বেপরোয়া অজ্ঞান পার্টি

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার
ছদ্মবেশে ওত পেতে আছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। যাত্রী বা হকার সেজে। ক্ষতিকর চেতনানাশক হাতে। কথায় বলে, ‘১০০ চোর এক চক্রে, চোরের বুদ্ধি ক্ষুরে ক্ষুরে’। এ ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। একা নয়, সংঘবদ্ধ চক্রে তৎপর অজ্ঞান পার্টিগুলো।
রাস্তাঘাট, বাস, ট্রেন ও লঞ্চে। প্রথমে কোনো যাত্রী বা পথচারিকে টার্গেট করে তারা। তারপর সুযোগ বুঝে কৌশলে প্রয়োগ করে অধিকমাত্রায় মারাত্মক চেতনানাশক। কিছুক্ষণের মধ্যেই অচেতন। এরপর সবকিছু হাতিয়ে নিয়ে চম্পট। ঈদকে সামনে রেখে সম্প্রতি রাজধানীসহ সারা দেশে বেড়েছে অজ্ঞান পার্টির এমন দৌরাত্ম্য। অতিমাত্রায় মারাত্মক চেতনানাশক প্রয়োগে অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ। অনেক সময় প্রাণহানিও ঘটে। ঈদের আগেই মাটি হচ্ছে অনেক পরিবারের আনন্দ। তবে সতর্কতা ও সচেতনতাই এ বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে। এমনটাই পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, অজ্ঞান পার্টিগুলো মূলত সংঘবদ্ধ হয়ে তাদের অপতৎপরতা চালায়। বিভিন্ন সময় কিছু চক্র ধরাও পড়ছে। তবে তারা নিজেদের বিষয়ে নানা তথ্য দিলেও অন্য চক্রগুলোর বিষয়ে খুব বেশি তথ্য দিতে পারেনি। ঈদে অজ্ঞান ও মলম পার্টির দৌরাত্ম্য রোধে পুলিশ বেশ তৎপর রয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। যাত্রা পথে অপরিচিত লোকের সঙ্গে সখ্য ও তাদের দেয়া খাবার পরিহার করলে অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ঈদ উপলক্ষে কর্মজীবী মানুষরা বেতনের পাশাপাশি বোনাস পাচ্ছেন। বাড়ছে ঈদের কেনাকাটা। নাড়ির টানে বাড়ি ছুটছে মানুষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এ সময় অর্থ প্রবাহ স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ বাড়ে। ঈদের এ সুযোগে মরিয়া উঠেছে অজ্ঞান পার্টিগুলো। শুধু রাজধানী ঢাকার অন্তত ৩৫টি স্পটে প্রায় ২৫টি সংঘবদ্ধ চক্রে অজ্ঞান পার্টির তিন শতাধিক সদস্য সক্রিয় রয়েছে বলে অনুমান সংশ্লিষ্টদের। বিভিন্ন সময় এসব চক্রের সদস্যরা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও গ্রুপ পরিচালনাকারী ‘চেয়ারম্যান’রা তাদের জামিনে ছাড়িয়ে নিচ্ছে। ফের যোগ দিচ্ছে একই অপরাধে। ঈদ উপলক্ষে নেশাখোর ও ভবঘুরেরাও দলে ভিড়ছে।
পুলিশ, র‌্যাব ও ভুক্তভোগীরা জানায়, এরই মধ্যে গত ১৪ই জুন দিবাগত রাতে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনে ধরা পড়েছে অজ্ঞান পার্টির ১৫ সদস্য। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সদস্যরা তাদেরকে গ্রেপ্তার করে। এরা হলো- রওশন মিয়া, সোহাগ, রাসেল, বাবু, হৃদয়, ছোট বাবু, সুমন হাওলাদার, বিজয় চন্দ্র, সুমন, ফয়সাল, বিল্লাল হোসেন, আবুল হোসেন, আকাশ ভূঁইয়া, ছালাম ও রুবেল। এ সময় তাদের কাছ থেকে জব্দ করা হয়েছে চেতনানাশক তরল পদার্থ মেশানো খেজুর ও বিপুল পরিমাণ চেতনানাশক ট্যাবলেট। এছাড়া বিভিন্ন সময় অজ্ঞান পার্টির গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যদের কাছ থেকে চেতনানাশক ট্যাবলেট মাইলাম ৭.৫ মিলিগ্রাম, ডরমিটল ৭.৫ মিলিগ্রাম, লোনাজেপ ২.২ মিলিগ্রাম, কৌটাভর্তি টাইগার বাম, হালুয়া জাতীয় চেতনানাশক জব্দ করা হয়েছে। খাবারের সঙ্গে উচ্চমাত্রার ডায়াজিপিন ট্যাবলেট বা সিরাপ মিশিয়েও অজ্ঞান করে প্রতারকরা। এসব ওষুধে ডায়াবেটিস ও লিভারের সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর মারা যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা সারা বছর এভাবে জীবিকা নির্বাহ করলেও রোজা, দুই ঈদ, পূজাসহ অন্যান্য উৎসবের সময় তাদের তৎপরতা বাড়ে বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। অজ্ঞান পার্টির ওই সদস্যরা তাদের ‘অপারেশনে’র কৌশল ও নানাদিক নিয়ে গোয়েন্দাদের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তাছাড়া, বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার হওয়া সদস্যরা র‌্যাব-পুলিশকে তাদের অভিনব কৌশল সম্পর্কে জানায়, একা নয়, সংঘবদ্ধ দলেই এই অপতৎপরতা চালায় তারা। প্রতি অপারেশন বা টিমে থাকে ৩ থেকে ১৫, এমনকি ২০ সদস্যও। কোনো কোনো সময় অপারেশনের সাংকেতিক নামও দেয়া হয়। তাদের কয়েকজন ব্যস্ততম স্পট, বাস ও রেলস্টেশনে ডাব, কোমল পানীয়, আচার, ঝালমুড়ি, ফলমূল, চানাচুর ভাজা, শসা, আম, সিগারেট, পান, জুসসহ নানা খাদ্যদ্রব্যে নেশাজাতীয় ও চেতনানাশক মিশিয়ে বিক্রি করে। কাউকে টার্গেট করার পর ছদ্মবেশী বিক্রেতার হাঁক-ডাকে তাকে কাছে টানা হয়। ছলচাতুরি করে চেতনানাশক মেশানো পণ্যটি বাছাই করতে উৎসাহিত করা হয়। খাওয়ানো গেলেই কেল্লাফতে। অন্য ক্রেতাদের দেয়া হয় স্বাভাবিক ডাব বা পানীয়। চক্রের কয়েকজনও তখন ছদ্মবেশী ক্রেতা সেজে খাবার কিনে খায়। এরপর টার্গেটকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে অন্য একজন। পিছু নেয় আরো কয়েকজন। কিছুটা এগোতেই টার্গেট করা ব্যক্তির মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে বা শুয়ে পড়ে। অচেতন হতেই সহযোগিতা বা পরিচিত ও স্বজন বেশে একজন কাছে যায়। একে একে অন্যরাও। সব হাতিয়ে নেয়। রাস্তায় এই সুযোগ না পেলে হাসপাতালে নেয়ার নাম করে রিকশা বা সিএনজিতে উঠিয়ে সব হাতিয়ে নেয়। তারপর অচেতন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রেখে সটকে পড়ে।
গাড়ি বা ট্রেনে যাত্রীবেশে ‘অপারেশনে’ও একইভাবে টার্গেট করা হয়। যিনি টার্গেট ঠিক করেন তাকে বলা হয় ‘মাস্টার’। এরপর টিমের সবাই গাড়িতে উঠে। টার্গেটের পাশে, পেছনে ও কাছের সিটে বসে একেকজন। শেষের দিকে গাড়িতে ওঠে এক ছদ্মবেশী হকার। গাছ-গাছড়া বা কবিরাজি পণ্য, আচার, চকলেট বা হালুয়ার গুণাগুণ প্রচার করে বিক্রি শুরু করেন। তাকে তাদের ভাষায় বলা হয় ‘ডাক্তার’। প্রচারের জন্য প্রথমে ফ্রি খাওয়ানো বা চেকে দেখতে বলা হয়। সেখানে অন্য যাত্রীদের স্বাভাবিক পণ্য দিলেও টার্গেট করা ব্যক্তিকে দেয়া হয় চেতনানাশক মেশানো খাবার। পাশে বসা অজ্ঞান পার্টির সদস্য নিজে খেয়ে টার্গেট করা যাত্রীর মনে বিশ্বাস জমিয়ে খেতে উৎসাহিত করে। তাকে ‘বয়ান বাজ’ বলে ডাকা হয়। অজ্ঞান হওয়ার পর পাশের সিটে বসা চক্রের সদস্য সব হাতিয়ে নেয়। তাদের ভাষায় সে-ই ‘ক্যালরিম্যান’। তবে তাদের দলে নারী সদস্যও রয়েছে। হিজাব বা বোরকা পরেই মাঠে থাকে তারা। সে সদস্যরা নারী যাত্রী বা পথচারি হিসেবে নানাভাবে সহানুভূতি আদায় করে শিকারকে ফাঁদে ফেলে। টাকা, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়ার পর ওই নারী বা পুরুষ সুযোগ বুঝে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে। তারপর একে একে সরে পড়ে বাকিরাও। গাড়ি ও ট্রেনে চেতনানাশক গন্ধ শুকানো ও চোখে-মুখে মলম লাগানোর কৌশলও প্রায় দেখা যায়। একই কৌশল ব্যবহার করা হয় পথচারিদের ক্ষেত্রেও।
লঞ্চের ছদ্মবেশটাও প্রায় অভিন্ন। বিস্কুট, চকলেট, খাবার ইত্যাদি বিক্রির আড়ালে কুপোকাত হয় যাত্রীরা। শুধু টাকা-পয়সা বা মূল্যবান জিনিসপত্রই নয়। অজ্ঞানপার্টি চালকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে গাড়িও। প্রাইভেট কার বা অটোরিকশায় যাত্রীবেশে চড়ে সুবিধামতো নির্জন স্থানে গিয়ে কাজ সারছে। নানা কৌশলে খাবারের নামে যাত্রা বিরতি দিয়ে খাওয়ানো হচ্ছে চেতনানাশক। অথবা চেতনানাশক শুকিয়ে, খাবারের মাধ্যমে খাইয়ে বা চোখে-মুখে মলম লাগিয়ে দিয়ে অচেতন করছে। রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে গাড়ি নিয়ে হাওয়া হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা পূর্ব বিভাগের উপ-কমিশনার খন্দকার নূরুন্নবী বলেন, ঈদের আগের সময়টাতে তারা বেশি তৎপর হয়। তবে থানার সাধারণ ডায়েরি বা মামলার পরিসংখ্যানে সম্প্রতি শিকার হওয়ার সংখ্যা বেশি নয়। তাছাড়া রমজানের আগে থেকে পুলিশের অপারেশনের কারণে রাজধানীতে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে আশ্রয় নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের অবগত করা হয়েছে। তবে চলতি মাসে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ে ৭ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. এনামুল করিম বলেন, অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের প্রয়োগ করা অতিমাত্রায় চেতনানাশক এজমা ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্তদের মৃত্যুর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। কেউ শিকার হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চোখের সামনে কেউ অজ্ঞান হলে পেট পরিষ্কার করার জন্য বমি করানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ঘুমের ওষুধ বিক্রি ও ক্ষতিকর ঘুমের ওষুধ নিষিদ্ধ থাকলেও অবাধ বেচাকেনা থামছে না। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। একইসঙ্গে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হলে এ মারাত্মক অপরাধ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

জয়

২০১৭-০৬-২০ ০৯:৫০:৫৬

ভাই আপনার মতামতের জন্য ধন্যবাদ ।হাত বা কব্জি কেটে দিলে কাজ করতে পারবেনা তাই প্রথমে একটি আঙ্গুল ক্রমানয়ে দুই তিন আঙ্গুল --আশা করি কাজ হবে ! আর এই কাজ পুলিশ করবে না আমাদের কে করতে হবে !

বিদ্যুত

২০১৭-০৬-১৯ ১৪:২৮:৩৯

পুলিশ এবং র‌্যাব-এর ভাইয়েরা, আপনারা জানেন এরা কারা। এদের ধরে দয়া করে কয়েকজনের হাতের কব্জি কেটে দিন। পত্রিকায় সংবাদ আসুক। তারপর দেখুন সব বন্ধ হয়ে গেছে। ধরবেন, কোর্টে চালান দিবেন, কয়েকদিনের জেল হবে তারপর বের হয়ে আবার একই কুকর্ম করবে। সাধারন মানুষের ভোগান্তি হবে। কি লাভ বলুন? যদি আন্তরিক ভাবেই এসব বন্ধ করতে চান, তাহলে কব্জি কাটার শাস্তি দিয়েই দেখুন না। হাতে হাতে ফল পাবেন।

আপনার মতামত দিন