পরিবারের প্রায় ৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অপরদিকে, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদী অববাহিকার দলদলিয়া, থেতরাই, গুনাইগাছ ও বজরা ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দলদলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান মুন্সি জানান, চররতিদেব, চরঘাটিয়ালপাড়া, কর্পূরাখাস, চর অর্জুন, অর্জুন, লালজুম্মা, চাপড়ারপাড়, রেডক্রস, বসনিয়াপাড়া গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১২শ’ পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। গুনাইগাছ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খোকা জানান, টিটমা, কাজিরচক, সন্তোষ অভিরাম, শুকদেবকুণ্ড, রাজবল্লগ্রামের প্রায় ১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। থেতরাই ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, জুয়ানসতরা, খারিজালাটশালা, চরগোড়াইপিয়ার, রামনিয়াশা, চর গোড়াইপিয়ার মধ্যচর, চর হোকডাঙ্গা গ্রামের প্রায় ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বজরা ইউনিয়নের সাদুয়াদামার হাট, বিরহিমচর, পূর্ববজরা, চর বজরা, চাদনীবজরা গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
এসব এলাকায় গো-খাদ্য সংকট দেখা দেয়ায় পানিবন্দি মানুষজন তাদের গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছে। অবিরাম বর্ষণের কারণে বাড়ি থেকে প্রয়োজনের বাইরে কেউ বের হতে পারছে না। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, বন্যা মোকাবেলায় সব রকম প্রস্তুতি রয়েছে।


 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন