পাঠ্যবইয়ে ভুলের দায়ে মামলা হচ্ছে

এনসিটিবিতে ব্যাপক রদবদল, আতঙ্কে কর্মকর্তারা

শিক্ষাঙ্গন

স্টাফ রিপোর্টার | ৫ মার্চ ২০১৭, রবিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫১
চলতি বছর বিনামূল্যের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বইয়ে নানা ভুলের দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। একই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পুরোনো কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুন করে সাজানো হচ্ছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ভুলে ভরা পাঠ্যবই সংশোধন ও এর সঙ্গে যুক্তদের চিহ্নিত করার জন্য গঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। ভুলের জন্য ৫ জন কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্তার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এনসিটিবিকে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসেন বলেন, তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। এ নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বিস্তারিত তুলে ধরবেন।
এর আগে কিছু বলা যাবে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে এমনটা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এনসিটিবির সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞের প্রচণ্ড অভাব। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে ইতিহাসের শিক্ষক সংগীত, দর্শনের মুসলিম শিক্ষক বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতির শিক্ষক বাংলা সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন। এই যখন অবস্থা- তার পরিবর্তন করতে ব্যাপক রদবদল করার দাবি উঠে এনসিটিবিতে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ পদগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। ঢেলে সাজানো হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত দল প্রেষণে থাকা কর্মকর্তাদের তালিকা চাওয়ার পর বিসিএস কর্মকর্তার মধ্যে বদলি আতঙ্ক শুরু হয়। সাম্প্রতিক বিতর্ক এড়াতে এর কোনো বিকল্প দেখছে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, আগেই বলেছি এর সঙ্গে যারা যুক্ত তারা কেউ রেহাই পাবে না। এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি উচ্চপর্যায়ে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট জমা হয়েছে। শিগগিরই আপনারা একটা পরিবর্তন দেখতে পাবেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত টিমের প্রধান অতিরিক্ত সচিব রুহী রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি মাসব্যাপী তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে রিপোর্ট জমা দেন। এর আগে প্রধান সম্পাদক প্রীতিশ কুমার সরকার, ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ লানা হুমায়রা খানকে ওএসডি করা হয়। আর্টিস্ট কাম ডিজাইনার সুজাউলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ‘ছাগল গাছে উঠে আম খায়’ এটার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক) আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের এটার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফ্যান্টাসি শিখবে। কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কাজ শুরুর পর থেকেই এনসিটিবিতে আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়। যা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিষয়ের বিশেষজ্ঞের অভাব: যিনি যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তিনি সেই বিষয়ে সম্পাদনা, পরিমার্জন ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু এনসিটিবিতে এর ব্যতিত্রুম ঘটছে। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দর্শন নামে কোনো বিষয় না থাকলেও এনসিটিবিতে এই বিষয়ের ৯ জন কর্মকর্তা কর্মরত। এরমধ্যে ৫ জনই গবেষণায়। যারা অন্য বিষয়ে গবেষণা করছেন। একজন করে ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ বাকি একজন বিতরণ শাখায়। প্রত্যেক ক্লাসে ইংরেজি ও বাংলা, গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয় থাকলেও গণিতে মাত্র একজন কর্মকর্তা আছে। আর বাংলায় সদস্য পদ বাদে মাত্র ২ জন। একই অবস্থা ইংরেজিতে। এই বিষয়ে এনসিটিবিতে মাত্র ৩ জন কর্মকর্তা রয়েছে। এনসিটিবির প্রশাসন শাখার তথ্য মতে, এসটিসিবিতে প্রথম শ্রেণির ৬৪ জন কর্মকর্তা প্রেষণে নিয়োজিত আছেন। এদের কারণে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা এখানে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
সম্পাদক শাখায় গণ্ডগোল: রসায়ন বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. জিল্লুর রহমানকে গবেষণার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ৫ম শ্রেণির হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের। হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মো. তৈয়বুর রহমানকে ১ম শ্রেণির গণিত ও ৪র্থ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের গবেষক করা হয়েছে। জুবেরী আলেয়া আক্তার দর্শনের শিক্ষক ও মুসলমান হলেও তাকে ৮ ও ৯ম শ্রেণির বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি ২০০৭ সালের ১৬ই এপ্রিল থেকে এনসিটিবিতে কর্মরত। অর্থনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক লানা হুমায়রা খানকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলার বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন ভাণ্ডার কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক দর্শন বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক হলেও তাকে ৯ম শ্রেণির ক্যারিয়ার শিক্ষা সৈয়দ মাহফুজ আলী ইতিহাসের শিক্ষক হলেও ৮ম ও ৯ম শ্রেণির সংগীত বিষয়ের বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর থেকে এনসিটিবিতে কর্মরত। চৌধুরী মুসাররাত হোসেন ইতিহাসের শিক্ষক হলেও ৫ শ্রেণির বৌদ্ধধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাবিষয়ের বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০০৯ সালের ১৬ই নভেম্বর থেকে কর্মরত আছেন। লানা হুমায়রা খান অর্থনীতির শিক্ষক হলেও তিনি তৃতীয় শ্রেণির বাংলার বিশেষজ্ঞ ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক আনোয়ারুল হককে ৭ম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ। সমাজবিজ্ঞানের মনিরা বেগমকে  ৮ম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যার ড. আবদুল আজিজ ফয়সালকে ৬ষ্ঠ শ্রেণির বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ, সমাজকল্যাণের শাহীনারা বেগমকে ৯ম শ্রেণির বাংলা দেশ ও বিশ্বপরিচয়ের বিশেষজ্ঞ। প্রাণিবিদ্যার মো. মঞ্জুরল আলমকে ৪র্থ শ্রেণির গণিত, ৫ শ্রেণির প্রাথমিক বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পারভেজ আক্তারকে ৮ম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এবং আনন্দ পাঠের বিশেষজ্ঞ। ইতিহাসের মো. মোসলে উদ্দিন সরকারকে ৩য় শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ৫ম শ্রেণির হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। ব্যবস্থাপনার মো. মোস্তফা সাইফুল আলমকে ৪র্থ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০০৯ সালের ১লা ডিসেম্বর থেকে বোর্ডে কর্মরত। দর্শনের  মো. সাইদুজ্জামানকে ৩য় শ্রেণির ইংরেজি ও হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। প্রাণিবিদ্যার হাসনাত মনোয়ারকে ৪র্থ শ্রেণির বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ করা হয়েছে। পদার্থ বিদ্যার মো. আবদুল মুমিন মোছাব্বিরকে ৬ষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং ৭ম শ্রেণির বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উদ্ভিদবিদ্যার ফাতেমা নাসিমা আখতার ও বাংলার শিক্ষক  মো. হান্নান্ন মিয়াকে তাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেয়া হলেও তারা যথাক্রমে  ২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর ও ২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে কর্মরত আছেন। সম্পাদক পদেও এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অর্থনীতির শিক্ষক দিলরুবা আহমেদকে ৭ম শ্রেণির কৃষিশিক্ষা বইয়ের সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপনা বিষয়ের নূর মোহাম্মদকে ৮ম শ্রেণির পালি এবং ৯ম শ্রেণির ফিন্যান্স ও ব্যাকিং বইয়ের সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ইতিহাসের এ জেড এম মাঈনুল হোসেনকে ৬ষ্ঠ শ্রেণির খ্রিষ্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা এবং ৭ম শ্রেণির সংগীত বইয়ের সম্পাদক।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন