অন্ধকারে জোনাকী

মানসিকতায় মিল থাকতে হবে

শেষের পাতা

মনিজা রহমান | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৫
‘আপু, আমি তো ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেন্টারে থাকি। স্ট্যাটেন আইল্যান্ড থেকে আপনার বাসায় এলাম।’ হাঁপাতে হাঁপাতে কথাটা বললো মেয়েটি।
‘ডমেস্টিক ভায়োলেন্স সেন্টার’ শব্দটা শুনে হঠাৎ যেন ধাক্কা খেলাম। আমার স্কুল বান্ধবীর ছোট বোন ও। বয়সে আমাদের চেয়ে দশ  বছরের ছোট হবে। বলতে গেলে হতে দেখেছি। সেই মেয়েটির এই দশা মানতে পারছিলাম না।
আমি বললাম, ‘তুমি না উডসাইডে ছিলে! ওখানে কবে গেছ?’ আমার জ্যাকসন হাইটসের বাসা থেকে কাছেই উডসাইড। আর স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে যেতে হলে প্রথমে ট্রেনে ম্যানহাটন যেতে হয়। সেখান থেকে ফেরি দিয়ে নদী পার হয়ে তারপর আবার ট্রেন বা বাস নিতে হয়।
ও বললো, ‘উডসাইডে আমার সাবেক স্বামীর বাসায়  ছিলাম। ওর সঙ্গে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে। এখন আমি স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে থাকি।’
পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের নিউ ইয়র্ক সিটির পক্ষ থেকে ওখানে বিভিন্ন বাসায় রাখা হয়। বাসা ভাড়া হিসেবে ১২০০ ডলার দেয়া হয়। আর খাওয়ার খরচের জন্য ৬০০ ডলারের ফুডস্ট্যাম্প।
আমার বান্ধবীর ছোট বোনের সঙ্গে কথায় কথায়  অনেক  কিছু জানলাম। ওর গ্লানিময় দিনরাতের কথা। ওর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের কথা। এক সময় বললাম, ‘লোকটা (ভদ্রলোক বলতে ইচ্ছা হলো না) তো নিউ ইয়র্কে বেশ দামি এক পেশায় কর্মরত। আবার নিশ্চয়ই এখানে কিংবা বাংলাদেশে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করবে।  আবারো তাকে একইভাবে পীড়ন করবে।’
আমার  কথার প্রতিক্রিয়ায় মেয়েটি যে উত্তর দিলো আমার খুব ভালো লাগলো। ও বললো, ‘আপু, কাউকে জাজ করতে চাই না। বলতে চাই না কে ভালো, কে মন্দ। নিশ্চয়ই সে তার মতো। যেটা আমি ছিলাম না। কিন্তু নিশ্চয়ই কেউ আছে যে ওই লোকের সাথে মানিয়ে নিতে পারবে। বিয়ের পরে বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা যাবে না, বাইরে কাজ করা যাবে না- এই ধরনের সব শর্ত আগে জানিয়ে তারপর বিয়ে করা উচিত। যার যেমন মানসিকতা তার সেই মানসিকতার কাউকে পছন্দ করা উচিত।’
কথাটা আমার খুব মনে ধরল। এই পৃথিবীতে কোন মানুষের মানসিকতা আরেকজনের সঙ্গে মেলে না। তবু আমরা কিছুটা ছাড় দিয়ে দাম্পত্য জীবন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। বাঙালি সমাজে বিবাহ বিচ্ছেদ এখনো অত্যন্ত অনাঙ্ক্ষিত বিষয়। স্বামী বা স্ত্রী কারো পরিবারই এটা স্বাভাবিক নিতে পারে না। নিজেকে নানাভাবে প্রবোধ দিয়ে, ছোট-বড় ত্যাগ করে একটা জীবন পার করে দিতে চায় বেশিরভাগ বাঙালি নারী ও পুরুষ।
পুরো আমেরিকায় এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে শ্বেতাঙ্গ নারীরা এই দেশে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের স্বীকার হয়। আর এশিয়ানরা সবচেয়ে কম। এই পরিসংখ্যান প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন নয়। শ্বেতাঙ্গ নারীরা শিক্ষিত ও সচেতন বলে তারা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করে। কিন্তু এশিয়ান নারীরা সেটা কওে না। একান্তই যখন কেউ করে বুঝতে হবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তার। আমার বান্ধবীর ছোটবোনেরও তেমন হয়েছিল। কারণ ও জানতো বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনায় ওর বাবা-মা কত কষ্ট পাবে! কষ্ট পাবে ওর ভাই-বোনেরা। দূর থেকে তারা কিছু করতেও পারবে না। শুধু চোখের জল ফেলা ছাড়া।
পরিবারে শুধু নারীরাই নয়, পুরুষরাও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে গিয়ে দেখেছি, আমার পরিচিত অনেক  ভাইয়েরা কাজে যাওয়ার কথা বলে স্ত্রীদের না জানিয়ে সংগঠনে আসেন। এজন্য হয়তো তারা কোনো ছবি তোলেন না। কারণ সেই ছবি কেউ ফেসবুকে দিলে স্ত্রী জেনে যাবে সে কোথায় গেছে!
আমি বিশ বছরের বেশি সময় ঢাকায় কণ্ঠশীলন নামের একটি সংগঠনে ছিলাম। সেখানে এক ভাই ছিলেন, এই সংগঠন ছিল যার ধ্যান-জ্ঞান। বিয়ের পরে তার স্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে দেখলো, এই সংগঠনে অনেক মেয়ে আছে, ছেলে-মেয়েরা একসাথে রিহার্সেল করে, পারফরমেন্স করে, সে তখন ক্ষেপে গেল। স্বামীকে জানিয়ে দিলো- হয় কণ্ঠশীলন, নয়তো স্ত্রী- যে কোন একটা তাকে বেছে নিতে হবে। স্ত্রীর ইচ্ছার কাছে বলি হয়ে ওই ভাই দীর্ঘ দশ বছর কণ্ঠশীলন থেকে বাইরে ছিলেন। কিন্তু এক সময় ওনার স্ত্রীর ভুল ভেঙেছিল।
পুরুষদের প্রায় সবারই বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্যদের প্রতি এক ধরনের দায়িত্ব থাকে। সেটাও বিয়ের আগে সঙ্গীনিকে স্পষ্ট করে নেয়া ভালো। মোদ্দা কথা, যার যেমন মানসিকতা, তার তেমন মানুষকেই জীবনসঙ্গী করা উচিত। প্রেমের মোহে পড়ে বাস্তবতা ভুলে গেলে সারাজীবন পস্তাতে হয়।
কেউ অর্থ-ক্যারিয়ার চাইলে সেই রকম জীবনসঙ্গী খোঁজা উচিত। কেউ ধার্মিক-পরহেজগার চাইলে তেমন কেউ। কেউ মঞ্চ নাটক করতে চাইলে, তাকেও সেইরকম উদারমনা-প্রগতিশীল কাউকে বেছে নিতে হবে। একজন নারী বা পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনের মিলটাই আসল। মানসিকতার মিলটাই মূল কথা। আর কিছু নয়! এটা আপেক্ষিক সত্য না। চিরন্তন সত্য।
ওইদিন জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজা থেকে সকালবেলা হেঁটে আসছিলাম। শুনলাম, এক লোক বাংলাদেশে কথা বলছে। সম্ভবত কারো বিয়ের আলোচনা চলছে। ভদ্রলোক বলছেন, ??‘তো?মরা বিক্রমপুর থেকে অতদূর কুমিল্লায় গিয়ে কেন সমন্ধ করছ?’ শুনে মনে মনে ভাবছিলাম বিক্রমপুর থেকে কুমিল্লার দূরত্ব কতদূর হবে? গাড়িতে গেলে তিন ঘণ্টার বেশি লাগার কথা নয়। অথচ তাই নিয়ে কত দুশ্চিন্তা। আসলে ভদ্রলোক দূরত্ব নিয়ে নয়, অঞ্চলে অঞ্চলে সাংস্কৃতিক-জীবনযাত্রায় যে ভিন্নতা এই নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন।
আমরা বাংলাদেশে বিয়ের সময় নিজের জেলার পাত্র-পাত্রীকে অগ্রাধিকার দেই। নিউ ইয়র্কে এসে দেখলাম এক কুইন্সই বলতে গেলে ঢাকা শহরের সমান। সেও আবার নিউ ইয়র্ক সিটির পাঁচ বরোর একটি। নিউ ইয়র্ক রাজ্য তো আরো অনেক বড়। এ রকম কত রাজ্য আছে আমেরিকায়। এখানে নানা দেশের, নানা জাতির, আলাদা ধর্মের নারী ও পুরুষ একসঙ্গে চলছে। আমি যে এপার্টমেন্টে থাকি সেখানে এশিয়ানরা ছাড়া আর কোনো জুটির মধ্যে জাতিগত মিল সেভাবে দেখি না।
ডনাল্ড ট্রাম্পের ভক্ত আমার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর কথা আগেই বলেছিলাম, বুড়ো শ্বেতাঙ্গ, বুড়ি হিসপ্যানিক। আরেক ফ্ল্যাটে বাবা শ্বেতাঙ্গ, মা কৃষ্ণাঙ্গ। সন্তানরা হয়েছে মায়ের মতো কালো। সাদা বুড়ি দাদীর সঙ্গে কালো নাতি-নাতনিরা পার্কে বেড়াতে যায়। আমার বাসার নিচতলার ফ্ল্যাটে থাকে যে রিকার্ডো, ও পর্তুগীজ আর ওর বান্ধবী ইতালিয়ান। চোখ জুড়িয়ে যায় ওদের দু’জনকে দেখলে।
মানসিকতার মিল এভাবে দূরের মানুষকে কাছে আনে। বিনিসুতার মালায় গেঁথে দেয় দু’টি মনকে।
বিলম্বিত ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা সবার জন্য।
মনিজা রহমান
১৬ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, ২০১৭। নিউ ইয়র্ক।
(অন্ধকারে একটা জোনাকী)
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন