রেলের ডেথ জোন ১৪২ কিলোমিটার পথ

প্রথম পাতা

রুদ্র মিজান | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার
 অরক্ষিত রেললাইন। অবাধে চলাচল করছে মানুষ। রেললাইনে বসছে বাজার। খেলছে শিশুরা। রেলপথে এটি নিত্যদিনের দৃশ্য। অথচ রেললাইন ও এর আশপাশে হাঁটা-বসা একধরনের অপরাধ।
রেললাইন দিয়ে চলাচলের দায়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে যে কাউকে। এরকম আইন থাকলেও প্রয়োগ হচ্ছে না নানা কারণে। আর এ কারণেই অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা   
। গত সাত বছরে শুধু ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকায় ১ হাজার ৯৮৬টি লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত বছরে এই এলাকায় ৩০৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সারা দেশে প্রতি বছরই সহস্রাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়। রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, অসতর্কতার কারণেই বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং দ্রুত পারাপার, রেললাইনে বসা, চলাচল ও এয়ারফোন ব্যবহার করে লাইনে হাঁটা এবং মোবাইলফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন পার হওয়া- এসব মৃত্যুর বড় কারণ। এছাড়া রয়েছে হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা। গত সাত বছরে ১ হাজার ৯৮৬ জনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা গেছে, রেলক্রসিং দ্রুত পার হতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ৮৯৮, রেললাইনে বসা ও চলাচল করার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৭৮, মোবাইলফোন ও এয়ারফোন ব্যবহার করে রেললাইন দিয়ে চলার সময় দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪২২, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে নিহত হয়েছেন ৫৫, টেম্পোর সঙ্গে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাত জন। এরমধ্যে ১২৬ জনের মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি।
ঢাকা রেলওয়ে থানার নারায়ণগঞ্জ থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ১৪২ কিলোমিটার পথে ২০১০ সালের পর থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে লাশের সংখ্যা। ২০১০ সালে ২০৩টি লাশ উদ্ধার করা হয় ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকা থেকে। ২০১১ সালে ২০৬, ২০১২ সালে ৩০৬, ২০১৩ সালে ৩১৮, ২০১৪ সালে ৩০৫, ২০১৫ সালে ২৯২ এবং ২০১৬ সালে ৩০৬টি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরমধ্যে ২০১৫ সালে দুটি ও ২০১৬ সালে তিনটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। বাকি সবগুলোই দুর্ঘটনা। গত বছর ৩২ জন নিহত হয়েছেন মোবাইলফোন ও এয়ারফোন ব্যবহার করে রেলাইলন পার হওয়ার সময়। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এরকম দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। তাদের মধ্যে একজন আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ। চাঁদপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ছিলেন। গত বছরের ২৭শে সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর মালিবাগ রেল লাইনের লেভেল ক্রসিংয়ে ঘটে ঘটনাটি। মালিবাগের শ্বশুরবাড়ি থেকে বের হয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে হেঁটে রেললাইন পার হচ্ছিলেন এ আইনজীবী। জয়দেবপুরগামী তুরাগ এক্সপ্রেসে কাটা পড়েন তিনি।
অন্যদিকে ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। গত বছরের ২৪শে নভেম্বর কিশোরগঞ্জের যশোদল এলাকায় ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন কলেজছাত্রী সুস্মিতা চক্রবর্তী স্বর্ণা (২২)। নিজের অমতে বিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে আত্মহত্যা করেন তিনি। তবে আত্মহত্যার চেয়ে রেললাইনে অবাধে হাট-বাজার বসার ও মোবাইলফোনে কথা বলার কারণেই মৃত্যু হচ্ছে বেশি। রেললাইনে হাটবাজার বসার কারণে মানুষের ভিড়ে ঘটছে দুর্ঘটনা। রেললাইনে হাট-বাজার বসা ও দ্রুত পারাপারের কারণে গত বছরে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২২১ জন। এরমধ্যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের টনক নাড়িয়েছিল ২০১৪ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে। ওই দিন রাজধানীর কাওরান বাজারে ট্রেনে কাটা পড়ে চারজন নিহত হন। দুর্ঘটনায় গুরুত্বর আহত হন অনেকে। তারপর বেশ কিছুদিন উচ্ছেদ অভিযান চলে রেললাইন এলাকায়। কিন্তু এখন সেই আগের অবস্থাতেই ফিরে এসেছে এসব এলাকা। কাওরান বাজারে রেললাইনের ওপর প্রতিদিন মাছ-সবজি নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। রাত থেকে দিন বা দুপুর পর্যন্ত রেললাইনের ওপরেই জুয়া খেলা হয়। জুয়াড়ি ও মাদকসেবীরা বসে আড্ডা দেয় সেখানে। রেললাইনের দুই পাশে ডেকে ডেকে বিক্রি করা হয় মাদক। বড় আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, রেললাইনের দুই পাশে থাকা বস্তির শিশুদের খেলাধুলার স্থানও এই রেললাইন। একই অবস্থা খিলগাঁও, জুরাইন ও তেজগাঁও এলাকায়। সূত্রমতে, প্রভাবশালী মহল সরকারি দলের নাম ব্যবহার করে রেললাইন সংলগ্ন জমি দখল করে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন স্থাপনা। গেন্ডারিয়া স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেললাইনে সহস্রাধিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ছোট-বড় ২৬টি বস্তি রয়েছে। বস্তির ঘরবাড়ি রয়েছে প্রায় ১ হাজার। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পাকা-আধাপাকা আরও আড়াইশ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে রেললাইনের পাশে। রয়েছে পান, সিগারেট, মুদি, ওয়ার্কশপ, রেস্টুরেন্টসহ নানা ধরনের দোকান।
রাজধানীতে ট্রেনে কাটা পড়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মহাখালী রেলগেট ও খিলক্ষেত এলাকায়। এর কারণ, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় রেললাইন বাঁকা। তাই দূর থেকে ট্রেন এলে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যায় না। আবার বনানী থেকে কাওরান বাজার, জুরাইন এলাকার রেললাইনের পাশে রয়েছে বস্তি, হাট। স্থানীয়রা জানান, হাটে বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে রেলের হর্ণ শোনা যায় না। অনেকেই কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, রেলের যোগাযোগের ব্যবস্থা পুরাতন। তারপরও আমরা উপলব্ধি করছি এখনও এ বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারিনি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যাচ্ছেন বা অবেহলা করার কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। মোবাইলফোনে কথা বলে রেললাইনে হাঁটছি, আড্ডা দিচ্ছি। দখলবাণিজ্যের কারণে রেললাইনে স্থাপনা গড়ে উঠছে। হাট-বাজার বসছে। বস্তি রয়েছে। এসব চলতে থাকলে যোগাযোগের জন্য অপরিহার্য এই রেলওয়ে আমাদের জীবন কেড়ে নিতে পারে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, গণমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। একইভাবে দুর্ঘটনা রোধ করতে রেললাইনে হাঁটার যে আইন আছে তাও বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
রেললাইনে হাঁটাচলা সংক্রান্ত আইনের বিষয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াছিন ফারুক মজুমদার বলেন, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে ২০ ফুটের মধ্যে প্রবেশ অবৈধ। এই সীমানার মধ্যে যারা চলাফেরা করেন তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ। কিন্তু হাজার হাজার লোক রেললাইন দিয়ে হাঁটা-চলা করে। তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব নয়। এজন্য আমরা বুঝিয়ে নিবৃত্ত রাখার চেষ্টা করি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা উচিত। সেই সঙ্গে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ জরুরি। তবে দুর্ঘটনা এড়াতে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন