অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনে সরকারের অনুমতি লাগবে

শেষের পাতা

বিশেষ প্রতিনিধি | ১৮ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০২
সরকারের অনুমতি ছাড়া মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে পারবে না দেশের কোনো হাসপাতাল। তবে সরকারি হাসপাতালে যেখানে বিশেষায়িত ইউনিট আছে সেখানে এ ধরনের অনুমতির প্রয়োজন নেই। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এসব বিধান যুক্ত করে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন (সংশোধন) আইন, ২০১৭ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। অনুমোদিত আইনে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনে নিকটাত্মীয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আশরাফ শামীম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সংশোধিত আইনে কিছু সংজ্ঞা পরিমার্জিত ও পুনর্গঠিত হয়েছে এবং আইনে কিছু বিষয় সংযোজিতও হয়েছে। কোনো হাসপাতাল সরকারের অনুমতি ছাড়া মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন করতে পারবে না।
তবে সরকারি হাসপাতালে যেখানে বিশেষায়িত ইউনিট আছে সেখানে এ ধরনের অনুমতির প্রয়োজন নেই। যাদের অনুমতি নেই তারা এই আইন কার্যকর হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে অনুমতির জন্য সরকারের কাছে আবেদন করবে। সংশোধিত আইনের উদ্দেশ্য তুলে ধরে অতিরিক্ত সচিব বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চিকিৎসা সেবার মান উন্নয়নে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবৈধ পাচারের সংযুক্তি ঘটেছিল, সংশোধিত আইন সেটাও রোধ করবে। এই বিষয়টা (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) নিয়ে ব্যবসাপাতি করা সেটারও একটা প্রতিরোধক ভূমিকা এই আইন পালন করবে। নিকট আত্মীয়ের মধ্যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান ও সংযোজন করতে হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বলেন, আইনে নিকট আত্মীয়ের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, ভাইবোন, স্বামী-স্ত্রী ও রক্তের সম্পর্কের আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা, নানা-নানী, দাদা-দাদী, নাতি-নাতনী এবং আপন চাচাতো, মামাতো, ফুফাতো, খালাতো ভাই বা বোন। তিনি বলেন, আগের আইনে নিকট আত্মীয় বলতে পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতা, ভাই- বোন, ও রক্তের সম্পর্কের আপন চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রী। নতুন আইনে নিকট আত্মীয়ের সংজ্ঞা সমপ্রসারণ করা হয়েছে। তবে চোখ ও অস্থিমজ্জা সংযোজনের ক্ষেত্রে নিকট আত্মীয় হওয়ার আবশ্যকতা নেই। অতিরিক্ত সচিব বলেন, আইন অনুযায়ী যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সংযোজন করা যাবে সেগুলো হলো- মানবদেহের কিডনি, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, অন্ত্র, যকৃত, অগ্নাশয়, অস্থি, অস্থিমজ্জা, চোখ, চর্ম ও টিস্যুসহ মানবদেহে সংযোজনযোগ্য যে কোনো অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গ। খসড়া আইনে ক্যাডাভেরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের কথা বলা হয়েছে জানিয়ে আশরাফ শামীম বলেন, ক্যাডাভেরিক অর্থ হৃৎপিণ্ড স্পন্দনরত এইরূপ মানবদেহ যা অনুমোদিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ব্রেইন ডেথ ঘোষিত এবং যার অঙ্গ অন্য মানবদেহে প্রতিস্থাপনের জন্য লাইফ সাপোর্ট দিয়ে কার্যক্ষম রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ব্রেইন ডেথ ঘোষণার পর কোনো আইনানুগ উত্তরাধিকারী কোনো ব্যক্তির দেহ থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেয়ার জন্য লিখিতভাবে অনুমতি দেয় তবে অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ নেয়া যাবে। ব্রেইন ডেথ ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দাবিদার না থাকলে ব্রেইন ডেথ ঘোষণাকারী হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তৃত্বপালনকারী ব্যক্তি অনুমতি দিতে পারবে। ব্রেইন ডেথ ঘোষণার জন্য একটি কমিটি থাকবে। এই কমিটি কোনো ব্যক্তিকে ব্রেইন ডেথ হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে। ব্রেইন ডেথ ঘোষণাকারী কমিটির কোনো চিকিৎসক বা তার কোনো নিকটাত্মীয় এরূপ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন বা সংযোজনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবেন না। অতিরিক্ত সচিব বলেন, কোনো ব্যক্তি নিকট আত্মীয়তা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিলে বা ওই ধরনের তথ্য দিতে উৎসাহিত, প্ররোচিত বা ভীতি প্রদর্শন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য তিনি কমপক্ষে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন। নিকট আত্মীয় সংক্রান্ত অপরাধ ছাড়া এই আইনের অন্য কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আশরাফ শামীম বলেন, এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধের জন্য কোনো চিকিৎসক দণ্ডিত হলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের মাধ্যমে তার রেজিস্ট্রেশন বাতিলযোগ্য হবে। কোনো হাসপাতাল এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ করলে এই হাসপাতালের পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত মালিক বা পরিচালক, তিনি যে নামেই পরিচিত হোন না কেন তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন। যদি না তিনি প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, ওই অপরাধ তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে এবং তা রোধ করার জন্য তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, কোনো হাসপাতাল এই আইনের অধীনে কোনো অপরাধ করলে এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজনের অনুমতি বাতিল হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য অর্থদণ্ড আরোপ করা যাবে। আগের আইনের শাস্তি সম্পর্কে অতিরিক্ত সচিব শামীম বলেন, ওই আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে বা লঙ্ঘনে সহায়তা করলে তিনি সর্বোচ্চ ৭ বছর ও কমপক্ষে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে বা কমপক্ষে ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল। সংশোধিত আইনে শাস্তি কমলো কিনা এ বিষয়ে আশরাফ শামীম বলেন, আগে শাস্তি ছিল ঢালাওভাবে, অনির্ধারিত। এবার দণ্ডের ক্ষেত্রগুলো সুনির্ধারিত করা হয়েছে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দাতা হিসেবে কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন না যদি ব্রেইন ডেথ (মৃত) ঘোষিত ব্যক্তির ক্যাডাভেরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বয়স ২ বছরের কম বা ৬৫ বছরের বেশি হয়। এখানে হয়তো কার্যকারিতার প্রশ্ন আছে। আগের আইনে এটা ছিল না। তবে চোখ ও অস্থিমজ্জা সংযোজনের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না। ২ থেকে ৬৫ বছর খাটবে না। জীবিত ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের ক্ষেত্রে বয়স ১৮ বছরের কম বা ৬৫ বছরের বেশি হবে না জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, তবে ওই ব্যক্তি মৃত্যুর আগে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দানের লিখিত আপত্তি করে থাকেন তবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেয়া যাবে না। দাতার সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কোনো ক্রমে নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং দাতার চোখ, অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে ?এজিবিএসএজি, এনটিএইচসিবি এবং এইচআইভি পজেটিভ থাকলেও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেয়া যাবে না। আশরাফ শামীম বলেন, অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ গ্রহীতা হিসেবে কোনো ব্যক্তি উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন না যদি তার বয়স ২ বছর থেকে ৭০ বছরের মধ্যে না হয়। তবে শর্ত থাকে যে ১৫ বছর থেকে ৫০ বছরের ব্যক্তিরা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গ্রহীতা হিসেবে অগ্রাধিকার লাভ করবেন। অতিরিক্ত সচিব বলেন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করতে হবে। বোর্ডের প্রধান হবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সার্জারিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন চিকিৎসক। এছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন কমপক্ষে সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা বা চিকিৎসক। এই বোর্ড দাতা ও গ্রহীতার আত্মীয়তার সম্পর্ক নির্ধারণ করবে। অঙ্গ- প্রত্যঙ্গ সংযোজন ও ব্রেইন ডেথ (মৃত) ঘোষিত ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত দেবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ ও সংযোজনে সহায়তা দিতে প্রত্যয়ন বোর্ড গঠিত হবে জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব বলেন, মেডিকেল বোর্ডের উপর এর অবস্থান হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমপক্ষে উপ-পরিচালক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হবেন এ বোর্ডের প্রধান। এ কমিটিতে সদস্য চারজন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী ব্রেইন ডেথ (মৃত) মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের জন্য সরকার ক্যাডাভেরিক জাতীয় কমিটি গঠন করবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবেন এ কমিটির সভাপতি। ১১ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কমপক্ষে যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা এ কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Rubo

২০১৭-০৭-১৮ ০৬:২৫:৩৪

Does it mean a new avenue opened for corruption ?

আপনার মতামত দিন

জিন্দাপার্ক নিয়ে দ্বন্ধের জেরে সংঘর্ষ, আহত ৫

টাইম ম্যাগাজিন নিয়ে আবার বিতর্কে ট্রাম্প

চট্টগ্রামে নারীঘটিত কারণে আইনজীবি খুন

‘নতুন বাকশাল দেখছি’

আওয়ামী লীগ নেতারা হিন্দুদের সম্পদ দখল করছে

মিশরে বিপুল সংখ্যক ‘হামলাকারী’ নিহত

বারাক ওবামাকে হত্যার পরিকল্পনাকারী গ্রেপ্তার

কীভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারকের পদ হারালো বৃটেন?

‘ডিপ্লোম্যাটিক মাইনফিল্ডে’ আসছেন পোপ, তাকিয়ে বিশ্ব

গুম আর জোর করে গুম এক নয়

‘দুর্নীতি বাড়ার জন্য রাজনীতিবিদরা দায়ী’

রংপুর ও রাজশাহীতে শীত বাড়ছে

‘ভারত ও চীন রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বাড়ি ঘর নির্মাণে সহায়তা করবে’

দিনাজপুরে পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত: যাত্রীদের চরম দূর্ভোগ

‘শেষ মুহূর্তে হলে সরকার সমঝোতায় আসবে’

রবি-সোমবার সব সরকারি কলেজে কর্মবিরতি