এ পি জে আবদুল কালাম কেন ইফতার পার্টি দিতেন না!

মিডিয়া কর্নার

মিজানুর রহমান খান | ১৬ জুন ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:০৯
ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে ইফতার পার্টির রেওয়াজ বহুকাল ধরে চলে আসছে। সেই সঙ্গে সেখানে কাকে দেখা গেল, কাকে গেল না, কাকে দাওয়াত দেওয়া হলো, কাকে দেওয়া হলো না, সেদিকে মিডিয়ার সজাগ দৃষ্টি রাখা, এসব অনেকেরই জানা। কিন্তু একটা ছন্দপতন ঘটেছিল। আর সেটা ঘটিয়েছিলেন ড. এ পি জে আবদুল কালাম। তাঁর আমলটি ছিল ইফতার পার্টিমুক্ত।

ভারতের সাবেক এই বিদ্বান রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক চমকপ্রদ তথ্য ইতিমধ্যে বেরিয়েছে, কিন্তু এবারে এমন কিছু নজরে এল, যা সত্যি প্রত্যেককে সুগভীরভাবে স্পর্শ করার উপাদানে ভরপুর।

গতকাল বুধবার জাতীয় পার্টির নেতা জি এম কাদেরের কাছ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ইলেকট্রনিক বার্তা পাই। এটা আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে, এমনকি চোখকে আর্দ্র করেছে।
তাই ভাবলাম বার্তাটি যেভাবে আছে, সেভাবেই অনুবাদ করি। অবশ্য এই টেক্সট সত্যম রায়চৌধুরীর ‘এ পি জে আবদুল কালাম’ বইয়েও গ্রন্থিত হয়েছে। গত নভেম্বরে বইটি বের করেছে টেকনো ইন্ডিয়া।

পি মাধভান নায়ারের লেখা ‘দ্য কালাম এফেক্ট, মাই ইয়ার্স উইথ দ্য প্রেসিডেন্ট’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০২ সালে। ১৯৬৭ ব্যাচের নায়ারকে আবদুল কালাম নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর সচিব হতে সরকারের দেওয়া প্যানেলের সব নাম তিনি নাকচ করেছিলেন।

ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আবদুল কালামকে নিয়ে তাঁর সাবেক সচিব অবসরপ্রাপ্ত আইএস কর্মকর্তা পি এম নায়ারের একটি সাক্ষাৎকার দূরদর্শনের তামিলভাষী আঞ্চলিক চ্যানেল ডিডিপোধিগাই প্রচার করেছিল। এর অনুবাদ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. ড. এ পি জে আবদুল কালাম যখনই বিদেশ যেতেন, তখনই দামি উপঢৌকন নিতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন। এর কারণ, এটাই রাষ্ট্রাচার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ ও জাতিরাষ্ট্রের কাছ থেকে সফররত বিদেশি রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানদের এ ধরনের উপঢৌকন নেওয়া একটি বৈশ্বিক প্রথা হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এই উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করা হলে তা কোনো জাতির প্রতি একটা উপহাস এবং ভারতের জন্য তা বিব্রতকর। সুতরাং, তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে এসব উপঢৌকন নিতেন। কিন্তু তিনি ফিরে আসার পরে তাঁর নির্দেশ থাকত, সব উপহারসামগ্রীর আলোকচিত্র তুলতে হবে। এর ক্যাটালগ করতে হবে। এরপর তা মহাফেজখানায় দিতে হবে। এরপরে তাঁকে আর কখনো উপহারসামগ্রীর দিকে ফিরে তাকাতেও দেখা যায়নি। তিনি যখন রাষ্ট্রপতি ভবন ত্যাগ করেছিলেন, তাঁকে এমনকি একটি পেনসিলও নিয়ে যেতে দেখা যায়নি।

২. ২০০২ সালে ড. আবদুল কালাম যখন রাষ্ট্রপতির পদ নিয়েছিলেন, তখন রমজান এসেছিল জুলাই-আগস্টে। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জন্য এটা একটা নিয়মিত রেওয়াজ যে তিনি একটি ইফতার পার্টির আয়োজন করবেন। একদিন ড. কালাম তাঁর সচিব মি. নায়রাকে বললেন, কেন তিনি একটি পার্টির আয়োজন করবেন? কারণ, এমন পার্টির অতিথিরা সর্বদা ভালো খাবার খেয়ে অভ্যস্ত। তিনি মি. নায়ারের কাছে জানতে চাইলেন, একটি ইফতার পার্টির আয়োজনে কত খরচ পড়ে? মি. নায়ার তাঁকে জানালেন, প্রায় ২২ লাখ রুপি। ড. কালাম তাঁকে নির্দেশ দিলেন, কতিপয় নির্দিষ্ট এতিমখানায় এই অর্থ, খাদ্য, পোশাক ও কম্বল কিনে দান করতে হবে। রাষ্ট্রপতি ভবনের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম এতিমখানা বাছাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছিল। ড. কালাম এ ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করেননি। এতিমখানা বাছাইয়ের পরে ড. কালাম মি. নায়ারকে তাঁর কক্ষে ডাকলেন এবং এক লাখ রুপির একটি চেক দিলেন। তিনি বললেন, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সঞ্চয় থেকে কিছু অর্থ দান করছেন। কিন্তু এ তথ্য কারও কাছে প্রকাশ করা যাবে না। মি. নায়ার এতটাই আঘাত পান যে তিনি বললেন, ‘স্যার, আমি এখনই বাইরে যাব এবং সবাইকে বলব। কারণ, মানুষের জানা উচিত, এখানে এমন একজন মানুষ রয়েছেন, যে অর্থ তাঁর খরচ করা উচিত, শুধু সেটাই তিনি দান করেননি, তিনি সেই সঙ্গে নিজের অর্থও বিলিয়েছেন।’ ড. কালাম যদিও একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন; কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার বছরগুলোতে কোনো ইফতার পার্টি দেননি।

৩. ড. কালাম ‘ইয়েস স্যার’ ধরনের লোক পছন্দ করতেন না। একবার যখন ভারতের প্রধান বিচারপতি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতে এলেন এবং কোনো একটি পর্যায়ে ড. কালাম তাঁর সচিবের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি কি আমার এ কথার সঙ্গে একমত?’ মি. নায়ার ভাবলেশহীনভাবে বললেন, ‘না স্যার, আমি আপনার সঙ্গে একমত নই।’ অবাক হয়ে গেলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। একজন সিভিল সার্ভেন্টের পক্ষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দ্বিমত করা এবং এতটা প্রকাশ্যে করা, তা ভাবাও যায়নি। মি. নায়ার প্রধান বিচারপতিকে বলেন, রাষ্ট্রপতি পরে তাঁকে প্রশ্ন করবেন, জানতে চাইবেন, কেন তিনি তাঁর সঙ্গে একমত হতে পারেননি। এবং যদি মি. নায়ারের যুক্তি ৯৯ শতাংশ সংগত হয়, তাহলে তিনি তাঁর মন পরিবর্তন করবেন।

৪. ড. কালাম তাঁর আত্মীয়দের একবার দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরা সবাই রাষ্ট্রপতি ভবনে অবস্থান নিলেন। তাঁদের নগর পরিদর্শন করাতে তিনি একটি বাস ভাড়া করলেন এবং সে অর্থ তিনি পরিশোধ করেন। কোনা সরকারি গাড়ি তাঁর আত্মীয়দের জন্য ব্যবহৃত হয়নি। ড. কালামের নির্দেশনা অনুসারে, তাঁদের থাকা-খাওয়ার খরচ হিসাব করা হলো। বিল দাঁড়াল দুই লাখ রুপি, যা তিনি পরিশোধ করেছেন। ভারতীয় ইতিহাসে এটা আর কেউ করেননি।

এখানেই শেষ নয়, এবার বরং আরও নাটকীয়তার জন্য অপেক্ষা করুন। ড. কালাম একবার চাইলেন তাঁর সঙ্গে তাঁর বড় ভাই পুরো এক সপ্তাহ যাতে সময় কাটান। তা-ই হলো। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার পরে তাঁর রুমভাড়া বাবদ তিনি অর্থ পরিশোধ করতে চাইলেন। কল্পনা করুন, একটি দেশের রাষ্ট্রপতি এমন একটি কক্ষের জন্য ভাড়া পরিশোধ করতে চাইছেন, যা তাঁর নিজের জন্যই বরাদ্দ। এবারে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পূরণ হলো না। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফরা ভেবেছিলেন, এতখানি সততা অনুসরণ তাঁদের পক্ষে বিদ্যমান বিধির আওতায় সামাল দেওয়া কঠিন।

৫. মেয়াদ শেষ হয়ে এলে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবন ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখন সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী শ্রদ্ধা জানান। মি. নায়ার এভাবেই শ্রদ্ধা জানাতে রাষ্ট্রপতির কাছে একা গিয়েছিলেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। কারণ, স্ত্রীর পা ভেঙে গিয়েছিল বলে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। ড. কালাম জানতে চাইলেন, তিনি কেন তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসেননি। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার কারণে তিনি শয্যাশায়ী।

পরের দিন। মি. নায়ার শশব্যস্ত হয়ে এদিক-ওদিক তাকালেন। কারণ, তিনি হঠাৎ দেখলেন, তাঁর ঘরের চারপাশে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী ছেয়ে ফেলেছে। নিরাপত্তারক্ষীরা জানালেন, ভারতের রাষ্ট্রপতি তাঁর ঘরে আসছেন। রাষ্ট্রপতি গৃহে প্রবেশ করলেন। মিসেস নায়ারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। এবং কিছুক্ষণ খোশগল্পের পরে চলে গেলেন। মি. নায়ার তাঁর ওই সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সিভিল সার্ভেন্টের ঘরে এভাবে যাবেন না। তাও এমন এক ঠুনকো অজুহাতে।’

এ পি জে আবদুল কালামের ছোট ভাই একটি ছাতা মেরামতের দোকান চালান। মি. নায়ার তাঁর দেখা পেয়েছিলেন আবদুল কালামের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। তখন রাষ্ট্রপতির ভাই মি. নায়ারের কদমবুসি করলেন, যা ছিল তাঁর তরফে মি. নায়ার এবং তাঁর প্রয়াত ভাই ড. আবদুল কালামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন।

জি এম কাদের এ নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা কোথায় আছি।’ মি. কাদেরের বড় ভাই আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

আজকের দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

mojibur rahman

২০১৭-০৮-১২ ০৯:২৩:৫৩

এপি জে কালামের নাম বহু বছর মনে থাকবে।

Citizen

২০১৭-০৬-১৭ ০৪:৪৭:৪৯

These are all true Islamic lessons, but sadly Muslims are quite ignorant and do not usually practice these. I remember reading somewhere that our beloved prophet had 7 coins in possession while he was in death bed. He perhaps felt that bcoz of this 7 coins his departure was delaying, so he asked Bibi Aysha to take these coins away from him. The prophet departed for the heaven leaving no tangible asset in the earth, but he was ruler, state leader during his life time.

রুহুল

২০১৭-০৬-১৬ ০৩:০৪:৪৭

আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রপতিও এমন অনেক অসাধারণ গুণের অধিকারী যে, আমরা তাঁকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। বিশেষ করে তাঁর স্বভাবজাত সরলতার কারণে তিনি সবার কাছেই বিশেষভাবে নমস্য।

আপনার মতামত দিন

তাবিথ আউয়ালই ডিএনসিসির উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী

ফের টেস্ট অধিনায়ক সাকিব

দুই বছর ওএসডি ছিলেন মারুফ জামান

সারা দেশ গুম-খুনে জর্জরিত

শেখ হাসিনা সফটওয়্যার পার্কের যাত্রা শুরু

চালের দাম ফের বাড়ছে

কুড়িগ্রামে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

আওয়ামী লীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি নির্ভার বিএনপি

সিলেটে শামীমের বিরুদ্ধে রুমার মামলা, তোলপাড়

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপা প্রার্থীর ভাবনা

এবি ব্যাংক চেয়ারম্যানসহ ৪ জনকে দুদকে তলব

আড়াইহাজারের এমপির সঙ্গে মাওলানা হাবিবুরের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ভাইরাল

রাবি চারুকলা অনুষদের সেই ডিনের পদত্যাগ

সাভারে জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৯

সাকিব ফের বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক

এমপি মুক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসিকে দুদকের চিঠি