আনন্দ উচ্ছাসে জাপানে বৈশাখী মেলা উদযাপন

প্রবাসীদের কথা

মাহবুব মাসুম, টোকিও (জাপান) থেকে | ১৭ এপ্রিল ২০১৭, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০০
আনন্দ উচ্ছাসে অনুষ্ঠিত হলো জাপান প্রবাসীদের প্রাণের টোকিও বৈশাখী মেলা-২০১৭। ১৬ এপ্রিল রোববার টোকিওর প্রাণকেন্দ্র তোশিমা সিটির ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে দিনব্যাপী এই মেলায় প্রবাসী বাঙ্গালীদের মিলমেলায় পরিণত হয়। নতুন বছরকে বরণ করতে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রবাসীরা এ মেলায় অংশগ্রহণ করে। শুধু প্রবাসীরাই নয়, এ মেলায় স্থানীয় জাপানি অতিথি ছাড়াও বিভিন্ন দেশের নাগরিকগণ স্বস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। টোকিও সিটির এ যেন এক চিলতে বাংলাদেশ। মেলায় উপস্থিত ব্যাক্তিরা বাংলা খাবারের বাহারি স্টলসহ মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।
বাংলাদেশে ১৪ এপ্রিল (১লা বৈশাখ) পালিত হলেও দিনটি জাপানে কর্মদিবস হওয়ায় রোববার অর্থাৎ ১৬ এপ্রিল টোকিওতে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়।
প্রতিবছর জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি এবং তাদের সুহৃদগণ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মেলা আর মেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে ওঠেছিল মহামিলন মেলায়। প্রবাসে বাংলাদেশ কমিউনিটি বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো নানাভাবে পালন করে থাকে। এর মধ্যে বৈশাখী মেলার ভিন্নতা রয়েছে। এ মেলায় দল-মত নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করে থাকে। এই একটি মাত্র আয়োজনেই সবাই একাকার হয়ে যায়। ভুলে যায় তাদের দলীয় মতামতের ভিন্নতা। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। বৈশাখী মেলা বাংলাদেশি বাংলাভাষীদের প্রাণের মেলা। মেলায় শিশু-কিশোররা ব্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের প্রতিভা বিকাশ ও প্রকাশে। তাদের জন্য বেশ কয়েকটি ইভেন্ট রাখা হয়।
মেলায় ব্যবসায়ীদের ব্যস্ততা যেন একটু বেশি। কিছুদিন পূর্ব থেকেই প্রস্তুতি নেয়া হয় ক্রেতাদের সর্বোচ্চ দৃষ্টি আকর্ষণে। অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয় ক্রেতাদের উত্তম সেবা দেয়ার জন্য। তাই তো বৈশাখী মেলাকে ঘিরে প্রবাসীদের প্রাণ-চাঞ্চল্য বেড়ে যায়।
সকাল ১০টায় মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী ঘোষণা করা হয়। এবারের মেলাতেও ১০ হাজারেরও বেশিসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে, যার অধিকাংশই বাঙালী, স্থানীয় জাপানি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক। আর এখানেই জাপান প্রবাসীদের সার্থকতা। জাপান প্রবাসীদের দ্বারা আয়োজিত প্রায় প্রতিটি আয়োজনেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাপানি নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকে। আর এই সার্থকতা দেখে অভিভূত হন বাংলাদেশ থেকে আগত অতিথিরাও।

এবারের আয়োজন ছিল অষ্ঠাদশ বা ১৮তম আয়োজন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর একে একে শুরু হয় পরিচিতি পর্ব (মেলা পরিচালনা কমিটি, স্টল ও স্পনসরদের পরিচিতি), বড়দের উন্মুক্ত অনুষ্ঠান, ছোটদের চিত্রাঙ্কন (উন্মুক্ত), ছোটদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, কৌতুক, যেমন খুশি সাজো ইত্যাদি। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে জাপানি নৃত্যদল কর্তৃক নৃত্য পরিবেশন ছাড়াও প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্য ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।  
আয়োজক সংগঠন জেবিএস-এর চেয়ারম্যান, বিশেষ অতিথি স্থানীয় প্রশাসন তোশিমা সিটি ডেপুটি মেয়রসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। মেলার স্পনসরদের পরিচিতি ও ক্রেস্ট প্রদান, বৈশাখী কনসার্টে  উত্তরণ বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক দল, স্বরলিপি কালচারাল একাডেমী গান পরিবেশন করে। এবার দেশ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন সঙ্গীত শিল্পী ইমরান, রেশমী, কাইয়্যুম।তাদের গান দারুনভাবে উপভোগ করে দর্শকরা।সবশেষে সমাপনী ঘোষণা দিয়ে শেষ হয় দিনব্যাপী বৈশাখী মেলার।
মেলার প্রধান সমন্বয়ক ড. শেখ আলীমুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল কর্মী ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বৈশাখী আয়োজনকে সুন্দর ও সার্থক করতে। বিভিন্ন সভা করে কমিটি, সাব কমিটিতে ভাগ হয়ে একাধিকবার আলোচনায় বসে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে এই বৃহৎ মেলাকে সার্থক করে তোলে।
ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্ক যে শুধু বৈশাখী মেলা প্রাঙ্গণ হিসেবে সুপরিচিত, তা কিন্তু নয়। এ মাঠেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বাঙালি জাতির গর্ব, বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন, বিশ্ব মাতৃভাষা স্বাধিকারের প্রতীক, আমাদের মহান শহীদ মিনার। এই স্থানে বৈশাখী মেলার সফল আয়োজনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা এবং মেলা কমিটির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দেশের বাইরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত/স্থাপিত প্রথম শহীদ মিনার। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৫ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সেই থেকেই টোকিও’র নিশিগুচি পার্কে অবস্থিত শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে বেশিরভাগ আয়োজন চলে।বাঙ্গালীদের সকল অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র এটি।
---------------------------------
লেখক- প্রবাসী সাংবাদিক
masum86cu@yahoo.com
 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন