পাহাড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে কাজ করছে সেনাবাহিনী

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার
পার্বত্য জেলায় ভূমি ধসে ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনে অক্লান্তভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী -ছবি: আইএসপিআর
রাঙ্গামাটি-বান্দরবানে ভূমি ধসের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গত পরিবারের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র খোলাসহ জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং বিদুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে কাজ করছে তারা। বিগত কয়েকদিনে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রবল বর্ষণে এবং একের পর এক পাহাড় ধসের ঘটনায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও অচল হয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যখন জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, তখন এগিয়ে আসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন সহ অন্য সদস্যরা। যোগাযোগ   
ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল এবং রাস্তাঘাট পুনসংস্কারে তিন পার্বত্য জেলায় ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন এবং ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের প্রায় তিন শতাধিক সদস্য বিপুল সংখ্যক ভারী যন্ত্রপাতি সহকারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বান্দরবান জেলার রদমা এবং রাঙ্গামাটির ঘাগড়া এলাকায় ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়নের ২৩৩ জন সদস্য ২০টি ভারী যন্ত্র (১০টি ডাম্পার, ১টি হুইল লোডার, ৫টি এক্সেভেটর, ১টি হুইল ডোজার এবং ১টি লোডার) দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ করে যাচ্ছে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে এবং পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য সেনাবাহিনী অত্যন্ত প্রতিকূল ও বৈরী আবহাওয়াকে উপেক্ষা করে খাগড়াছড়ি থেকে লংগদু পর্যন্ত সড়ক পথে এবং সেখান  থেকে রাঙ্গামাটি পর্যন্ত নদীপথে ১টি জেনারেটর রাঙ্গামাটিতে পাঠানো হয়। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম  থেকে ২টি উচ্চ শক্তিসম্পন্ন জেনারেটর, ২টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, ৪টি ওয়াটার ট্যাংক, ২০০ জেরিকেন বিশুদ্ধ পানি, বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল সড়কপথে কাপ্তাই এবং পরবর্তীতে নদীপথে রাঙ্গামাটিতে পাঠানো হয়। রাঙ্গামাটিতে পানি বিশুদ্ধকরণ ২টি প্ল্যান্ট এবং ৪টি ওয়াটার ট্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাসমূহে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও সংক্রামক রোগের মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এছাড়াও ১৬ই জুন থেকে এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী মোট ১,৬৮৬ জন অসহায় ও দুর্গতদের মাঝে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং ৪৮৯২ জনকে  দৈনিক দুই বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, রসদ বিতরণ ও ৯০০ জন দুর্গতের মাঝে নগদ অর্থ সহায়তা ও বস্ত্র বিতরণ নিশ্চিত করে। বর্তমানে ৮টি মেডিকেল টিম ১৬টি স্থানে অসহায় ও দুর্গতদের মাঝে চিকিৎসা সেবা প্রদান এবং ৭টি আশ্রয় কেন্দ্রে দুর্গত জনসাধারণের মাঝে প্রতিদিন রান্না করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করে যাচ্ছে। পাহাড় ধসের ঘটনা পরবর্তী সময়ে বৈরী ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে সেনাবাহিনী প্রধান, জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশন, কমান্ডার এসডব্লিউও এবং জিএসও-১ (সিআই) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার দুর্গত এলাকাসমূহ পরিদর্শন করেন। এই সময় সেনাবাহিনী প্রধান ও জিওসি ২৪ পদাতিক ডিভিশন এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দুর্গত এলাকার জনগণকে সার্বিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস প্রদান করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপর অর্পিত প্রচলিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাইরেও আর্তমানবতার সেবায় পাহাড় ধসের ঘটনা মোকাবিলায় নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে সেনাবাহিনী বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সেনাবাহিনী ঘূর্ণিঝড় আইলা, রানা প্লাজায় ভবনধস, বন্যা সহ বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় বরাবরই সংকটময় মুহূর্তে দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়ে আপন করে নিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ধস পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন ‘সম্পৃক্ত ও নিবেদিত’ এই মূলমন্ত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১৩ই জুন প্রবল বর্ষণ ও অকস্মাৎ ভূমি ধসের ঘটনায় রাঙ্গামাটি ছাড়াও গুইমারা, রামগড় ও বান্দরবানে এ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় রাঙ্গামাটিতে ১১৫ জন, বান্দরবানে ৬ জন ও খাগড়াছড়িতে ৫ জনসহ সর্বমোট ১২৬ জনের মৃত্যু ঘটে। পাহাড় ধসের ঘটনার পর রাঙ্গামাটি জেলার মানিকছড়িতে সেনাবাহিনীর ১৬ জন অকুতোভয় সেনাসদস্য উদ্ধার অভিযানে গেলে সেখানে পুনরায় পাহাড় ধসের ঘটনায় ২ জন সামরিক কর্মকর্তাসহ মোট ৫ জন সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনার পরও সেনাসদস্যরা দমে না গিয়ে বরং রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি, দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকায় চিকিৎসা সেবা প্রদান, রান্না করা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও রসদ সরবরাহ করে যাচ্ছে। উপস্থিত কমান্ডারের মতে রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম রাস্তা আগামী বুধবারের মধ্যে হালকা যানবাহন এবং আগামী একমাসের মধ্যে ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে এবং রতমা-বান্দরবান রাস্তায় যান চলাচল করতে আরো প্রায় ৭ দিন সময় লাগবে।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন